ডিসিসি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা

বদিউল আলম মজুমদার

ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করার আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিসহ অন্যান্য স্বার্থসংশিল্গষ্ট ব্যক্তি ও ব্যক্তি সমষ্টির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা আবশ্যক। কারণ সিদ্ধান্তটি হওয়া উচিত সুচিন্তিত ও বুদ্ধিভিত্তিক।

গত ২ নভেম্বর ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে সরকারের অনীহার কথা বলতে গিয়ে আমাদের নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করেন, 'ডিসিসি নিয়ে সরকারের রাজনৈতিক পরিকল্পনা থাকতে পারে' (যুগান্তর ৩ নভেম্বর, ২০১০)। কয়েকদিন আগে 'প্রথম আলো'তে (২১ নভেম্বর ২০১০) প্রকাশিত 'উত্তর-দক্ষিণে দুই ভাগ হচ্ছে ঢাকা সিটি করপোরেশন' শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা গেল সরকারের রাজনৈতিক পরিকল্পনা। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে এ ব্যাপারে আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।

বিপুল জনসংখ্যা আর বিশাল আয়তনের ঢাকা মহানগরকে ভাগ করে দুটি পৃথক সিটি করপোরেশন গঠন করা যেতেই পারে_ এতে দোষের কিছু নেই। এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিতও হতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে কী উদ্দেশ্য নিয়ে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সিদ্ধান্তটি যদি রাজনৈতিক ফায়দা লোটার পরিবর্তে জনকল্যাণের বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে তা ইতিবাচক ফলই বয়ে আনবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়েই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। নির্বাচন না হলে এবং অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালিত হলে আইনগতভাবে স্থানীয় সরকার গঠিত হয় না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে, সরকার দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরে দুটি নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির কথাই ভাবছে। মেয়র সাদেক হোসেন খোকাসহ নির্বাচিত, যদিও মেয়াদোত্তীর্ণ, কাউন্সিলরদের অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে যদি ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করা হয়, তা হবে অনাকাঙ্ক্ষিত। উলেল্গখ্য, আইনের বিধান অনুযায়ী, শুধু নতুন সিটি করপোরেশন সৃষ্টির ক্ষেত্রেই প্রশাসক নিয়োগ সম্ভব।

সিটি করপোরেশন তথা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্দেশ্য মোটা দাগে তিনটি। প্রথমত, এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ অর্জিত হয়। দ্বিতীয়ত, কার্যকর স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সব সরকারি সেবার মানোন্নয়ন সম্ভব। তৃতীয়ত, সাধারণ জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

বিকেন্দ্রীকরণ বলতে সাধারণভাবে ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব, সম্পদ ইত্যাদি কেন্দ্রীয় সরকার থেকে নিম্নস্তরের কাঠামোর কাছে হস্তান্তরকে বোঝায়। তবে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ সাধিত হয় তখনই, যখন এগুলো নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে হস্তান্তরিত হয়। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের জন্য নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রশাসনের সব একাংশ বা স্তরে (administrative unit) যেমন_ জেলা, উপজেলা ইত্যাদিতে প্রয়োগ হয়ে থাকে। গণতান্ত্রিক শাসনের মূল কথা হলো, যেখানেই সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ, সেখানেই জনপ্রতিনিধিদের শাসন। অর্থাৎ নির্বাচনের মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে জেলা পরিষদ, উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ ইত্যাদি গঠিত হলেই সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়_ শুধু নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে কেন্দ্রে সরকার গঠিত হলেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র কায়েম হয় না, বরং তা হয় গণতন্ত্রের নামে এক ধরনের প্রতারণা ও প্রহসন (illusion)। এর মাধ্যমে আংশিক বা এক ধরনের 'বিকৃত' গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু গণতন্ত্র আংশিক হয় না। পক্ষান্তরে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার গঠনের মাধ্যমেই 'গ্রাসরুট ডেমোক্রেসি' বা তৃণমূলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সত্যিকারের স্বশাসন কায়েম হয়। তাই একমাত্র নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ক্ষমতা, দায়-দায়িত্ব, সম্পদ হস্তান্তরিত হলেই গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ অর্জিত হয়। এ ধরনের বিকেন্দ্রীকরণকে 'ডেভল্যুয়েশন' (devolution) বলে আখ্যায়িত করা হয়।

উলেল্গখ্য, প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনের সূচনা হলেও, এর ফলে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিশ্চিত হয় না। বরং তা নির্ভর করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আচরণ এবং তাদের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি চর্চা ও কার্যক্রমের ওপর। অর্থাৎ নির্বাচনের মাধ্যমে সূচিত গণতান্ত্রিক শাসনের কার্যকারিতা নির্ভর করে দুই নির্বাচনের মাঝখানে কী ঘটে না-ঘটে তার ওপর।

গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের একটি বড় যৌক্তিকতা হলো যে, এর মাধ্যমে জনগণের কাছে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যায়। গণতন্ত্র হলো জনগণের সম্মতির শাসন। নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিরা এ সম্মতি অর্জন করেন। জনগণের স্বার্থে ও কল্যাণে কাজ করার জন্য তারা ক্ষমতায়িত হন। তবে তাদের ম্যান্ডেট সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হলেও, তারা সরকারি ক্ষমতা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করতে পারেন, যা আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত ঘটে থাকে। তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতা, বিশেষত জনগণের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। এ ধরনের দায়বদ্ধতা শুধু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। যেমন, নতুন ইউনিয়ন পরিষদ আইনে 'ওয়ার্ডসভা'র বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা বছরে অন্তত দু'বার ভোটারদের মুখোমুখি হতে বাধ্য থাকবেন। উলেল্গখ্য, ক্ষমতার পৃথক্করণ নীতির (principles of separation of powers) মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাকে নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে বিভাজন করে কেন্দ্রীয় সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়, যদিও এর মাধ্যমে সরাসরি জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

'সাবসিডিয়ারিটি' (subsidiarity) তত্ত্ব হলো, গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের স্বীকৃত পন্থা। সাবসিডিয়ারিটি তত্ত্বের মূলকথা হলো সমস্যা যেখানে, সমাধানও সেখানে। অধিকাংশ সমস্যাই তৃণমূলের, যেখানে জনগণ বসবাস করে; তাই সমস্যাগুলো (যেমন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়ঃনিষ্কাশন ইত্যাদি) প্রথমেই সর্বাধিক নিম্নস্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের (যেমন, ইউনিয়ন পরিষদের) মাধ্যমে সমাধানের প্রচেষ্টা চালানো উচিত। যেসব সমস্যা সর্বাধিক নিম্নস্তরে সমাধান সম্ভব নয়, সেগুলো তার ওপরের স্তরে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। পরের সমস্যাগুলো তার পরবর্তী স্তরে…। এ পদ্ধতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব হয়ে পড়ে অত্যন্ত সীমিত। অর্থাৎ সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ঘটলে মূলত স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়।

আমাদের প্রশ্ন হলো, সরকার কি গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্য নিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নাকি রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে? গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ যদি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, যা নিয়ে আমাদের গুরুতর সন্দেহ রয়েছে তাহলে প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশন দুটিকে যথাযথ 'ফাংশনস' (functions) বা দায়দায়িত্ব, 'ফ্রিডম' (freedom) বা স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসন, 'ফিন্যান্স' (finance) বা সম্পদ এবং 'ফাংশনারিজ' (functonaries) বা জনবল প্রদান [যাকে বিশেষজ্ঞরা 'ফোর এফ' (four F) বলে আখ্যায়িত করেন]। জনবলের ব্যবস্থা করার জন্য সরকার 'স্থানীয় সরকার ক্যাডার' সৃষ্টি করতে পারে। উলেল্গখ্য, সত্যিকারের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটলে, সিটি করপোরেশনগুলো 'সিটি গভর্নমেন্টে'র রূপ ধারণ করবে, যা আমাদের সিটি মেয়রদের অনেক দিনের দাবি। আমরা বিশ্বাস করি, সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্য নিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ভাগ করা না হলে তা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সুফল বয়ে আনবে না।

ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ভেঙে দুটি নতুন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গঠনের আরেকটি যৌক্তিকতা হলো, সেবা প্রদানে অধিক কার্যকারিতা। যদি অতীতের মতো নবগঠিত প্রতিষ্ঠান দুটিকে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং এগুলোকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন দেওয়া না যায়, ঢাকার সিটি করপোরেশনগুলোর জন্য কেন্দ্র থেকে সম্পদ দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না_ তাহলে এগুলোকে জনগণের প্রয়োজনীয়তার প্রতি 'রেসপনসিভ' হওয়ার এবং তাদের সেবার মান উন্নয়নেরও কোনো কারণ আমরা দেখতে পাই না। ফলে এ উদ্যোগ নতুন বোতলে পুরনো পানীয় ঢালার সমতুল্যই হবে বলে আমরা মনে করি।

আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের যুক্তিতে আসা যাক। আমাদের সংবিধানের ৫৯(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, শুধু জনকল্যাণমূলক সরকারি সেবা প্রদানই নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত সব পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নও স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আমলাতন্ত্রের অধীনে শৃঙ্খলিত রেখে এবং অনেক ক্ষেত্রে 'এমপিরাজ' প্রতিষ্ঠার গুটি হিসেবে ব্যবহার করে কোনোভাবেই সংবিধানের এ নির্দেশনা বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। তাই গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্য নিয়ে ঢাকাকে বিভক্ত করা হলেই, যার ফলে সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বায়ত্তশাসিত 'সরকার' হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে, ইতিবাচক ফল সৃষ্টি হবে বলে আমরা মনে করি। তবে অনেকের আশঙ্কা, বিভক্ত হলে সিটি করপোরেশন দুর্বল হয়ে পড়বে, ফলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা, এমনকি জোরদার করা সম্ভব হবে।

আরেকটি প্রশ্ন হলো সিটি করপোরেশনের বর্তমান কাঠামো সম্পর্কিত। বর্তমানে সিটি করপোরেশনসহ সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন মেয়র/চেয়ারম্যান তথা একব্যক্তিকেন্দ্রিক। এ পদ্ধতিতে অন্যান্য নির্বাচিত প্রতিনিধির নেতৃত্ব প্রদর্শনের এবং অবদান রাখার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তাই করপোরেশনকে ছোট করেও এর পরিচালনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন না আনলে প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আমাদের মনে হয় না। তাই করপোরেশনকে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে মেয়র নির্বাচন পদ্ধতির এবং অভ্যন্তরীণ বিকেন্দ্রীকরণের বিষয় নিয়েও গভীরভাবে ভাবতে হবে।

এ কথা আজ কারও অজানা নয়, ঢাকা সিটি করপোরেশন বর্তমানে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি করপোরেশনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। ঢাকা মহানগরের যে কোনো বাসিন্দাই, যার করপোরেশনের সঙ্গে কোনোরূপ সম্পৃক্ততা আছে, এর ভুক্তভোগী। এছাড়াও করপোরেশনের সব কার্যক্রম ফায়দা বিতরণের হাতিয়ার হিসেবেই এবং সিন্ডিকেট দ্বারা পরিচালিত হয় বলেই অনেকের ধারণা। তাই দুর্নীতি ও ফায়দাতন্ত্রের অবসানের জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিভক্তির মাধ্যমে ঢাকা সিটি করপোরেশনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা অসম্ভব।

দুর্বৃত্তায়নের কথায় আসা যাক। আমাদের বর্তমান এবং নিকট অতীতের সিটি কমিশনারদের অনেকের বিরুদ্ধেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি তথা দুর্বৃত্তায়নের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অনেকে সন্ত্রাসের গডফাদার হিসেবেও পরিচিত। তাদের অনেকেই গানম্যানের পাহারা ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। তাই সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগতমানে পরিবর্তন আনার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কীভাবে করপোরেশনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা যাবে, তাও আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।

প্রসঙ্গত, প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসক নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ কুদরাত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ মামলার [৪৪ডিএলআর(এডি)১৯৯২] সর্বসম্মত রায়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন : '… (স্থানীয় সরকারের) উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা স্থানীয় কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনা। যদি সরকারি কর্মকর্তা কিংবা তাদের তল্পিবহদের স্থানীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় জড়িত করা হয়, তাহলে এগুলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখার যৌক্তিকতা থাকে না।' মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগে নির্বাচনের আয়োজন করে অতি সহজেই এ সমস্যার সমাধান করা যায়। এছাড়াও বিদ্যমান সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে প্রশাসক নিয়োগের কোনো বিধান আইনে নেই।

পরিশেষে, গণমাধ্যমের বদৌলতে আমরা জেনেছি, ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্তটি প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন ঢাকার সব সংসদ সদস্যকে নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি সভায়। এ ধরনের অ্যাডহক সিদ্ধান্ত আমাদের মধ্যে আশঙ্কার সৃষ্টি করে। এছাড়াও আমরা আশঙ্কিত, কারণ কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় আমাদের কাছে সুস্পষ্ট যে, আমাদের সংসদ সদস্যরা তাদের সংসদকেন্দ্রিক জাতীয় দায়িত্ব এবং সংবিধান ও আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্থানীয় সরকারের কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখতেই অধিক আগ্রহী এবং বর্তমান সরকারও সারাদেশে এক ধরনের 'এমপিরাজ' সৃষ্টিতে বদ্ধপরিকর। এছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরাই একমাত্র স্বার্থসংশিল্গষ্ট ব্যক্তি নন। তাই আমরা মনে করি, ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করার আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিসহ অন্যান্য স্বার্থসংশিল্গষ্ট ব্যক্তি ও ব্যক্তিসমষ্টির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা আবশ্যক। কারণ সিদ্ধান্তটি হওয়া উচিত সুচিন্তিত ও বুদ্ধিভিত্তিক।
৩০ নভেম্বর, ২০১০

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

 সূত্র: সমকাল, ২ ডিসেম্বর ২০১০

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s