সুশাসন: সংসদের সার্বভৌমত্ব ও কার্যকারিতা

বদিউল আলম মজুমদার

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদ কার্যকর হতে পারে না। তবে বিরোধী দল উপস্থিত থাকলেই সংসদ কার্যকর হয় না_ সংসদের কার্যকারিতা নির্ভর করে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পেরেছে তার ওপর। গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট বেঞ্চের মতে, আমাদের জাতীয় সংসদ সার্বভৌম নয়। তাই সংসদীয় কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে সুপ্রিম কোর্ট বাধ্য নন। কিছুদিন আগে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে সংসদীয় কমিটি কর্তৃক তলব করার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সংসদের সার্বভৌমত্ব হারানোর জন্য সরকারকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘যে সংসদে দুই বছরে ১৩০টি বিল ও দুটি বাজেট একদলীয়ভাবে পাস হয়, সেই সংসদ সার্বভৌম হতে পারে না।’

এদিকে সরকারের দু’বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মহান জাতীয় সংসদকে সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার দাবি করেছেন। অর্থাৎ বর্তমান সরকার সংসদকে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। সংসদের সার্বভৌমত্ব ও কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এগুলো সম্পর্কে নাগরিক সচেতনতা সৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ।

ব্ল্যাকের ল’ ডিকশনারি অনুযায়ী, বৃহত্তর অর্থে সার্বভৌমত্বের অর্থ সর্বোচ্চ, নিরঙ্কুশ, নিয়ন্ত্রণহীন ও সর্বময় ক্ষমতা_ অর্থাৎ নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। ‘পার্লামেন্টারি সোভরিনিটি’ বা সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার উৎপত্তি হয় ইংল্যান্ডে। কারও কারও মতে, ষষ্ঠদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে গির্জার ওপর পার্লামেন্টে পাস করা আইনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের লক্ষ্যেই এর উৎপত্তি। অন্যদের মতে, সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজা নির্ধারণ ও বিতাড়নে সংসদের ক্ষমতা প্রদর্শনের লক্ষ্যেই এর উদ্ভাবন।

সংসদীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিত, যদিও সাম্প্রতিককালে এ বিতর্কের অনেকটা অবসান ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব দেশে লিখিত সংবিধান রয়েছে, সেসব দেশে জাতীয় সংসদ নিঃসন্দেহে একটি অগাধ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান, কিন্তু সার্বভৌম নয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের অন্য দুটি অঙ্গের নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ_ সংসদের অধীন নয়।

ব্রিটিশ সংবিধান বিশেষজ্ঞ আলবার্ট ডাইসি তার Introduction to the Law of the Constitution গ্রন্থে ‘সংসদীয় সার্বভৌমত্ব’ ধারণার তত্ত্ব প্রথম উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, পার্লামেন্টের যে কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়নের অধিকার রয়েছে। এছাড়াও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস করা কোনো আইন রহিত ও বাতিল করার অধিকার ব্রিটিশ আইনানুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নেই। সাংবিধানিক সার্বভৌমত্বের মূলকথা হলো : ক. সংসদ যে কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে পারে; খ. সংসদ প্রণীত আইন যে কোনো স্থানে যে কোনো ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে; গ. কোনো সংসদ ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর কোনো কিছু বেঁধে দিতে পারে না, অর্থাৎ সংসদ এমন কোনো আইন পাস করতে পারে না, যা ভবিষ্যৎ সংসদ পরিবর্তন করতে পারবে না এবং ঘ. সংসদ আইন প্রণয়নে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী এবং সংসদে পাস করা বৈধ আইন সম্পর্কে আদালত কোনো প্রশ্ন তুলতে পারেন না।

সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা দিন দিন দুর্বল হয়েছে, এমনকি ব্রিটেনেও। এমনকি ডাইসি নিজেও, যিনি এ ধারণার জনক, সংসদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি দিয়েছেন_ তিনি তার জীবদ্দশায় ব্রিটেনে গণভোট ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছেন। এছাড়া ব্রিটেনেও সাধারণত আদালত মূল আইন রহিত করতে না পারলেও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘জুডিসিয়াল রিভিউ’ বা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা প্রযোজ্য। উপরন্তু সংসদ যে কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে পারে না এবং সব আইন পালন বাধ্যতামূলকও হতে পারে না। সামাজিক রীতি-নীতি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিধি-নিষেধ আরোপ করে। আন্তর্জাতিক আইনও যেমন_ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন প্রণীত আইন সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে খর্ব করে।

ব্রিটেনে লিখিত সংবিধান নেই। নেই কোনো প্রধান বিচারপতি। এছাড়াও ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডস অনেকটা বিচারালয়ের মতো কাজ করে। তাই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একাধারে আইনসভা ও বিচারালয়ের দায়িত্ব পালন করে। এমন প্রেক্ষাপটেই ব্রিটেনে সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণার উৎপত্তি।

লিখিত সংবিধান নেই বলে ব্রিটেনে সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা সীমিতভাবে প্রযোজ্য হলেও যেসব রাষ্ট্রে লিখিত সংবিধান রয়েছে, সেখানে এটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের একটি মতামত বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। কেশব সিংহ বলে এক ব্যক্তিকে উত্তর প্রদেশ প্রাদেশিক পরিষদ কর্তৃক পরিষদ অবমাননার দায়ে জেলে পাঠানো এবং এ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টির কারণে ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রেরিত একটি রেফারেন্সের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ মতামত (এআইআর [১৯৬৫] এসসি ৭৪৫) দেন যে : ‘… এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, যদিও সংসদের অগাধ ক্ষমতা রয়েছে, তবুও সংসদকে সংবিধানের সংশিল্গষ্ট অনুচ্ছেদের বিধানের আওতার মধ্যে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। লিখিত সংবিধানের আওতায় পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধানই শ্রেষ্ঠ ও সার্বভৌম। তাই এতে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয় যে, ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট যে সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে, ভারতে কোনো সংসদই আক্ষরিক ও নিরঙ্কুশ অর্থে তা দাবি করতে পারে না।’

অনেকে দাবি করেন, সংসদ সংবিধানও সংশোধন করতে পারে, তাই সংসদই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং সার্বভৌম। এটিও একটি ভ্রান্ত ধারণা, কারণ সংবিধানের প্রদত্ত ক্ষমতাবলেই সংসদ তা করতে পারে। তাও সাংবিধানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে (যেমন_ দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদকে দেওয়া হয়েছে। তাই এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হলেও লিখিত সংবিধানই সংসদের ক্ষমতার উৎস।

সম্প্রতি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায়ও একজন ভারতীয় বিচারক একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেন। ২০০৫ সালে ১১ জন ভারতীয় আইন প্রণেতাকে লোকসভা ও রাজ্যসভা থেকে বহিষ্কারের প্রেক্ষাপটে দায়ের করা রাজা রামপাল বনাম স্পিকার মামলার ([২০০৭]৩এসিসি) রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী বিচারক রাভিনড্রান অভিমত দেন যে : ‘ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মতো ভারতীয় পার্লামেন্ট সার্বভৌম নয়। সংবিধানই সর্বোচ্চ ও সার্বভৌম এবং পার্লামেন্টকে সংবিধানে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।’

আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘(১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে। (২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’ সংবিধানের এ অনুচ্ছেদে জনগণ সব ক্ষমতার মালিক, অর্থাৎ তাদের সার্বভৌমত্বের কথা বলা হয়েছে। আর ‘এস দি সলেমন এক্সপ্রেশন অব দি উইল অব দি পিপল’ বা ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে’ স্বীকৃত বলেই লিখিত সংবিধান সার্বভৌম।

সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের পক্ষে ক্ষমতা প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। জনগণের পক্ষে ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার শুধু সংসদ বা আইন সভাকেই প্রদান করা হয়নি, সাংবিধানিকভাবে অন্যদেরও সুনির্দিষ্ট করে তা দেওয়া হয়েছে। যেমন- নির্বাহী বিভাগকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগকে দেওয়া হয়েছে বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব। এমনিভাবে নির্বাচন কমিশন ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককেও সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। লক্ষণীয় যে, সংবিধানে প্রত্যেকের ক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া আছে এবং এই পরিধির গণ্ডিতেই তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদে আইন সভার ক্ষমতা মোটাদাগে সুনির্দিষ্ট করা আছে। এতে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় সংসদ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইনপ্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে।’ আইন প্রণয়ন বলতে সাধারণত নতুন আইন অনুমোদন, বিদ্যমান আইন পরিবর্তন-সংশোধন ও রহিতকরণ, নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠান, বাজেট ও সরকারের আর্থিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি বোঝায়। অর্থাৎ জনগণ তাদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার অংশবিশেষ তাদের স্বার্থসংরক্ষণের লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের ওপর অর্পণ করেছে। পরিপূর্ণ ক্ষমতা সংসদের কাছে হস্তান্তর করেনি। তাই জনগণ তাদের সার্বভৌমত্ব সংসদের কাছে হস্তান্তর করেছে বলা কোনোভাবেই সমীচীন হবে না।

সংসদের কার্যকারিতার বিষয়ে আসা যাক। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদ কার্যকর হতে পারে না। তবে বিরোধী দল উপস্থিত থাকলেই সংসদ কার্যকর হয় না_ সংসদের কার্যকারিতা নির্ভর করে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পেরেছে তার ওপর। বস্তুত সংসদ ততটুকুই কার্যকর যতটুকু প্রতিষ্ঠানটি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের জাতীয় সংসদ মূলত একটি রাবার-স্ট্যাম্পিং প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ করে_ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত বিলই সাধারণত সংসদে অনুমোদিত হয়। অর্থবহ বিতর্কের পরিবর্তে আমাদের সংসদ সদস্যরা বহুলাংশে প্রতিপক্ষকে গালাগাল এবং নেতা-নেত্রীর বন্দনায়ই নিজেদের লিপ্ত রাখেন। ১৯৯১ সালের পর থেকে গত চারটি সংসদে বিরোধী দলের উত্থাপিত পাঁচ সহস্রাধিক মুলতবি প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র চারটি আলোচিত হয়_ নবম সংসদে একটিও আলোচিত হয়নি। বাজেট ও সরকারের আর্থিক সিদ্ধান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সংসদ কদাচ সরকারের প্রস্তাবের বাইরে যায়। সম্ভবত নিজেদের বেতন-ভাতা আয়করমুক্ত করার ক্ষেত্রেই বর্তমান সংসদ সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গেছে। বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদীয় কমিটিগুলো সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কাজে উপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারে না। স্থানীয় উন্নয়ন কাজে তাদের জড়িত করার এবং নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ততার কারণে আমাদের অধিকাংশ সংসদ সদস্য সংসদীয় কমিটির কাজে তথা সংসদীয় কর্মকাণ্ডে নিবিষ্ট নন। এছাড়াও কিছু ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিগুলোকে কমিটি সদস্যদের ব্যক্তি বা কোটারি স্বার্থে ব্যবহার করা হয়।

সংসদের কার্যকারিতার একটি বড় মানদণ্ড হলো এর প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা। আমাদের সংসদের ৩৪৫ জন সদস্যের সবার ভূমিকা এক নয়। সংসদের যেসব সদস্য মন্ত্রিসভায় যোগ দেন, তারা হয়ে পড়েন নির্বাহী বিভাগের অংশ, যদিও তাদের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকে। অন্যরা স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা এবং নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা তাদের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা এবং আমাদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, যা সংসদের কার্যকারিতা অর্জনের পথে একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা।

পরিশেষে এটি সুস্পষ্ট যে, পার্লামেন্টই সব ক্ষমতার অধিকারী, সে ধারণা সঠিক নয়। ব্রিটেনে যেখানে লিখিত সংবিধান নেই এবং পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ বিচারিক দায়িত্ব পালন করে, সংসদীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা আংশিকভাবে প্রযোজ্য হলেও আমাদের মতো দেশে তা অপ্রাসঙ্গিক। আমাদের লিখিত সংবিধানই ‘সুপ্রিম’ বা সর্বোচ্চ। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস ও সার্বভৌম এবং আমাদের জাতীয় সংসদ জনগণের পক্ষে এবং সংবিধানের অধীনে ও ক্ষমতাবলে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা_ আইন প্রণয়নের ক্ষমতা উপভোগ করে। এক্ষেত্রে সংসদের ক্ষমতা অগাধ হলেও, সংসদ সার্বভৌম নয়। বস্তুত আমাদের সংবিধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, ক্ষমতার বিভাজন ও ভারসাম্য। এর মূল লক্ষ্য হলো ক্ষমতা কুক্ষিগত যাতে না হয় তা নিশ্চিত করা, কারণ কুক্ষিগত ক্ষমতাই স্বৈরতন্ত্রের উৎস। তাই আধুনিক রাষ্ট্রে সরকারের কোনো অঙ্গেরই সার্বভৌম হওয়ার সুযোগ নেই। যদিও জনগণের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সমানদের মধ্যে প্রথম। তাই একদলীয়ভাবে পরিচালিত হওয়ার কারণে সংসদ সার্বভৌমত্ব হারিয়েছে_ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের এমন বক্তব্য অত্যন্ত বিভ্রান্তিমূলক।

বর্তমান সরকারের আমলে জাতীয় সংসদ সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে_ প্রধানমন্ত্রীর এমন দাবিও অত্যুক্তির পর্যায়ে পড়ে। আমাদের জাতীয় সংসদ কখনই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি এ ক্ষেত্রে একটি পর্বতপ্রমাণ বাধা। এছাড়াও সংসদের প্রথাগত দায়িত্ব পালনে আইন প্রণয়ন, বিতর্ক অনুষ্ঠান, সরকারের আর্থিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন ও সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না।
১২ জানুয়ারি, ২০১১

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

সূত্র: সমকাল, ১৩ জানুয়ারি ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s