কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য জোরালো নির্দল কণ্ঠস্বর অপরিহার্য

বদিউল আলম মজুমদার

অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যেসব দেশে গণতন্ত্র কার্যকারিতা লাভ করেছে এবং জনকল্যাণে ভূমিকা রাখছে, সেখানে সংঘবদ্ধ, শক্তিশালী ও প্রতিবাদী নাগরিক সমাজ বিরাজমান। তাই আমরা বিশ্বাস করি, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নিঃস্বার্থ গঠনমূলকভাবে প্রতিবাদী হওয়াই দেশপ্রেম প্রদর্শনের সর্বোত্তম পন্থা।

গত ৩ অক্টোবরের সমকালে প্রকাশিত মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের 'নির্দল নাগরিকদের কণ্ঠস্বর' শিরোনামে লেখাটি পড়ে আনন্দিত হয়েছি। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আমাদের দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিকদের একজন। তিনি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্দলীয় নাগরিকদের ভূমিকা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে 'সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক'-এর প্রসঙ্গ টেনেছেন। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। কারণ, তিনিই প্রথম সাংবাদিক, যিনি সংগঠনটি সম্পর্কে একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দৈনিকে লিখেছেন। 'সুজন'-এর কার্যক্রমকে বেগবান করার লক্ষ্যে প্রদত্ত সুপারিশগুলোর জন্যও আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ঠিকই বলেছেন, 'গণতন্ত্রে নির্বাচিত সরকারই দেশ শাসন করবে। কিন্তু দুঃশাসন বা কুশাসন যাতে করতে না পারে, সে জন্য নির্দল নাগরিক সমাজকে সর্বদা সক্রিয়, সচেতন ও সোচ্চার থাকতে হবে।' এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আর তাহলেই গণতন্ত্র কার্যকারিতা লাভ করবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। বস্তুত 'ইভেন ফ্রিডম ইজ নট ফ্রি' অর্থাৎ স্বাধীনতাও মূল্য ছাড়া অর্জিত ও রক্ষিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন নাগরিকের অনেক আত্মত্যাগ ও অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যেসব দেশে গণতন্ত্র কার্যকারিতা লাভ করেছে এবং জনকল্যাণে ভূমিকা রাখছে, সেখানে সংঘবদ্ধ, শক্তিশালী ও প্রতিবাদী নাগরিক সমাজ বিরাজমান। তাই আমরা বিশ্বাস করি, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নিঃস্বার্থ গঠনমূলকভাবে প্রতিবাদী হওয়াই দেশপ্রেম প্রদর্শনের সর্বোত্তম পন্থা।

নির্দলীয় নাগরিক সংগঠন হিসেবে সুজনের আত্মপ্রকাশ ঘটে ২০০২ সালে 'সিটিজেনস ফর ফেয়ার ইলেকশনস' নামে। ২০০৩ সালের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই এর সৃষ্টি। এ লক্ষ্য অর্জনে, নির্বাচনের সময় তৃণমূলের ভোটারদের পরামর্শের ভিত্তিতে, একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করে বিভিন্ন এলাকার ৫৫টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে প্রার্থীদের তুলনামূলক প্রোফাইল তৈরি করে তা ভোটারদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। একইসঙ্গে প্রার্থী ও ভোটারদের মুখোমুখি অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। একদল স্বেচ্ছাব্রতীর আয়োজনে পরিচালিত উদ্যোগটি ছিল অনেকের কাছেই অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক।

নির্বাচন-পরবর্তী এক জরিপ থেকে দেখা যায়, প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য পেয়ে অনেক ভোটারই তাদের মত পরিবর্তন করে, যার ফলে নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পান। এছাড়া সেসব ইউনিয়নে নির্বাচনও হয় অপেক্ষাকৃত বেশি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। পরে একই ধরনের তথ্য দিয়ে ভোটারদের ক্ষমতায়নের প্রচেষ্টা চালানো হয় অনেক পৌরসভা ও অষ্টম সংসদের বেশ কয়েকটি উপনির্বাচনে। ২০০৩ সালে সংগঠনটির নাম পরিবর্তন করে 'সুজন' রাখা হয়।

পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টে আবু সাফা গংয়ের জালিয়াতি প্রতিরোধ করে প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের (আট) তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার প্রথমে আদালতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা এবং পরে আইনে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে 'সুজন' একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী অবদান রাখে। শুধু আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করেই 'সুজন' ক্ষান্ত হয়নি, এ অধিকার বাস্তবে প্রয়োগের ব্যাপারেও সংগঠনটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। যেমন_ ২০০৮ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হলফনামার মাধ্যমে প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রার্থীদের তুলনামূলক চিত্র তৈরি করে ২৯৯টি আসনে তা বিতরণ করা হয়। এছাড়া আরও কয়েকটি সংগঠনের সহায়তায় ৮৭টি নির্বাচনী এলাকায় ভোটার-প্রার্থী মুখোমুখি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গত আড়াই বছরে অনেক পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনেও একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এসব তথ্য গণমাধ্যমকে প্রদান এবং ওয়েবসাইটেও (িি.িাড়ঃবনফ.ড়ৎম) প্রকাশ করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল ভোটাররা যাতে জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে তাদের সহায়তা করা।

যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটারদের তথ্যভিত্তিক ক্ষমতায়নের এ প্রচেষ্টা ইতিমধ্যেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। যেমন_ ২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত ফরিদপুর-১ আসনে চারদলীয় জোটপ্রার্থী কাজী সিরাজকে, যিনি আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন_ মনোনয়ন প্রদান করে। এ তথ্য প্রকাশের পর প্রথম আলোয় (৯ আগস্ট ২০০৫) 'ফরিদপুর-১ উপনির্বাচন : তথ্য গোপন করেছেন বিএনপি প্রার্থী কাজী সিরাজ' শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এরপর ক্ষমতাসীনরা কাজী সিরাজের মনোনয়ন বাতিল করতে বাধ্য হয়। এমনিভাবে গত সাধারণ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ভুল তথ্য প্রদান ও তথ্য গোপনের কারণে বেশ কয়েকজন অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির প্রার্থিতা বাতিল হয়। আবার এসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে বলেও অনেক দুর্বৃত্ত নির্বাচনী অঙ্গন থেকে নিজেদের দূরে রাখে।

সুজনের আরেকটি বড় অবদান ছিল ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে। অনেকেরই স্মরণ আছে, ২০০৫-০৬ সালে ভোটার তালিকা এবং এতে অন্তর্ভুক্ত ভুয়া ভোটার নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক হৈচৈ হয়। কিন্তু বিচারপতি আজিজের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশন সমস্যাটি সমাধানে ব্যর্থতা প্রদর্শন করে। এমনই প্রেক্ষাপটে সুজনের পক্ষ থেকে প্রায় আট কোটি নাম সংবলিত ভোটার তালিকার ডাটাবেজ তৈরি করে তা ওয়েবে (িি.িংযঁলধহ.ড়ৎম) প্রকাশ করা হয়, যাতে তালিকার ভুলভ্রান্তির ব্যাপকতা সংশ্লিষ্ট সবাই অনুধাবন করতে পারেন। একইসঙ্গে ছবিসহ ভোটার তালিকার ড্যামি তৈরি করেও সুজনের পক্ষ থেকে তা প্রকাশ করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে, আরও অনেকের দাবির মুখে এবং আদালতের নির্দেশে পরে একটি নির্ভরযোগ্য ভোটার তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়, যার ফল হলো একটি ছবিযুক্ত প্রায় নির্ভুল ভোটার তালিকা। সুজনের পতাকাতলে সমবেত একদল 'ডেমোক্রেসি অ্যাক্টিভিস্টে'র এ উদ্যোগের কথা বিশ্ববিখ্যাত 'টাইম ম্যাগাজিনে'ও লেখা হয়।

সুজনের অন্য একটি বড় অবদান হলো নির্বাচন প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার। ২০০৪ সালে গণমাধ্যমের সহায়তায় 'সুজন' একটি সার্বিক সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে উত্থাপন করে। পরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ১১ দল তাদের ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই ঘোষিত 'অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের রূপরেখা'য় এসব প্রস্তাবের প্রায় সবই স্থান পায়। ২২ নভেম্বর ২০০৫ তারিখে পল্টন ময়দানের জনসভায় ১৪ দলের পক্ষ থেকে যে 'অভিন্ন নূ্যনতম কর্মসূচি' ঘোষণা করা হয়, তাতেও এগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়। সুজনের প্রস্তাবগুলো পরে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর সংশোধনের লক্ষ্যে আইনের খসড়া হিসেবে নির্বাচন কমিশনের কাছে পেশ করা হয়, যার অধিকাংশই কমিশন গ্রহণ করে।

রাজনৈতিক দলের সংস্কার, বিশেষত কিছু শর্তসাপেক্ষে দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ছিল সুজনের সংস্কার প্রস্তাবের অন্যতম বৈশিষ্ট, যা পরে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো হলো : দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা, দলের সর্বস্তরের কমিটিতে নারীর উলেল্গখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব, দলের তৃণমূলের সদস্যদের সুপারিশের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রদান এবং ছাত্র-শ্রমিক-পেশাজীবীদের নিয়ে অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনের বিধান দলের গঠনতন্ত্র থেকে বিলুপ্তি। যদিও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এসব শর্ত যথাযথ এবং পরিপূর্ণভাবে এখনও বাস্তবায়ন করেনি, তবুও এগুলো আইনে অন্তর্ভুক্ত হওয়াই ছিল এক ধরনের সফলতা। কারণ অনেকের স্মরণ আছে, ২০০১ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেও তা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে নির্বাচনের আগেই বাতিল করতে বাধ্য হন।

সুজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কতগুলো প্রস্তাব পেশ এবং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত অধ্যাদেশে সেগুলোর অন্তর্ভুক্তি। দুর্ভাগ্যবশত ক্ষমতাসীন সরকার দিনবদলের সনদে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এলেও অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করেনি। এছাড়াও সুজন ও অন্যদের চাপে প্রায় দুই দশক পর উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের মাইলফলক।

সুজনের কার্যক্রমের সর্বাধিক অনুপ্রেরণামূলক দিক হলো, সংগঠনটি সম্পূর্ণভাবে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এবং নিজেদের ও শুভানুধ্যায়ীদের অর্থে পরিচালিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি উপকরণ ছাপার ক্ষেত্রে সরাসরি সহযোগিতা পেয়েছে। অদ্যাবধি দাতাদের কাছ থেকে সংগঠনটি কোনো অর্থ গ্রহণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও তা করবে না। এটি একটি দাতানির্ভর এনজিও নয় এবং দাতাদের হুকুমেও সংগঠনটিকে চলতে হয় না। তাই আর্থিক সংকট সুজনের একটি চলমান সমস্যা।

সুজনের নেতৃত্ব নির্বাচন দুই মেয়াদের জন্য সীমিত করার এবং ভবিষ্যতে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের প্রস্তাবে আমাদের নিজেদের মনের কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। সংগঠনটি সৃষ্টির শুরু থেকেই আমরা এ ব্যপারে নিষ্ঠার সঙ্গে চেষ্টা করে আসছি। কিন্তু কাউকেই সভাপতি এবং সম্পাদকের দায়িত্ব নিতে এ পর্যন্ত আমরা রাজি করাতে পারিনি। দুর্ভাগ্যবশত সবাই দাবি করেন, তারা ব্যস্ত_ আসলেই সব করিতকর্মা ব্যক্তিই গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত। এছাড়া এটি একটি স্বপ্রণোদিত, স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক কাজ। উপরন্তু এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। নির্দলীয় নাগরিক সমাজকে আমাদের দেশে অনেক ধরনের অসম্মানজনক ঠাট্টা-মাশকরার শিকার হতে হয়। অনেক সমালোচনা, এমনকি হুমকির মুখোমুখিও হতে হয়। টেলিফোনে প্রতিনিয়তই আমরা 'দেখে নেওয়ার' হুমকিও পেয়ে থাকি।

সর্বোপরি, ফায়দাতন্ত্রের লাগামহীন ব্যাপ্তির কারণে নাগরিক সমাজ আমাদের দেশে আজ দারুণ দুরবস্থার মধ্যে নিপতিত। নব্বইয়ের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী ও অন্যান্য পেশাজীবীর সমন্বয়ে গঠিত একতাবদ্ধ নাগরিক সমাজ_ যে নাগরিক সমাজ এরশাদের পতন ঘটিয়েছিল_ তারা এখন বিভক্ত এবং মূলত প্রধান দুই দলের অনুগত। মুক্তবুদ্ধির চর্চার পাদপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন মূলত সাদা-নীলের খেলার আখড়া। এর মূল কারণ হলো ফায়দাতন্ত্র ও অন্যায়ের প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের খৰহস্ত। বস্তুত আজ নির্দল ও নিরপেক্ষ থাকার এবং সত্যকথনের মূল্য অতিউচ্চ, যে মূল্য দিতে হয় ন্যায্য নাগরিক প্রাপ্য থেকে বঞ্ছনা, হয়রানি, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে জীবনের বিনিময়ে।

এসব কারণেই সম্ভবত আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নির্দলীয় সংগঠন গড়ে তুলতে এবং এগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে চান না। কোনো সভায় এসে একটি বক্তৃতা দিয়েই তাদের অনেকেই মনে করেন, তারা দেশ-জাতির জন্য অনেক কিছু করে ফেলেছেন! পক্ষান্তরে প্রতিবেশী ভারতের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও মানবাধিকার কমিশনের সাবেক প্রধান কর্ণাটক প্রদেশের 'ইলেকশান ওয়াচে'র, যা একটি নাগরিক সংগঠন, প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রসঙ্গত, কতগুলো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং সংঘবদ্ধ নাগরিক সমাজের সোচ্চার ভূমিকাই ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রাহুমুক্ত ও সুদৃঢ় ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে। অর্থাৎ কতগুলো প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠলে এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ব্যাপকভিত্তিক নির্দল নাগরিক সংগঠন সৃষ্টি না হলে কোনো দেশে গণতন্ত্র কার্যকর হয় না এবং টিকেও থাকে না।

পরিশেষে কেন আমরা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছি_ প্রতিনিয়তই এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমাদের হতে হচ্ছে। কী আমাদের স্বার্থ? আমার এক শ্রদ্ধাভাজন রাজনীতিবিদ আমাকে একদিন প্রশ্ন করেন : তিনি রাজনীতি করেন মন্ত্রী হওয়ার অভিপ্রায়ে, কিন্তু আমি কেন 'সুজনে'র কার্যক্রম পরিচালনায় অক্লান্ত পরিশ্রম করছি? সুদীর্ঘ আলোচনার পরও তাকে আমার বোঝাতে অতিকষ্ট হয়েছে যে, যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বহু ব্যক্তি ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊধর্ে্ব উঠে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়েছে, এমনকি চরম আত্মত্যাগও করেছে_ আমাদের বীর মুত্তিযোদ্ধারা যার উৎকৃষ্টতম উদাহরণ। মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্পূর্ণ কার্য সম্পাদন করতে আমাদের নাগরিকরা, বিশেষত চিন্তাশীল নাগরিকরা কি আজ এগিয়ে আসবেন?
৫ অক্টোবর, ২০১০

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক 'সুজন_সুশাসনের জন্য নাগরিক'

সূত্র: সমকাল, ৬ অক্টোবর ২০১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s