সংবিধান সংশোধন ও সম্ভাব্য অগ্রাধিকার

বদিউল আলম মজুমদার

সাংবিধানিক বিধানগুলোয় আজ এমন পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বাস্তবায়নের পথ সুগম করবে। সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সঙ্গে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে শুধু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিলেই হবে না, কারণ সংবিধান শুধু বিশেষজ্ঞদের জন্য নয়।

আমাদের সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ১৫ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির জন্য কোনো কার্যপরিধি নির্ধারিত করা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। তবে মনে হয়, যেন সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নই হবে কমিটির মূল উদ্দেশ্য। আরেকটি উদ্দেশ্য হবে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলরোধে কঠোর বিধানের সুপারিশ করা।

আমরা মনে করি, সংবিধান একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল_ এটি একটি রাষ্ট্রের ধ্রুবতারা ও ভবিষ্যতের রূপরেখা। তাই সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে 'পিসমিল' বা খণ্ডিত (ঢ়রবপবসবধষ) ও অ্যাডহক বা অপূর্বনির্ধারিত (ধফযড়প) পদ্ধতিতে অগ্রসর হওয়ার বা তাড়াহুড়া করার কোনো অবকাশ নেই। আমরা আরও মনে করি, আদালতের দুটি রায় ছাড়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আছে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের ক্ষেত্রে, যা কমিটিকে বিবেচনায় নিতে হবে। সুতরাং আমাদের সুপারিশ হলো_ বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি 'সংবিধান পর্যালোচনা কমিটি' গঠন করা এবং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া_ প্রতিবেশী ভারতে সংবিধানের কার্যকারিতা মূল্যায়নের লক্ষ্যে অতীতে একাধিকবার এ ধরনের কমিশন গঠন করা হয়েছে। বর্তমান সংসদীয় বিশেষ কমিটিকে সহায়তার লক্ষ্যেই প্রস্তাবিত পর্যালোচনা কমিটি গঠিত হতে পারে।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন, আমাদের মূল সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পরে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে অবশ্য ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধান থেকে বিলুপ্ত এবং সমাজতন্ত্রকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার হিসেবে সুনির্দিষ্ট করা হয়। আমাদের মূল 'সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন কমিটি' তার ১৯৭২ সালের রিপোর্টে বলেছে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো সংবিধানের বিভিন্ন ধারায় প্রতিফলনের জন্য কমিটি আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তাই আজ_ সংবিধান রচনার দীর্ঘ ৩৮ বছর পর_ সময় এসেছে এ তিনটি মূলনীতি বাস্তবায়নের, বিশেষত গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের সংবিধান কতটুকু সফল হয়েছে, তা মূল্যায়ন করার।

সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের এ ক্ষমতার একটি অংশ তাদের প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করে। আর প্রতিনিধিদের দায়িত্ব হলো সাংবিধানিক বিধিনিষেধ অনুসরণ করে জনগণের পক্ষে শাসনকার্য পরিচালনা করা। কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাদের প্রাপ্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের অধিকার হরণ করতে পারেন, এমনকি তাদের স্বার্থবিরোধী কাজেও লিপ্ত হতে পারেন। ক্ষমতার এমন অপব্যবহার রোধ করার জন্য প্রয়োজন একটি যথার্থ আইনি কাঠামো এবং আইনের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য কতগুলো সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক দল ও সংগঠিত নাগরিক সমাজের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই প্রস্তাবিত পর্যালোচনা কমিটির দায়িত্ব হবে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরি করার ক্ষেত্রে সংসদের এবং আইনের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা, যার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

গণতান্ত্রিক শাসন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিভাজন করে সাধারণত তিনটি বিভাগের_ নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা হয়। বহু শতাব্দীর অভিজ্ঞতার আলোকে ও পণ্ডিতদের চিন্তাপ্রসূত সৃষ্ট এ ধরনের ক্ষমতার পৃথক্করণ নীতির (চৎরহপরঢ়ষবং ড়ভ ংবঢ়ধৎধঃরড়হ ড়ভ ঢ়ড়বিৎং) মাধ্যমে উপরিউক্ত তিনটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় এক ধরনের 'চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস' বা ভারসাম্য ও নজরদারিত্বের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এ সম্পর্ক যথাযথভাবে কাজ করছে কি-না তা মূল্যায়ন করাও হবে প্রস্তাবিত পর্যালোচনা কমিটির দায়িত্ব।

কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো, আমাদের দেশে এখন সংসদীয় গণতন্ত্রের খোলসে এটি অনেকটা 'রাষ্ট্রপতিশাসিত' শাসনপদ্ধতি বিরাজমান; কিন্তু এ পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রীই সর্বেসর্বা। যদিও সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাহী ক্ষমতা প্রথাগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের ওপর ন্যস্ত থাকে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী 'ফাস্ট এমাং দি ইকুয়েল' বা সমানদের মধ্যে প্রথম, আমাদের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় তা ভিন্ন। কিন্তু আমাদের সংবিধানে সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে একটি শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় থাকারও অবকাশ নেই। তাই সত্যিকারের সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এসবের পরিবর্তন জরুরি।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদেও শাসন প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর মতের বিরুদ্ধে সংসদে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে, এমনকি ভোটের সময় সংসদে অনুপস্থিত থাকলে পদ হারানোর ভয়ে সংসদ সদস্যরা তাদের বিবেক-বিবেচনা প্রয়োগ করতে পারেন না। এভাবে তাদের বাক-স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়। বস্তুত এর মাধ্যমে তারা প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ হয়ে পড়েন। এছাড়া দল মনোনয়ন দিলেও জনগণই প্রতিনিধি নির্বাচন করে। ফলে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির দল বা দলের নেতৃত্ব দ্বারা সংসদ সদস্যপদ হরণ জনগণের সার্বভৌমত্ব হরণেরই শামিল। তাই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েমের স্বার্থে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ হয় বাদ দিতে, না হয় এর আমূল সংস্কার করতে হবে।

আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো, আমাদের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে কার্যত ক্ষমতাহীন করেছে। একমাত্র প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য সব ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই রাষ্ট্রপতির পক্ষে নিজ বিবেক-বিবেচনা (সরহফ) প্রয়োগের কোনো অবকাশ থাকে না, যা গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার কাঠামোকেই অকার্যকর করে তোলে। কারণ, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির অবস্থান হয়ে পড়ে অনেকটা 'অধস্তন'। এ অবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য সৃষ্টি করা জরুরি। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি পাকিস্তানে এ দুয়ের ক্ষমতার মধ্যে একটি ভারসাম্য আনা হয়েছে, যদিও সেখানে রাষ্ট্রপতির নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করার জন্য আরও প্রয়োজন হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা, যাতে যোগ্য ও মেরুদণ্ডসম্পন্ন ব্যক্তিরা এ গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করার সুযোগ পান। এ লক্ষ্যে সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হওয়ার বর্তমান পদ্ধতির পরিবর্তে একটি বৃহত্তর 'ইলেকটোরাল কলেজ' বা নির্ধারিত নির্বাচকমণ্ডলীর দ্বারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার বিধান করা যেতে পারে। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা হতে পারেন এ নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য। প্রতিবেশী ভারতে এ প্রক্রিয়াতেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকে।

সাংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জাতীয় নীতিনির্ধারণ ও সমস্যা সমাধানের মাধ্যম হলো জাতীয় সংসদ। রাজনীতি সংসদকেন্দ্রিক না হলে রাজপথে তা স্থান পায়, যা সমাধানের পরিবর্তে সমস্যাকে সাধারণত আরও প্রকট, জটিল ও সহিংস করে তোলে। তাই জাতীয় সংসদকে প্রতিনিধিত্বশীল ও কার্যকর করতে হবে। আমাদের সংসদ ক্রমাগতভাবে ব্যবসায়ীদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে। ফলে সংসদ নির্বাচনে সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার থাকলেও প্রকৃতপক্ষে সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই। সত্যিকারের জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো দরকার। তাই সংসদে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথাও আজ গভীরভাবে ভাবতে হবে।

জাতীয় সংসদকে কার্যকর করতে হলে বর্তমান 'সংসদ বর্জনে'র অপসংস্কৃতির অবসান ঘটানো জরুরি। এ জন্য সংসদে অনুপস্থিত থাকার বিধিবিধানকে আরও জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে সবাইকে কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে। এ জন্যও সংবিধান সংশোধন আবশ্যক, যাতে স্পিকারের দলীয় পরিচিতির অবসান ঘটে।

এটি সুস্পষ্ট যে, কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ভালো আইন ও পদ্ধতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, ভালো ব্যক্তি এবং এসব ব্যক্তি থেকে ভালো আচরণ আবশ্যক। প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করলে অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সদাচরণ করতে বাধ্য হবেন। তবে সব প্রতিষ্ঠানে সৎ, যোগ্য ও নির্ভীক ব্যক্তিরা যাতে দায়িত্ব পান, সে জন্য তাদের নিয়োগের পদ্ধতি ও যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিধানকে আরও কঠোর করতে হবে।

সমাজতন্ত্র তথা সামাজিক ন্যায়বিচারের কথায় আসা যাক। স্বাধীনতার প্রায় ৪০ বছর পরও সরকারি হিসাবমতে, আমাদের প্রায় ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে, যদিও দারিদ্র্যসীমারেখা নিয়ে অনেক গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এদের অনেকেই চরম দরিদ্র বলে চিহ্নিত। অর্থাৎ দারিদ্র্য আমাদের জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশের নিত্যদিনের সঙ্গী। আর স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় দারিদ্র্যের হার কমলেও এর সংখ্যা বেড়েছে।

শুধু দারিদ্র্যই নয়, মুষ্টিমেয় ছাড়া আমাদের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী চরম বৈষম্যের শিকার এবং দিন দিন এ বৈষম্য প্রকটতর হচ্ছে। ১৯৯১-৯২ সালে ধনী-দরিদ্রের আয়ের বৈষম্য যেখানে ছিল ১৮ গুণ, ২০০৫ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৩৫ গুণে। অন্যভাবে বলতে গেলে, আমাদের গণতান্ত্রিক শাসনামলে বাংলাদেশে আয়ের অসমতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এছাড়া তৃণমূলের অধিকাংশ মানুষ এখন মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি থেকে চরমভাবে বঞ্চিত। বস্তুত একই ভূখণ্ডে এবং একই পতাকাতলে আমরা একটি চরম অসম ও বিভক্ত জাতিতে পরিণত হয়ে গিয়েছি, আর এ অসমতা দূর না হলে দারিদ্র্যের অবসান হবে না।

এছাড়া স্বাধীনতা অর্জনের ৪০ বছর পরও আমাদের অধিকাংশ জনগণ 'নাগরিক' হতে পারেনি এবং তারা তাদের অধিকাংশ ন্যায্য নাগরিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত। যেটুকুই পায়, তাও ন্যায্য প্রাপ্য হিসেবে নয়, বরং তা পায় সমাজের কিছু প্রতিপত্তিশালীর করুণা হিসেবে। যেমন, থানা থেকে নিরাপত্তা সহায়তা (মামলা গ্রহণ), হাসপাতালে থেকে স্বাস্থ্যসেবা, এমনকি তাদের সন্তানের চাকরির জন্যও প্রভাবশালীদের পক্ষ থেকে তদবিরের প্রয়োজন পড়ে। এ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাধর ও প্রতিপত্তিশালীদের সঙ্গে সাধারণ, বিশেষত দরিদ্র মানুষকে এক ধরনের 'পেট্রোন-ক্লায়েন্ট' বা প্রভু-প্রজার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের সম্পর্ক নাগরিকত্বের ধারণার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। আমাদের সংবিধান এ ধরনের সম্পর্ক সৃষ্টি প্রতিহত করতে পারেনি।

এটি সুস্পষ্ট যে, আমাদের সংবিধান কার্যকারিতা প্রদর্শন করতে পারেনি, অর্থাৎ আমরা সংবিধানকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো বাস্তবে রূপায়িত করতে পারিনি। ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের দেশে কায়েম হয়নি এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার ও তাদের কল্যাণ নিশ্চিত হয়নি। তাই সাংবিধানিক বিধানগুলোয় আজ এমন পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বাস্তবায়নের পথ সুগম করবে। আর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা তা না করলে তাদের বাধ্য করার কিংবা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

এছাড়া আমরা মনে করি, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে অন্য যেসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ তা হলো_ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা পদ্ধতির প্রবর্তন, সংরক্ষিত নারী আসনগুলোতে সরাসরি নির্বাচনের লক্ষ্যে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতির ব্যবহার, প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগের সত্যিকারের পৃথক্করণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, দুদকসহ কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাদান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তত আরও এক টার্ম চালু রাখা, বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতির সঙ্গে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি প্রবর্তন, আদিবাসী-ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোকে যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান ইত্যাদি। আমরা আরও মনে করি, সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সঙ্গে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে শুধু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিলেই হবে না, কারণ সংবিধান শুধু বিশেষজ্ঞদের জন্য নয়।
২২ সেপ্টেম্বর, ২০১০

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক 'সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক'

সূত্র: সমকাল, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s