দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আত্মঘাতী

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
১ জানুয়ারির দৈনিক ইত্তেফাকে একটি ছোট প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা অনেকেরই হয়তো দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল- 'পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক খুনাখুনির ঘটনা উদ্বেগজনক : চিদাম্বরম'। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে সমপ্রতি লিখিত এক চিঠিতে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক খুনের ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজ্যের অনেক স্থানে আইনশৃংখলা বলে যে কিছু নেই তা এসব খুনাখুনির ঘটনায় প্রমাণিত। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন, দলীয় ক্যাডাররাই যদি রাজ্যের আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্ব হাতে তুলে নেয় তাহলে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা কী? এ প্রতিবেদনটি প্রণিধানযোগ্য এবং এটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

আমাদের বর্তমান সরকার দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সে সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন প্রথমবারের মতো দলভিত্তিক অনুষ্ঠিত হবে। পশ্চিমবাংলার পঞ্চায়েত ও গ্রাম উন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী আনিসুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে ৪ আগস্ট, ২০১০ স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রথম দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দেন। আমরা মনে করি, সার্বিক বিবেচনায় এ সিদ্ধান্তটি আত্মঘাতী।

বহুদিন থেকেই আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় 'পৌরসভা (নির্বাচনী আচরণ) বিধিমালা ২০১০'-এ বলা হয়, 'নির্বাচনী প্রচারণায় কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নিজ ছবি ও প্রতীক ব্যতীত অন্য কাহারো নাম, ছবি বা প্রতীক ছাপাইতে কিংবা ব্যবহার করিতে পারিবেন না।' জাতীয় ইস্যুর ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না, তাই পৌরসভা নির্বাচনকে দলনিরপেক্ষ রাখার উদ্দেশ্যেই এই বিধান করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালার এ ধারা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দলভিত্তিক নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে পছন্দ হয়নি বলে বিধিমালাটিকে তারা সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করেছে। এ সিদ্ধান্ত কোনভাবেই সরকারের এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার প্রতিফলন নয়।

আমাদের অনেক রাজনীতিবিদই নির্দলীয় নির্বাচনের বিপক্ষে, কারণ তারা মনে করেন, দলনিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা হবে অরাজনৈতিক বা রাজনীতি বিবর্জিত। তাদের কাছে রাজনীতি মানেই দল- দল ছাড়া তারা রাজনীতির কথা ভাবতেই পারেন না, ফলে দলীয় পরিচয়ের বাইরের নির্বাচনকে তারা 'বিরাজনীতিকীকরণ' বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু 'নির্দলীয়' আর 'অরাজনৈতিক' শব্দ দুটি সমার্থক নয়। বস্তুত নির্বাচনই একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যা দলভিত্তিক হতে পারে কিংবা নির্দলীয়ও হতে পারে। এছাড়াও দলনিরপেক্ষ হলেও দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোন বাধা থাকে না, তাই নির্দলীয় নির্বাচনকে বিরাজনীতিকীকরণ প্রক্রিয়া বলা কোনভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।

দুর্ভাগ্যবশত আমাদের উচ্চ আদালতও মনে হয় যেন এ ধরনের ধারণাগত অস্পষ্টতার শিকার। পৌরসভা নির্বাচন রাজনৈতিক দলভিত্তিক করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রণীত পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০০৮-এর ৩ ধারা অবৈধ ঘোষণা করে ২০০৮ সালে প্রদত্ত রায়ে (মোঃ জসীম উদ্দীন সরকার বনাম বাংলাদেশ, রিট পিটিশন নম্বর ৪৯৬৩, সাল ২০০৮) বাংলাদেশ হাইকোর্টের ২০০৮ সালের একটি বেঞ্চ বলেন : 'বাংলাদেশের সংবিধান ইহার ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ মারফত স্থানীয় শাসন ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছে কিন্তু তাহা নির্দলীয় বা রাজনীতি বিবর্জিত হইবে এইরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে নাই। যেখানে সংবিধান স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতি বারিত করে নাই সেই অবস্থায় অধ্যাদেশ বা বিধিমালা প্রণয়ন করত স্থানীয় সরকার পর্যায়ে জনগণের রাজনীতি বারিত করিবার পদক্ষেপ অসাংবিধানিক।'

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনীতি একটি প্রক্রিয়া- সব স্বার্থ-সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া- যা দলকে সম্পৃক্ত করেও হতে পারে, না করেও হতে পারে। বস্তুত 'পলিটিক্স' বা রাজনীতি শব্দের উৎপত্তি গ্রিক শব্দ 'পলিস' (ঢ়ড়ষরং) থেকে, যার অর্থ নগরভিত্তিক-রাষ্ট্র (পরঃু-ংঃধঃব)। তাই 'পলিটিকাল একটিভিটিসে'র (ঢ়ড়ষরঃরপধষ ধপঃরারঃরবং) বা রাজনৈতিক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য দল সৃষ্টি নয়, দলীয় ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনাও নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিরোধ অবসান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এর সঙ্গে দলের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই- যদিও দল রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তাই নির্দলীয় নির্বাচনের অর্থ রাজনীতি বিসর্জন নয়।

রাজনৈতিক দলের মনোনয়নের ভিত্তিতে না করার কারণে বিরাজনীতিকীকরণের অভিযোগ তুললেও, বস্তুতপক্ষে আমাদের দেশে বিরাজনীতিকীকরণ হয়েছে মূলত 'মনোনয়ন বাণিজ্যে'র ফলে। অর্থ নিয়ে কিংবা অন্য কোন সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে অতীতে আমাদের দেশে মনোনয়ন, বিশেষত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন 'বিক্রি' হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদরা মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে আমাদের সংসদ হয়ে পড়েছে অনেকটা কোটিপতিদের প্রাইভেট ক্লাবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার পক্ষে একাধিক শক্ত যুক্তি রয়েছে। প্রথমত, এর মাধ্যমে ভোটারদের 'চয়েস' বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক সমাজসেবী আছেন, যারা কোন দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন বা যুক্ত হতে চান না, যদিও এ ধরনের ব্যক্তির সংখ্যা সমাজে দিন দিন কমে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছেন যারা অত্যন্ত যোগ্য, সম্মানিত এবং স্থানীয় মানুষের আস্থাভাজন। দলীয়ভিত্তিতে নির্বাচন হলে এসব ব্যক্তি নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে, ফলে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, যা নিঃসন্দেহে জনকল্যাণ ব্যাহত করে।

নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে আরেকটি যুক্তি হল, এর মাধ্যমে দলবাজির সর্বনাশা প্রভাব তৃণমূলে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব। রাজনৈতিক দল গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু দলবাজি সম্পূর্ণই অনাকাঙ্ক্ষিত। বস্তুত রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের চালিকাশক্তি এবং দল ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না। কিন্তু দলবাজি প্রতিফলিত হয় দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য, দলাদলি, দলীয়করণ ও দলীয় বিবেচনায় সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সুযোগ-সুবিধা বিতরণ এবং এর বিরূপ প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক। পশ্চিমবাংলার ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি এবং সিপিএম এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ক্যাডারদের মধ্যে প্রতিনিয়ত মারামারি বহুলাংশে দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচনেরই বিষফল বলে অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা। আমরা কি সেদিকে যেতে চাই?

দুর্ভাগ্যবশত দলবাজি ইতিমধ্যেই আমাদের গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ফলে নব্বইয়ের শুরুতে একতাবদ্ধ হলেও আমরা আজ চরমভাবে একটি বিভক্ত জাতি। আর এই বিভক্তি এবং পারস্পরিক হানাহানি জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা হল, যে জাতি যত ঐক্যবদ্ধ, তারা তত উন্নত ও সমৃদ্ধ।

দলভিত্তিক নির্বাচনের মাধ্যমে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যেই নয়, দলের অভ্যন্তরেও কোন্দল সৃষ্টি হতে পারে, যার পরিণতি অশুভ না হয়ে পারে না। এ দলাদলি অহেতুক। কারণ দল মনোনয়ন প্রদান থেকে বিরত থাকলে, দলের সর্বাধিক জনপ্রিয় ব্যক্তি নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ পেত, যেমনি ঘটেছে গত উপজেলা নির্বাচনে। এতে দল কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো না। পক্ষান্তরে দলভিত্তিক নির্বাচনের এ আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণে বর্তমানে দলের মধ্যে মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ির কথা প্রতিদিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। এরই মধ্যে যা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কয়েকদিন আগে ঝিনাইদহে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে সহিংসতার কারণে তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের সহিংসতা আরও ব্যাপক হবে বলে অনেকে আশংকা করছেন। তাই নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন রাজনৈতিক দলের জন্যও আশীর্বাদ হতে পারে।

দলভিত্তিক নির্বাচনের মাশুল সাধারণ নাগরিকদেরও গুনতে হয়। আমাদের আতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যেসব এলাকায় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ছিলেন, সেসব এলাকায়ই বেশি সরকারি বরাদ্দ ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল। কোন কোন এলাকা এবং জেলার প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। নিঃসন্দেহে এ ব্যবস্থা ন্যায়পরায়ণতার পরিপন্থী এবং সাধারণ মানুষ এর শিকার। এটা অবশ্য দলবাজির সমস্যা, দলের নয়। তাই দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে যেসব এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে নেই, দলবাজির সংস্কৃতির কারণে সেসব এলাকা কেন্দ্রীয় সম্পদ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থায় অধিকাংশ সম্পদই কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং সম্পদ বিতরণ করা হয় অনেকটা অনুগ্রহ প্রদানের অংশ হিসেবে।

দলভিত্তিক নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে পশ্চিমবাংলার মন্ত্রী আনিসুর রহমান নিজে সাংবাদিকদের বলেন, দলীয়ভাবে প্রার্থী মনোনয়নে সবকিছু দলীয়করণ করার মানসিকতা জন্মায়। ফলে গ্রাম পর্যায়ে জনগণের ন্যায্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চনা সৃষ্টি হয় (প্রথম আলো ৫ আগস্ট ২০১০)। এমনিতেই সবকিছুতে আমাদের দেশে দলীয়করণ চরম, যার ফলে বিরোধী দলের নেতাকর্মী-সমর্থক ও নির্দলীয় ব্যক্তিরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে, যাদের শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক নেই, তারাও বিভিন্ন ফায়দা থেকে বঞ্চিত হয়। দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে এ বঞ্চনা তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছবে এবং তা আরও ব্যাপকতা লাভ করবে বলে আমাদের আশংকা।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে সুসংহত করার ক্ষেত্রেও নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্দলীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় ভিত্তিতে একক প্রার্থী মনোনীত করা হয় না বলে নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ভোটারদের অনেক বেশি 'চয়েস' থাকে- তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৃত্ত প্রসারিত হয়। ফলে তাদের পক্ষে ভালো প্রার্থী খুঁজে পাওয়ার বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুণগতমানে পরিবর্তন সাধনে সহায়তা করে। আর সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়। অপেক্ষাকৃত যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে যুক্তি হল, এর মাধ্যমে দলীয় নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়। এটি অনেকটা খোঁড়া যুক্তি, কারণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব সব নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব করা, দল বিশেষের নয়। এছাড়াও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণে তেমন ভূমিকা রাখেন না, ফলে তাদের পক্ষে দলীয় নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। উপরন্তু সামপ্রতিককালের আমাদের রাজনৈতিক দলে নীতি-আদর্শ অনেকটা স্লোগানে পর্যবসিত হয়েছে এবং প্রধান দলগুলো বহুলাংশে ফায়দাবজি এবং ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হয়ে গেছে।

দলভিত্তিক নির্বাচনের পক্ষে আরেকটি যুক্তি হল, এর ফলে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও দলীয় শৃংখলার অধীনে আসে। ফলে তাদের পক্ষে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাস্তবতা তার উল্টো। আমাদের সমাজে অধিকাংশ অন্যায় ও গর্হিত কাজই পরিচালিত হয় সরাসরি দলীয় ছত্রছায়ায় অথবা দলীয় সমর্থনে। বস্তুত দলের বিশেষত সরকারি দলের সমর্থন ছাড়া কেউ অপরাধ করে পার পায় না। এছাড়াও আমাদের দেশে অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক দলীয় অনুশাসনের প্রয়োগ অনুপস্থিত বললেই চলে।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে দলের সংস্কার হবে জরুরি। দল নীতি-আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হতে হবে। দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিদের দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন প্রদান করতে হবে। 'মনোনয়ন বাণিজ্য' পরিহার করতে হবে। সরে আসতে হবে ছলে-বলে-কলে কৌশলে- ন্যায়-অন্যায়ের বাছবিচার না করে যারা নির্বাচনে জিততে পারবে, তাদের মনোনয়ন দেয়া থেকে।

এছাড়াও দলভিত্তিক নির্বাচন করতে হলে এজন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। যেমন, কীভাবে দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে সে প্রক্রিয়া আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় নির্বাচন দলভিত্তিক অনুষ্ঠিত হয়, আর তা পরিচালনার জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইন রয়েছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অতীতে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে মনোনয়ন দিয়ে আসছে তা পরিহার না করলে দলভিত্তিক নির্বাচন আমাদের জন্য আবারও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন যৌক্তিক নয়। বস্তুত নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অনেকগুলো ইতিবাচক দিক রয়েছে। কিন্তু আমরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছি, কারণ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সে ধরনের আচরণ করেনি এবং এসব নির্বাচনকে নির্দলীয় রাখেনি। আচরণবিধিতে নির্দলীয় নির্বাচনের কথা থাকলেও তারা অনেক ক্ষেত্রে অন্তত পরোক্ষভাবে দলীয় মনোনয়ন অথবা সমর্থন প্রদান করেছে। আশা করি দলভিত্তিক পৌরসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিষয়টি আবারও গভীরভাবে ভেবে দেখবেন। আর যদি দলীয়ভিত্তিতে নির্বাচন হতেই হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও সত্যিকারের জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক দলের ব্যাপক সংস্কার। তা না হলে আমাদের বিদ্যমান সমস্যাগুলো, বিশেষত দলবাজি, পক্ষপাতিত্ব ও সহিংসতার সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
১ জানুয়ারি, ২০১১
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

সূত্র: যুগান্তর, ৩ জানুযারি ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s