স্থানীয় উন্নয়নে সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ততা ও সাংবিধানিক জটিলতা

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
গত ৯ মার্চ একনেকের সভায় 'অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের' অধীনে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকার জন্য ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে (প্রথম আলো, ১০ জুন ২০১০)। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যেক সংসদ সদস্য তার মেয়াদকালীন ১৫ কোটি টাকা পরিমাণের প্রকল্প সুপারিশ করতে পারবেন, যা এলজিইডি'র মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের অধীনে মোট চার হাজার ৬৯১ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে নয়, বরং সুপারিশকৃত প্রকল্পের বিপরীতে দেয়া হবে। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যদের আপাতত এ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়নি। প্রকল্পের উদ্দেশ্য নির্বাচনের আগে সংসদ সদস্যদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহায়তা প্রদান করা এবং এর বাস্তবায়ন এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, নবম জাতীয় সংসদে পাস করা উপজেলা পরিষদ আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী, '(১) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫-এর অধীন একক আঞ্চলিক এলাকা হইতে নির্বাচিত সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য পরিষদের উপদেষ্টা হইবেন এবং পরিষদ উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণ করিবেন। (২) সরকারের সহিত কোন বিষয়ে পরিষদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে পরিষদকে উক্ত বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এলাকার সংসদ সদস্যকে অবহিত রাখিতে হইবে।' এছাড়াও আইনের ৪২(৩) ধারা অনুযায়ী, 'পরিষদ উহার প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সুপারিশ গ্রহণপূর্বক একটি অনুলিপি উহার বাস্তবায়নের পূর্বে সরকারের নিকট প্রেরণ করিবেঃ।' এই ধারাদ্বয়ের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদ পরিচালনার এবং পরিষদের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কর্তৃত্ব মূলত সংসদ সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, কারণ তাদের পরামর্শ গ্রহণ পরিষদের জন্য বাধ্যতামূলক। এছাড়াও স্থানীয় রাজনীতিতে প্রতিপত্তি ও প্রভাবের কারণে সংসদ সদস্যদের পরামর্শ বস্তুত অনেকের জন্য নির্দেশসমতুল্য।

উপজেলা পরিষদ আইনের ২৫ ও ৪২(৩) ধারাদ্বয় এবং একনেকের উপরিউক্ত সিদ্ধান্তের তাৎপর্য সুগভীর ও শংকাজনক। কারণ সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বিরাজমান থাকলেও স্থানীয় উন্নয়নের দায়িত্ব এখন মূলত সংসদ সদস্যদের হাতে। এর ফলে আমাদের সংবিধানের 'বেসিক স্ট্রাকচার' বা মৌলিক কাঠামোর ওপরই আঘাত আনা হয়েছে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

অন্যান্য আধুনিক সংবিধানের মতো আমাদের সংবিধানেরও মূলে রয়েছে ক্ষমতার বিভাজন নীতি (Principles of separation of powers)। এই নীতি অনুসরণে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তিনভাবে বিভাজন করে তিনটি অর্গানের- আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। এগুলোর প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন ও সুস্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত মামলার সাম্প্রতিক রায়ে এ সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে : ‌'The Legislature, the Executive and the Judiciary being the three pillars of the Republic created by the Constitution, as such, are bound by its provisions. The Legislature makes the law, the Executive runs the government in accordance with law and the Judiciary ensures the enforcement of the provisions of the Constitution.' ('আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ প্রজাতন্ত্রের তিনটি স্তম্ভ, এগুলো সংবিধানেরই সৃষ্টি এবং এগুলোর দায়িত্বও সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত। আইনসভা আইন প্রণয়ন করে, নির্বাহী বিভাগ আইন অনুযায়ী সরকার পরিচালনা করে এবং বিচার বিভাগ সংবিধানের বিধানগুলোর কার্যকারণ নিশ্চিত করে।' বলা বাহুল্য, এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি 'চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস' বা নজরদারিত্ব ও ভারসাম্য পদ্ধতির সৃষ্টি হয়, যাতে কোন অর্গানই ক্ষমতা কুক্ষিগত এবং সব ক্ষমতার মালিক জনগণের স্বার্থহানি করতে না পারে।

আমাদের সাংবিধানিক পদ্ধতিতে স্থানীয় উন্নয়ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ- যা সংবিধানের চতুর্থ ভাগে 'নির্বাহী বিভাগের' অন্তর্ভুক্ত, স্থানীয় শাসন তথা স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত। অনুচ্ছেদের (১) উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, 'আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।' উপ-অনুচ্ছেদ (২)(গ) অনুযায়ী, 'জনসাধারণের কার্য (public service) এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নসম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন' স্থানীয় সরকারের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। আইন প্রণয়নের মাধ্যমেও এ দায়িত্ব অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা যায় না। উপজেলা পরিষদ বাতিলের পর বিখ্যাত কুদরত-ই-ইলাহী বনাম বাংলাদেশ [৪৪ ডিএলআর (এসি)(১৯৯২)] মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ সর্বসম্মত রায়ে বলেন, 'Parliament is not free to legislate on local government ignoring Articles 59 and 60.' (স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ উপেক্ষা করতে পারেন না)। অর্থাৎ আইনসভা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংবিধানের ওপরে নয়, সংবিধানের অধীনে।

উপজেলা আইনের ২৫ ও ৪২(৩) ধারা নিঃসন্দেহে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লংঘন। কারণ এগুলোর মাধ্যমে আইনসভার সদস্য হয়ে সংসদ সদস্যরা উপজেলার ওপর আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে পরোক্ষভাবে স্থানীয় উন্নয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এটি কোনভাবেই আইনসিদ্ধ নয়। বস্তুত উপজেলা আইন একটি 'রঙ্গিন আইন'(colourable legislation), যা প্রত্যেক্ষভাবে করা যায় না, তা পরোক্ষভাবে আইনের মাধ্যমে করলে তাকে রঙিন আইন বলা হয় [কুদরত-ই-ইলাহী বনাম বাংলাদেশ, ৪৪ ডিএলআর (এসি)(১৯৯২)]। তাই উপজেলা আইনের আওতায় সংসদ সদস্যদের জনকল্যাণমূলক সেবা প্রদান (public service) ও স্থানীয় উন্নয়নমূলক সব কার্যক্রম অবৈধ না হয়ে পারে না, কারণ এগুলোর কোন আইনগত ভিত্তি নেই।

প্রসঙ্গত, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বনাম বাংলাদেশ [১৬বিএলটি(এইচসিডি)(২০০৮)] মামলায় সংসদ সদস্যদের তাদের নির্বাচনী এলাকার আইন-শৃংখলা রক্ষা ও স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে জড়িত হওয়াকে অসাংবিধানিক বলে আমাদের হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এরই মধ্যে রায় দিয়েছেন। গত সরকারের আমলে একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে 'জেলামন্ত্রী পদ' সৃষ্টির ফলে সংসদ সদস্য হিসেবে নিজ এলাকার আইন-শৃংখলা রক্ষা ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছেন না, এ অভিযোগে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ২০০৩ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। ২০০৬ সালের প্রদত্ত রায়ে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর সুস্পষ্টভাবে বলেন : 'মন্ত্রী, হুইপ এবং অন্যান্য কর্মকর্তা, যাদের কথাই উপরিউক্ত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের কাউকেই উল্লিখিত কোন জেলার জন্য নিয়োগ প্রদান করা যায় না। সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে পুরো দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দায়িত্ব ব্যতীত জেলাগুলোতে তাদের অন্য কোন দায়দায়িত্ব নেই। একইভাবে সংসদ সদস্যদেরও জেলা বা অন্যান্য প্রশাসনিক একাংশে উন্নয়ন বা আইন-শৃংখলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা ও দায়িত্ব নেই। অতএব মামলার বাদী, যিনি একজন সংসদ সদস্য, পিরোজপুর জেলা সম্পর্কে তার কোন দায়দায়িত্ব নেই।' ফলে আমাদের আইন প্রণয়নকারীরা এখন আইনভঙ্গকারীতে পরিণত হয়েছেন।

এছাড়াও উপজেলা পরিষদ আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী শুধু একক আঞ্চলিক এলাকা থেকে নির্বাচিত ৩০০ জন সংসদ সদস্যকে উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করা হয়েছে এবং সংরক্ষিত আসনের ৪৫ জন নারী সদস্য এ থেকে বঞ্চিত। ১৫ কোটি টাকা পরিমাণের প্রকল্প সুপারিশের সুযোগ থেকেও তারা বঞ্চিত। তাই আইনের এ বিধান এবং একনেক ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) ও ২৮ (নারী-পুরুষভেদে বৈষম্য) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উপরন্তু উপজেলা পরিষদ আইনের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের ওপর কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে, কিন্তু তাদের কৃতকর্মের জন্য কোনো দায়বদ্ধতার বিধান নেই, যা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও সুশাসনের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এসব কারণেও উপজেলা পরিষদ আইন এবং একনেকের সিদ্ধান্ত অবৈধ ও বাতিলযোগ্য বলে আমরা মনে করি।

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন সৃষ্টিতে বিরাট অংকের প্রকল্প সুপারিশের মাধ্যমেও সংসদ সদস্যরা স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত হয়ে পড়েছেন, যা সংবিধানের ৫৯(২)(গ)-এর লংঘন এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ের পরিপন্থী। এছাড়া একনেকের সিদ্ধান্ত সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদও লংঘন করেছে বলে আমাদের ধারণা। সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, 'সরকারি অর্থের রক্ষণাবেক্ষণ, ক্ষেত্রমত সংযুক্ত তহবিলে অর্থ প্রদান বা তাহা হইতে অর্থ প্রত্যাহার কিংবা প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে অর্থ প্রদান বা তাহা হইতে অর্থ প্রত্যাহার এবং উপরিউক্ত বিষয়সমূহের সহিত সংশ্লিষ্ট বা আনুষঙ্গিক সকল বিষয় সংসদের আইন দ্বারা এবং অনুরূপ আইনের বিধান না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রণীত বিধিসমূহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হইবে।' প্রত্যেক সংসদ সদস্যের সুপারিশে তার নির্বাচনী এলাকার জন্য ১৫ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে গৃহীত হয়নি কিংবা রাষ্ট্রপতি প্রণীত বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে বলেও আমাদের জানা নেই।

তবে কেউ হয়তো যুক্তি দেখাবেন, নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের শুধু 'সুপারিশ' করার এখতিয়ার রয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রেক্ষাপটে, বিশেষত তাদের ক্ষমতায়িত করার সরকারের সর্বব্যাপী (আইন-শৃংখলা রক্ষা থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান পর্যন্ত) প্রচেষ্টার ফলে তাদের সুপারিশই যে কোন কর্তৃপক্ষের জন্য শিরোধার্য। এছাড়াও উপজেলা পরিষদ আইনের মাধ্যমে তাদের কাছে এরই মধ্যে স্থানীয় উন্নয়নের কর্তৃত্ব হস্তান্তরিত হয়ে গেছে। তাই সংসদ সদস্যের প্রত্যেকের ১৫ কোটি টাকার প্রকল্প সুপারিশের সিদ্ধান্তকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে হবে না, এটিকে দেখতে হবে উপজেলা পরিষদ আইনের ২৫ ও ৪২(৩) ধারার সঙ্গে একত্রে।

সংসদ সদস্যদের প্রকল্প সুপারিশের সমর্থনে কেউ হয়তো ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের একটি সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের আশ্রয় নিতে পারেন। ভারতে ১৯৯৩ সালে লোকসভায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মাধ্যমে 'এমপিএলএডি' (Member of Parliament Legislative Area Development) নামে একটি স্কিম চালু করা হয়। এর আওতায় ভারতের প্রতি লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্যকে বার্ষিক দুই কোটি রুপি স্থানীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রদান করা হয়। এ অর্থও সরাসরি সংসদ সদস্যরা ব্যয় করেন না- জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে তা ব্যয় হয়। এক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যের দায়িত্ব প্রকল্প সুপারিশ করা।

ভারতীয় এ স্কিমের বিপক্ষে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষ অবস্থান নিয়েছেন, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিং। ভারতীয় লোকসভার সাবেক স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ও ২০০৫ সালে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেছেন, এমপিএলএডি স্কিমের উদ্দেশ্য 'পঞ্চায়েতের, যা প্রবল চাপ সৃষ্টিকারী এমপি ও এমএলএদের প্রভাবের বাইরে- বিকাশ ভণ্ডুল করা।' (MPLADS was devised to 'sabotage the emergence of panchayats, which were autonomous of the weight-throwing MPs and MLAs')। ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি এমএন ভেনকাটাচালিয়ার নেতৃত্বে গঠিত ১১ সদস্যের সংবিধান পর্যালোচনা কমিটিও ২০০২ সালে এ স্কিমের বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে ভারতীয় 'প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন' এমপিএলএডি স্কিমের অবসান দাবি করে। কমিশনের মতে, এর মাধ্যমে 'আইনসভার সদস্যরা সরাসরি নির্বাহী হওয়ার কারণে ক্ষমতার বিভাজন পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে পড়ছে।'

এমপিএলএডি স্কিমের কার্যকারিতা এবং দুর্নীতি সম্পর্কেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ভারতীয় লোকসভার 'পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির' সাবেক চেয়ারম্যান এরা সেজ্যুইয়ান-এর মতে, 'স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে গত ৫০ বছরের সরকারের ব্যর্থতাকে সংখ্যা এবং বৈচিত্র্যের দিক থেকে ম্লান করে দিয়েছে এমপিএলএডি স্কিমের অধীনে সৃষ্ট মাত্র গত সাত বছরের অনিয়মঃ এ স্কিম সম্পর্কে সরকারের দায়িত্ব এড়ানো এবং প্রশাসনে এমপিদের সম্পৃক্ততা সংসদের কাছে নির্বাহী বিভাগের দায়বদ্ধতাকে খর্ব করেছে এবং এভাবে রাষ্ট্রে সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেই দুর্বল করে তুলেছে' (ফ্রন্টলাইন, ১৫ মার্চ ২০০২)।

ভারতীয় সংসদ সদস্যরা সরাসরিভাবে এ অর্থ স্পর্শ না করলেও তাদের অনেকেই এর মাধ্যমে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনি প্রেক্ষাপটে এমপিএলএডি স্কিম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পাঁচজন এমপি কন্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে কমিশন দাবি করছেন এমন ভিডিও গোপনে ধারণ করে 'স্টার নিউজ চ্যানেল' ২৫ জানুয়ারি, ২০০৬ তা প্রচার করে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় লোকসভার একটি কমিটি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায় এবং অভিযুক্তদের তিরস্কার ও লোকসভা থেকে বহিষ্কার করা হয়।

এসব গুরুতর অভিযোগ ও সাংবিধানিক জটিলতা সত্ত্বেও ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ গত ৬ মে এমপিএলএডি স্কিম সংবিধানের লংঘন নয় বলে রায় দিয়েছেন। আদালত বলেন, 'Even though MPs have been given a seemingly executive function, their role is limited to ÔrecommendingÕ works and actual implementation is done by local authorities. There is no removal of checks and balances since these are duly provided and have to be strictly adhered to under the guidelines of the scheme and Parliament Therefore, the scheme does not violate separation of powers.' ("যদিও আপাতদৃষ্টিতে এমপিদের নির্বাহী দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে, তাদের ভূমিকা 'সুপারিশে' সীমাবদ্ধ এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব স্থানীয় কর্তৃপক্ষের, তাই চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস পদ্ধতির বিলুপ্তি ঘটেনি, কারণ নজরদারিত্বের বিধান যথাযথভাবে রাখা হয়েছে এবং স্কিমের ও পার্লামেন্ট প্রদত্ত গাইডলাইন অনুযায়ী যা পরিপূর্ণভাবে মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সুতরাং স্কিমটি ক্ষমতার বিভাজনকে লংঘন করে না।") Furthermore, 'panchayati raj institutions, municipal as well as local bodies have not been denuded of their role or jurisdiction as due place has been accorded to them by the guidelines in the implementation of the scheme.' (এছাড়াও 'এর মাধ্যমে পঞ্চায়েতী রাজ প্রতিষ্ঠান, মিউনিসিপ্যালিটি এবং অন্যান্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ও এখতিয়ার খর্ব করা হয়নি, কারণ স্কিম বাস্তবায়নের গাইডলাইনে তাদের যথার্থ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।'

ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের এ গুরুত্বপূর্ণ রায় আমাদের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয়। ভারতে স্কিম বাস্তবায়ন করে মূলত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নের জন্য বিস্তারিত 'গাইডলাইন' রয়েছে, যা অনুসরণ করাও বাধ্যতামূলক। এমপিদের ভূমিকা মূলত সুপারিশেই সীমাবদ্ধ। সর্বোপরি এমপিএলএডি সংক্রান্ত 'সংসদীয় কমিটির' মাধ্যমে এগুলোর বাস্তবায়ন কঠোর নজরদারিত্বের মধ্যে রাখা হয়, যার ফলে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতীয় এ স্কিম চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং সুপ্রিমকোর্ট তার রায়ে 'অ্যাকাউনটেবিলিটি রিজিম' বা দায়বদ্ধতার কাঠামোকে আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

পক্ষান্তরে আমাদের সংসদ সদস্যরা শুধু প্রকল্প সুপারিশই করেন না, তাদের অনেকেই উন্নয়নসহ স্থানীয় পর্যায়ে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করেন। আইনগতভাবে তাদের সে অধিকারও দেয়া হয়েছে। প্রভাবশালী সংসদ সদস্যদের অনেকেই এখন উপজেলা পরিষদও পরিচালনা করেন এবং ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেন। বস্তুত সংসদ সদস্য এবং তাদের দলীয় সহযোগীদের হস্তক্ষেপের কারণে আমাদের পুরো গ্রামীণ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা আজ অকার্যকর প্রায়। এছাড়াও তাদের সুপারিশ উপেক্ষা করার সাহস কারোর নেই এবং তা করা হয়েছে বলেও আমাদের জানা নেই। উপরন্তু ভারতের বিপরীতে আমাদের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এলজিইডি, নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নয়। ভারতের মতো আমাদের দেশে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিস্তারিত গাইডলাইন তো দূরে, কোন গাইডলাইনই নেই। সর্বোপরি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কিংবা কোন বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার কোন পদ্ধতিও নেই।

আরেকটি কারণেও ভারতীয় রায় আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। আমাদের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আমাদের আদালত এরই মধ্যে সংসদ সদস্যদের আইন-শৃংখলা রক্ষা ও স্থানীয় উন্নয়ন কাজে জড়িত হওয়াকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন, যা আমাদের জন্য মানা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অন্য দেশের আদালতের রায় মানতে আমাদের আদালত বাধ্য নন[Serajul Huq Chowdhury vs. Nur Ahmed Chowdhury (19DLR766)]|

পরিশেষে এটি সুস্পষ্ট যে, সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত হওয়ার ফলে গুরুতর সাংবিধানিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের সংবিধান সৃষ্ট দায়বদ্ধতার কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছে এবং দেশে এক ধরনের 'এমপি রাজ' বা এমপিতন্ত্র সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা প্রতিহত করা জরুরি। চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস পদ্ধতি বা ক্ষমতার বিভাজন নীতি আমাদের সংবিধানের মূল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত এবং এ কাঠামো ভেঙে পড়ার পরিণতি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ হতে বাধ্য। এছাড়াও উপজেলা পরিষদ আইনের ২৫ ও ৪২(৩) ধারা এবং একনেকের সিদ্ধান্তের ফলে আমাদের সংসদ সদস্যদের অধিকাংশ, তাদের নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্যের বাইরে, স্থানীয় উন্নয়ন নিয়ে ব্যস্ত এবং তাদের অনেকে সংসদবিমুখ হয়ে পড়েছেন। ফলে আমাদের সংসদও ক্রমাগতভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ছে, যার পরিণতি অশুভ হতে বাধ্য।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

সূত্র: যুগান্তর, ১৬ আগস্ট ২০১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s