’সংবিধান সংশোধন : প্রাসঙ্গিক ভাবনা ও নাগরিক উদ্বেগ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক সম্পন্ন

সংবিধান সংশোধনে পিপলস কমিশন গঠনের প্রস্তাব
সংবিধান সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বাক-বিতন্ডা চলছে। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি কোথায় যাচ্ছে তা নিয়ে নাগরিকদের মনে অনেক প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। দেখা দিয়েছে অনেক উদ্বেগ। সংবিধান সংশোধন নিয়ে নাগরিকদের প্রত্যাশা ও উদ্বেগ ব্যক্ত করতে আজ ১০ এপ্রিল ২০১১ জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবিধান সংশোধন: প্রাসঙ্গিক ভাবনা ও নাগরিক উদ্বেগ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সুজন সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এ এস এম শাহজাহান। ’সংবিধান সংশোধন: প্রাসঙ্গিক ভাবনা ও নাগরিক উদ্বেগ’ বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি ড. শাহদীন মালিক। আলোচনায় অংশ নেন প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রী সরদার আমজাদ হোসেন, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. আসিফ নজরুল, সুভাষ চন্দ্র সিংহ, রুহিন হোসেন প্রিন্স প্রমূখ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খান, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক প্রমূখ।

ড. শাহদীন মালিক তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, আমাদের সংবিধানে যে চৌদ্দটি সংশোধনী হয়েছে তার অধিকাংশই হয়েছে রাজনৈতিক এবং ব্যক্তি কেন্দ্রীক ক্ষমতার স্বার্থ থেকে। ১৯৭২ সালের সংবিধানকে সত্যিকার অর্থেই একটা মুক্তির দলিল আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে স্বাধীন দেশে জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করনার্থে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল, এবং সেই মুক্তির আকাংখার প্রতিফলন ঘটেছিল আমাদের সংবিধানে। গত চল্লিশ বছরে মুক্তির আকাঙ্খা পদদলিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো ১৯৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া। ছোট জাতিগোষ্ঠী এবং ৭০ অনুচ্ছেদের কিছু পরিবর্তন ছাড়া অন্যান্য সংশোধনের প্রয়োজনীতা ও প্রস্তাবনা নাগরিকদের বিবেচনা ও মতামতের জন্য উন্মুক্ত করা আবশ্যক বলে তিনি মনে করেন।

ড. কামাল হোসেন সংবিধানকে জনগণের সম্পদ অভিহিত করে বলেন, আমরা প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছি কিন্তু কার্যকর করতে পারিনি। প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র কার্যকর করার বাধাগুলো চিহ্নিত করার জন্য সকলকে আহবান জানান তিনি। প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার এবং স্বার্থ জড়িত যে সংবিধানে, সে সংবিধানে কি পরিবর্তন আসছে তা জানার অধিকার সকলের আছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি প্রস্তাব করেন, এ বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে আলোচনা, বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে। নাগরিকেরা যাতে তাদের মতামত দিতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টির উপর জোর দেন তিনি। রুগ্ন রাজনীতির উপকারভোগীরা আইনকে তাদের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগান বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনের চোখে সকলেই সমান – এ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ এস এম শাহজাহান বলেন, আইন প্রয়োগকারীদের চোখে সকলে সমান হলেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ড. বদিউল আলম মজুমদার সংবিধান সংশোধন কমিটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। প্রশ্নগুলো হলো: কেন এই কমিটি? কি উদ্দেশ্য? কী এর টিওআর? শুধুমাত্র মহাজোট সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আনা কি যৌক্তিক? মহাজোট সরকার কি মৌলিক পরিবর্তনের জন্য ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত? এ ব্যাপারে এত তাড়াহুড়াই বা কেন? তিনি সংবিধান আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা বর্তমান সরকারের এখতিয়ার বহির্ভূত বলে উল্লেখ করেন। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যখন যা আমাদের স্বাচ্চন্দ্য দিয়েছে তাই আমরা পরিবর্তন করেছি। যার ফলে পুলিশ, প্রশাসন দূর্বল রয়ে গেছে। নাগরিক জীবনের প্রতিফলনই হলো রাজনীতি – এ কথা বলে তিনি প্রস্তাব করেন সংবিধানের কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য একটি সার্বিক ধারণা পত্র তৈরী করার জন্য। তিনি পুলিশ, প্রশাসন, আইন বিভাগে নিয়োগের সঠিক মানদন্ড ঠিক করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।  সরদার আমজাদ হোসেন প্রস্তাব করেন ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতাদের যারা এখন বেঁচে আছেন তাদের সাথে আলোচনা করে সংবিধান সংশোধন করার জন্য। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া বলেন, আমরা সংবিধান সংশোধনে ভালো কিছু করার সুযোগ হারাবো যদি তা দলীয় এবং গোষ্ঠীর অবস্থান থেকে দেখি। ড. আসিফ নজরুল বলেন, গত ৪০ বছরে প্রতিবারই আমাদের শ্রেষ্ঠ দলিলটি ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে দলীয় স্বার্থে। রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সংবিধানের আলোচনাটা সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তব্য। অথচ সংবিধানটা জনগণের কাছ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। ৭২ এর সংবিধানে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে বাস্তবতার আলোকে সংবিধান সংশোধনের আহ্বান জানান তিনি। সুভাস সিংহ রায় সংবিধান সংশোধনের কাজটি তাড়াহুড়া করে না করার অনুরোধ জানান।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আজমদ বলেন, সংবিধান জনগণকে ক্ষমতায়িত করার দলিল, কোন দল বা গোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখার দলিল নয়। রায়ভিত্তিক সংশোধনটা প্রথমেই করার প্রস্তাব দেন তিনি। মৌল চেতনাকে লংঘন করে এমন বিষয়গুলো সকলের সঙ্গে আলোচনা করে সংশোধন করার কথা বলেন। সংবিধান সংশোধনের কাজটি সুচারুরুপে করার জন্য একটি সংবিধান কমিশন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। নাগরিক সমাজকে একটি পিপলস কমিশন গঠনের এবং কমিশনের মাধ্যমে তাদের মতামত, সুপারিশ ও প্রস্তাব তুলে ধরার জন্যও তিনি অনুরোধ জানান।

Advertisements