গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের শাসন অপরিহার্য

সুশাসন

বদিউল আলম মজুমদার

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। বাংলাদেশ সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র …’। বস্তুত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পেছনে মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সৃষ্টি, যেখানে আর্থ-সামাজিক সুবিচার, মৌলিক মানবাধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা আমাদের সরকারের অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসন কোন পথে?

আমাদের রাজনীতিবিদরা সাধারণত জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, নির্বাচিত সরকারই গণতান্ত্রিক সরকার। অর্থাৎ শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। কিন্তু মানবসভ্যতার গত কয়েক সহস্রাব্দের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভোটাভোটির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা হয়নি। বরং পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় গণতন্ত্রের ভিত তৈরি হয়েছে জনগণের কতগুলো মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এবং আইনের শাসনের হাত ধরে। সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক পরে। উদাহরণস্বরূপ, ১৮৩০ সালে যুক্তরাজ্য ও পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে মাত্র ২ শতাংশ জনগণের ভোটাধিকার ছিল, যা ১৮৬৭ সালে ৭ শতাংশে এবং ১৮৮০ সালে ৪০ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু ১৯৪০ সালের দিকেই ওই সব দেশে সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই ভোট প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতন্ত্র কায়েম হয় না।

লক্ষণীয়, আমাদের সংবিধানে ভোটাধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মৌলিক অধিকার, যেমন_ চিন্তা-বিবেক-বাক্, ধর্মীয়, চলাফেরার, সমাবেশের, সংগঠনের, পেশা-বৃত্তির, সমতা, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা ইত্যাদি মানুষের ‘আনঅ্যালিয়েনেবল রাইটস’ (unalienable rights) বা অবিচ্ছেদ্য অধিকার, যা হরণ করা যায় না। এগুলো তাদের জন্মগত অধিকার এবং আইন দিয়ে এগুলো রহিত করা যায় না। সর্বোপরি এগুলো আদালতের মাধ্যমে বলবতযোগ্য। পক্ষান্তরে ভোটাধিকার আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অধিকার, যা আইনের মাধ্যমে রহিতও করা যায়। অর্থাৎ মানুষের মৌলিক অধিকার অপেক্ষাকৃত উন্নতমানের (superior) অধিকার, যদিও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ভোটাধিকারও আবশ্যক।

আইন এবং সংবিধানে মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি থাকলেই হবে না, এগুলো বলবত করাও আবশ্যক। এজন্য অবশ্য প্রয়োজন আদালত ও নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আইনের যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়। আর বিচারিক আদালতের মাধ্যমে আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত হওয়া আইনের শাসনের অপরিহার্য অঙ্গ, যদিও আইনের শাসনের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত।
ব্যাপক অর্থে আইনের শাসনের তিনটি উপাদান রয়েছে : ১. একটি যথার্থ আইনি কাঠামো, ২. আইনের নির্মোহ প্রয়োগ এবং ৩. আইনের আশ্রয় নেওয়ার ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সুযোগ বা ‘একসেস টু জাস্টিস’।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই একটি আইনি কাঠামো থাকতে হবে। তবে কাঠামোটি_ যার মধ্যে সংবিধান, আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান অন্তর্ভুক্ত_ কালো আইনমুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ আইন হতে হবে জনবান্ধব ও গণমুখী। তাই আইন থাকলেই হবে না, আইনে মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি থাকতে হবে। এ কারণে সামরিক শাসনামলে সামরিক আইন প্রয়োগ হলেও সে আইনে মানুষের অধিকার খর্ব করা হয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না।

আইনের নিরপেক্ষ ও নির্মোহ প্রয়োগ না হলেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে লাল বাতি-সবুজ বাতি ব্যবহার অর্থাৎ পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ আইনের শাসনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। যেমন, গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে রাজনৈতিক হয়রানির অজুহাতে শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়। এমনিভাবে বর্তমান সরকারের আমলে যে ছয় সহস্রাধিক মামলা প্রত্যাহার করা হয়, তার মাত্র দুটি ছিল বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা।

আমাদের দেশে, বিশেষত সরকারি দলের সঙ্গে জড়িত রুলিং ক্লাস বা শাসকশ্রেণীর জন্য একটি ‘কালচার অব ইমপিউনিটি’ বা অন্যায় করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বিরাজমান। অর্থাৎ আমাদের সমাজে সাধারণত দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন হয় না এবং কিছু ব্যক্তি আইনের উর্ধ্বে থেকে যায়, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আরেকটি পর্বতপ্রমাণ বাধা। বস্তুত আমাদের দেশে বহু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় অনুষ্ঠিত হয়, যার কোনো বিচার হয় না। এ ছাড়া ক্ষমতাসীনদের অপছন্দের অনেক মামলার শুনানিও আদালতে করা যায় না, ফলে বিচারের বাণী আদালত প্রাঙ্গণে অনেক সময় নীরবে-নিভৃতে কাঁদে।

বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অতি বড় বাধা হলো ক্ষমতাবানদের আইন অমান্য করার প্রবণতা। বস্তুত আমাদের দেশে আইন প্রণয়নকারীরাই দ্বিধাহীনভাবে আইন ভঙ্গ করেন। যেমন_ আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্যরা সংবিধানের ৭, ৫৯ ও ৬৫ অনুচ্ছেদ অমান্য এবং উচ্চ আদালতের ‘কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ’ [৪৪ ডিএলআর (এডি)(১৯৯২)] এবং ‘আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বনাম বাংলাদেশ’ [১৬বএলটি(এইচডি)(২০০৮)] মামলার রায় উপেক্ষা করে স্থানীয় সরকারে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হস্তক্ষেপ করছেন। একইভাবে তাদের কয়েকজন জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি লঙ্ঘন করে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর এখতিয়ারসম্পন্ন সংসদীয় কমিটিতে জড়িত আছেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজন মিথ্যা হলফনামা দিয়ে, যা করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ, রাজউকের প্লটের জন্য দরখাস্ত করেছেন। এছাড়া সরকারও অহরহ আইন ভঙ্গ এবং আদালতের নির্দেশ অমান্য করছে, যেমন_ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে।

আমাদের দেশে আইনের যথার্থ ও পক্ষপাতহীন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো বিচারকদের অনেকের অযোগ্যতা ও দলীয় আনুগত্য। যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিবর্তে দলীয় বিবেচনায় সাধারণত আমাদের দেশে বিচারক নিয়োগ হয়। ফলে সাম্প্রতিককালে অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, যাদের কাছ থেকে আইনের সঠিক প্রয়োগ আশা করা যায় না। কিছু বিচারকের বিরুদ্ধে আবার দুর্নীতির জনশ্রুতি রয়েছে। এ ধরনের বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগের ফলে কয়েক বছর আগে আমাদের এক সাবেক প্রধান বিচারপতি উচ্চ আদালতে প্রলয় ঘটেছে বলে দাবি করেন। দলীয় অনুগতদের নিয়োগের ফলে উচ্চ আদালতের কিছু বেঞ্চের গায়ে এখন দলীয় লেভেল এঁটে দেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক নয়।

এছাড়া বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ বা যথাযথ বিবেচনা প্রয়োগ করা হয় না। কোনো অফিসে একজন অতি ছোট পদে নিয়োগের আগেও প্রার্থী সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়া হয়। কিন্তু সাম্প্রতিককালের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সে ধরনের খোঁজ-খবর নেওয়া হয় না এবং বাছবিচারও করা হয় না। ফলে বিচারালয়ের প্রতি নাগরিকদের অনেকে এখন আস্থাহীনতায় ভুগছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ পদ্ধতি নির্ধারণ করা অতি জরুরি। উল্লেখ্য, এ লক্ষ্যে এমনকি পাকিস্তানেও গত সপ্তাহে তাদের আইনসভা সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী সর্বসম্মতভাবে পাস করেছে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার তৃতীয় উপাদান হলো আইনের আশ্রয় নেওয়ার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রবেশগম্যতা বা সুযোগ। এ কথা কারোই অজানা নয়, আমাদের দেশে নিম্নবিত্ত মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। এর একটি বড় কারণ হলো বিচারালয়ে দুর্নীতি। সমাজের উঁচুতলার মানুষেরা বিভিন্ন ধরনের কারসাজির আশ্রয় নিয়েও নিচুতলার মানুষদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেন। স্বল্পবিত্তের মানুষদের বঞ্চনার আরেকটি কারণ হলো বিচারিক কার্যালয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও এর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। অধিকসংখ্যক যোগ্য বিচারক নিয়োগ এবং বিচারালয়ে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে।

যুগে যুগে বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, সমাজে অপাঙ্ক্তেয় ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আদালত রক্ষা করেছে। আর সমাজে ঘৃণিত ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষার ফলেই সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের অবস্থা ভিন্ন। যেমন_ ২০০২ সালে গত সরকারের আমলে ‘অপারেশন ক্লিন হার্টে’র নামে ৫৩ জন ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। পরবর্তীকালে ২০০৪ সালে ক্রসফায়ারের নামে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের আবার সূত্রপাত করা হয়। এসব হত্যার জন্য কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি, যা আইনের শাসনের জন্য একটি বড় হুমকি।

বর্তমান সরকার তাদের দিনবদলের সনদ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান নিলেও এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এখনও নির্বিচারে চলছে এবং জঘন্য অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু ব্যক্তি বিচারের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টারের নামে দেশে ১৩৩টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিগত ছয় বছরে প্রায় এক হাজার ৭০০ জন মৃত্যুবরণ করেছে (প্রথম আলো, ২৩ ডিসেম্বর ২০১০)। এছাড়া ৫৩ জন বিডিআর সদস্য আসামি হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছে। এসব বিচারবহির্ভূত হত্যা অভিযুক্তদের বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে, একই সঙ্গে আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে।

পরিশেষে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের সূচনা ঘটলেও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয় না। একটি গণমুখী আইনি কাঠামো, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো স্বীকৃতি লাভ করে, আইনের নিরপেক্ষ ও নির্মোহ প্রয়োগ এবং আইনের আশ্রয় নেওয়ার এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সুযোগ, আইনের শাসনের অংশ। সরকারেরই একমাত্র বৈধভাবে বল প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে, তাই আইনের শাসনের একটি উদ্দেশ্য হলো সরকারের এ ক্ষমতা প্রয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, আইনের শাসন কায়েম না হলে জঙ্গলের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আর জঙ্গলের শাসন মানে যথেচ্ছাচার ও জোর যার মুল্লুক তার, যার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি সাধারণত সুখকর হয় না।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক সুজন_সুশাসনের জন্য নাগরিক

সূত্র: সমকাল, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s