‘সংবিধান সংশোধনে নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

গত ৪ আগস্ট, ২০১১ সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সংবিধান সংশোধনে নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ‘সুজনে’র আয়োজনে ‘সুজন’ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। জনাব এ এস এম শাহজাহান অনুষ্ঠানটিতে সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খান, এডভোকেট সুলতানা কামাল, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা, সৈয়দ আবুল মকসুদ, ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ড. আসিফ নজরুল, জনাব ইনাম আহমেদ চৌধুরী, জনাব মিজানুর রহমান খান, ড. দিলারা চৌধুরী, আ, স, ম, আব্দুর রব, জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না, জনাব রুহিন হোসেন প্রিন্স, সাবেক সচিব জনাব আব্দুল লতিফ মন্ডল প্রমূখ আলোচনা করেন।

সভাপতির স্বাগত বক্তব্যে জনাব মোজাফফর আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধনে ইতোমধ্যেই একটি সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়েছে। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত আদালতের রায় নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধী বক্তব্যও আমরা আইন বিশেষজ্ঞদের মুখে শুনছি। এ ব্যাপারে ‘সুজনে’র কোন স্ট্যান্ড নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দরকার, নাগরিকদের সুচিন্তিত মতামত দরকার। সে কারনেই আজকের এই গোলটেবিল বৈঠক।

মূল প্রবন্ধে ড. বদিউল আলম মজুমদার সংবিধান সংশোধনে গঠিত সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিশিচতকরণ, কমিটির কার্যপরিধি সুনির্দিষ্ট করা, কমিটির জন্য সময়সীমা নির্ধারণ, বর্তমান কমিটির পাশাপাশি একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি বা কমিশন গঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালীকরণ, দুদকসহ কিছু কিছু সংগঠনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দান, শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার স্বার্থে নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার দায়িত্ব ও কার্যপরিধি আরও সুস্পষ্টকরণ, প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হ্রাস করে সত্যিকারের সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আমূল সংস্কার, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি, প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগের সত্যিকারের পৃথকীকরণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, রাজনৈতিক দলকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তত আরও এক টার্ম রাখা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ না করা, বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতির সাথে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি প্রবর্তন, দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইন সভা, সংবিধানের শিরোনাম পরিবর্তন ইত্যাদি প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

বৈঠকে আলোচনা করতে গিয়ে জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খান একটি কমিশন গঠনের মাধ্যমে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার এবং সংসদকে কার্যকর করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, আমি অত্যন্ত আশাবাদী। কেননা আলোচনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সংবিধানে জনস্বার্থ বিরোধী যা কিছু রয়েছে, আলোচনার মাধ্যমেই সে সকল ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। তিনি সংবিধান সংশোধনে নাগরিকদের মতামত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করেন। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, ব্যক্তি না হলেও রাষ্ট্র অবশ্যই ধর্ম নিরপেক্ষ হতে পারে। বিচার বিভাগকে নিরপেক্ষ করতে পদ্ধতি উদ্ভাবন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ পঞ্চম সংশোধনী সংক্রান্ত আদালতের রায়কে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গোঁজামিল বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলে খ্যাত অনেকের এ সংক্রান্ত বক্তব্যকে বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতা ও অসততা বলে মনে করেন। একই সাথে তিনি ‘বিসমিল্লাহ’, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’, ‘বাঙ্গালি’ জাতীয়তা, নাগরিক পরিচয় ‘বাংলাদেশী’ ইত্যাদি বৈপরীত্যসমূহ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি আদালতের কর্মপরিধি নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করেন। ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, সংবিধানকে শুধু যুগোপোযোগী করলেই হবে না, প্রয়োজন সংবিধানের গণতান্ত্রিক চর্চা। একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনই ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিত হতে পারে না, পরিচিত হতে পারে ‘গণরাষ্ট্র’ হিসাবে। ড. দিলারা চৌধুরী সংবিধান সংশোধনে জনগণের মতামত গ্রহণের উপর জোর দেন। ড. আসিফ নজরুল বলেন, আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ম নিরপেক্ষতা ফিরে আসলেই যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ফিরে আসবে এমনটি ভাবার অবকাশ নেই। কেননা পৃথিবীর কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশে যারা ধর্মের অপব্যাখ্যা করবে, আইনের মাধ্যমে সেই সকল সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে হবে।

জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের বৈপরীত্যের দিকটি তুলে ধরেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন হওয়া প্রয়োজন বলে মতামত ব্যক্ত করেন। জনাব মিজানুর রহমান খান বলেন, ’৭২ এর সংবিধান যেভাবে প্রণয়নের চিন্তা করা হয়েছিল, ১৯৭২ এর ৪ নভেম্বরে গিয়ে তা পাল্টে ফেলা হয়েছে। ফলে আমাদের সরকার আর মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকারে পরিণত হতে পারেনি, পরিণত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকারে। প্রধানমন্ত্রীকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে বাহাত্তরেই গণতান্ত্রিক চেতনাকে ভূলুন্ঠিত করা হয়েছে, যা আজও চলমান। জনাব রুহিন হোসেন প্রিন্স তার বক্তব্যে নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির প্রবর্তনসহ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। আ, স, ম, আব্দুর রব সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণসহ ফেডারেল সরকার পদ্ধতি ও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইন সভার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করেন। সাবেক সচিব জনাব আব্দুল লতিফ বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের সমন্বয় প্রক্রিয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন।

মূল প্রবন্ধ ডাউনলোড করুন

Advertisements