দিন বদলের জন্য চাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন

গত ১১ অক্টোবর ২০১০ জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভি আই পি লাউঞ্জে দিনবদলের সনদ: প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও করণীয় শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গত ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ এ অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট অবিস্মরণীয় বিজয় লাভ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে মহাজোটের এ বিপুল বিজয়ের নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ’দিনবদলের সনদ’ শিরোনামের নির্বাচনী ইশতেহার। ইতোমধ্যেই নির্ধারিত মেয়াদের এক তৃতীয়াংশের বেশি সময়কাল অতিবাহিত করেছে সরকার। এমতাবস্থায় সরকার ইশতেহারে ঘোষিত অঙ্গীকারসমূহের বাস্তবায়নের কোন পর্যায়ে অবস্থান করছে, সে সম্পর্কে মতবিনিময়ের লক্ষ্যে সচেতন নাগরিকদের ফোরাম ’সুজনে’র পক্ষ থেকে এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সুজন সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এ এস এম শাহজাহান। ’দিনবদলের সনদ: প্রাপ্তি ও অগ্রগতি’ বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে দিন বদলের সনদের মূলত উল্লেখযোগ্য অঙ্গীকারের বিপরীতে দেশের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন। গত ২০ মাসে ক্ষমতাধরদের সম্পদের হিসাব প্রদান, সংসদ সদস্যদের জন্য একটি আচরণ বিধি প্রণয়ন, সরকারি দলের মদদে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্রর চর্চার অবসান, দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে জোরদারকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের আস্থা অর্জনকারী কার্যক্রম করতে পারলে ভালো হতো বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

আলোচনায় অংশ নেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব:) মাহবুবুর রহমান, রাজনীতিবিদ জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না, জনাব আ স ম আবদুর রব, জনাব শেখ শহীদুল ইসলাম, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খান, বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব ইনাম আহমেদ চৌধুরী, কলামিস্ট জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ, উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব জিয়াউল হক সরকার, অধ্যাপক কামাল আতাউর রহমান, জনাব রেহানা সিদ্দিকী, উন্নয়ন কর্মী ইঞ্জিনিয়ার মুজবাহ আলীম ও মো. জাকারিয়া, ছাত্রনেতা ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল ও তানভীর রুশমত প্রমূখ।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার তার অঙ্গীকার কতটা কার্যকর করছে তা দেখা। সরকারকে নাগরিকের প্রতি দায়বদ্ধ রাখার চেষ্টা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। দু:খের বিষয় হলো, রাজনীতিতে আত্ম সমালোচনার চাইতে আত্মতোষণ এবং পদলেহনের প্র্বণতা বেড়ে গেছে যা আমাদের অগ্রগতির    অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান বলেন, দিন বদল হচ্ছে কিন্তু আমরা আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছি। গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। সংসদ অকার্যকর। করণীয় হিসেবে তিনি বলেন, অব্যবস্থাপনা এবং দু:শাসনের বিরুদ্ধে মানুষকে জড়িত করতে হবে। সুজনে’র মতো মানুষকে, জাতিকে সচেতন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আ স ম আবদুর রব সরকারকে গণতন্ত্র থেকে রাজতন্ত্রে ফিরে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দিন বদলের প্রত্যাশাটা পূরণ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, জনগণ আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র বৃত্তে বন্দী হয়ে পড়েছে। দলগুলোর অভ্যন্তরে পরিবর্তন আনা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। দলের ভিতরে বাইরে পরিবর্তনের চেষ্টা রাজনীতিবিদদের করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে সুজন; ‘আঁধার’ হতে পারে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, জনপ্রশাসন বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। জনপ্রশাসনকে বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে মুক্ত ও নিরপেক্ষ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। তিনি বিরোধী দলের সাংসদদের সংসদে যেতে অনুরোধ করেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদে গিয়ে কথা বলতে না পারলে ওয়াক আউট কিংবা পদত্যাগ করার পরামর্শ দেন। জনাব আবুল মকসুদ বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারকে গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিকদের মন্তব্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

আলোচনায় বিগত ২০ মাসে আওয়ামী লীগ সরকার বেশ কিছু ক্ষেত্রে যে সফলতা অর্জন করেছে সেগুলোও উঠে আসে যেমন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন, বিদ্যুৎ -জ্বালানী খাতের সমস্যার সমাধান, কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়নে ব্যাপক ভর্তুকি প্রদান, শিক্ষানীতি প্রণয়ন প্রভৃতি। এছাড়া জঙ্গিবাদ দমনেও সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের সবচাইতে বড় ব্যর্থতা হিসেবে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া দুদককে শক্তিশালীকরণ, দুর্নীতি দমন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করায় তেমন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছেনা বলে বক্তাগণ অভিমত দেন।

Key Note Paper

Advertisements