স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না

গত ২৩ নভেম্বর ২০১০ সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক এর উদ্যোগে ভিআইপি লাউঞ্জ, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ‘গণতন্ত্র সুসংহতকরণ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক। বৈঠকে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সমূহের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবী করে বলা হয়, তৃণমূলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া একমাত্র নির্বাচিত সংসদকেন্দ্রিক কাঠামো সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি কায়েমের পরিবর্তে এক ধরনের প্রহসনমূলক (রষষঁংরাব), অস্থিতিশীল পদ্ধতির জন্ম দেয়; যা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সুসংহত ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বক্তারা বলেন, সর্বস্তরে কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে।

স্থানীয় সরকারের যে সকল আইন আছে সেখানে অনেক বৈষম্য রয়েছে সেগুলো নিরসনের এবং অনাকাক্সিক্ষত কিছু বিষয় আছে যা দ্রুত সংশোধনের দাবী জানানো হয়। নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির খুঁটি স্বরূপ বলে উল্লেখ করা হয় কারণ এগুলোর মাধ্যমে তৃণমূলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় তাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে তৃণমূল পর্যায় থেকে তা সুসংহত করার আবেদন জানানো হয় সরকারের কাছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের বিষয়ও আলোচনায় ওঠে আসে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বর্তমানে এ দায়িত্ব পালন করে। দায়িত্বটি নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়ার দাবিও উত্থাপিত হয়।

সুজন সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ এর সভাপতিত্বে উক্ত আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি জনাব আ ক ম মোজাম্মেল হক, রাজনীতিবিদ জনাব আ স ম আবদুর রব ও জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না; সুজন সহ-সভাপতি এবং টিআইবি’র চেয়ারম্যান জনাব এম হাফিজউদ্দিন খান, বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব ইনাম আহমেদ চৌধুরী, কলামিস্ট জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজমুদার প্রমুখসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকগণ।

‘গণতন্ত্র সুসংহতকরণ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন’ বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি তার প্রবন্ধে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্র চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সত্যিকারের গণতন্ত্র চর্চা মানে যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ, সেখানেই আবশ্যক নির্বাচন ও জনগণের সম্মতির শাসন। তা না হলে গণতন্ত্রের নামে নাগরিকগণ হয় প্রতারিত। কারণ রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে নাগরিকের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার প্রধান হাতিয়ারই হলো তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ।

আলোচনায় অংশ নেন আমন্ত্রিত অতিথিগণ। এম হাফিজ উদ্দিন খান বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা বলে উল্লেখ করেন। স্বশাসিত ইউনিয়ন পরিষদ এডভোকেসি গ্র“পের সম্পাদক মতিউর রহমান তপন দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবী জানান। আ স ম আবদুর রব বলেন, আমাদের দেশের সরকারগুলো দলতন্ত্রে বিশ্বাসী সরকার। তিনি বলেন, দলতান্ত্রিক আচরণ অগণতান্ত্রিক আচরণকে উৎসাহিত করে, স্বৈরাচারকে উৎসাহিত করে। মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সরকার এবং রাষ্ট্রের চরিত্র হয়ে গেছে লুটেরা টাইপের। নত হওয়াটাই এখন রাজনীতি হয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একটি বাড়ি নিয়ে বাড়াবাড়ি, হরতাল-ধর্মঘট নিয়ে জাতিকে এখন ভাবতে হচ্ছে যা দুঃখজনক।

ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বর্তমান সরকার ততক্ষণ ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন দেবেন না যতক্ষণ না তাদের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। আর মাননীয় সংসদ সদস্যরা ক্ষমতাকে তাদের কুক্ষীগত রাখার জন্য স্থানীয় সরকার এর নির্বাচন যথাসময়ে হোক এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হোক, তা চান না। ড. তোফায়েল আহমেদ হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে গঠিত সংগঠন সমূহ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জোরালো দাবী উঠছে না যা দুঃখজনক। বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ এসোসিয়েশনের সভাপতি হারুনুর রশীদ হাওলাদার স্থানীয় সরকার পরিচালনায় স্থানীয় সরকার কমিশনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। টঙ্গী পৌরসভার চেয়ারম্যান জনাব আজমত উল্লাহ খান বলেন, আইনগতভাবে স্থানীয় সরকারকে প্রথমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে তারপর গণতন্ত্র চর্চা।

আ ক ম মোজাম্মেল হক উপস্থিত সকলকে আশ্বস্ত করে বলেন, স্থানীয় সরকারের আইনের কিছু অসঙ্গতি আছে সেগুলো দূর করে সংসদের আগামী অধিবেশনে আইন পাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী মার্চ-এপ্রিলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি উপজেলা আইনে মাননীয় সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা করার বিধানকে অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে আরো আলোচনায় অংশ নেন সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল, ময়মনসিংহ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব ফয়জুর রহমান ফকির, নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা চেয়ারম্যান ডা. আইভী, উন্নয়নকর্মী ইঞ্জিনিয়ার মুসবাহ আলীম প্রমুখ।

Advertisements