নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তত আরো দুই টার্ম বহাল রাখার পক্ষে ঐক্যমত

গত ১০ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেন। যার ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। একইসাথে আদালত আগামী দু’টি নির্বাচন এ ব্যবস্থার অধীনে করা এবং বিচারপতিদেরকে এ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার সুপারিশ করেন। বিষয়টির ওপর আলোকপাতের লক্ষ্যে সুজন গত ২৬ মে ২০১১ প্রেস ক্লাবে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সুজন সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খান ও জনাব এ এস এম শাহজাহান, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া, বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার রফিকুল হক, কলামিস্ট জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ, অধ্যাপক অজয় রায়, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, জনাব আহসানুল হক, রাজনীতিবিদ সুভাষ সিংহ রায়, অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর হীরু, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রমুখ।

গোলটেবিলে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি অগণতান্ত্রিক বিধায় আদালত তাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান সম্মত কিনা – এ আইনী প্রশ্নে আদালত সঠিক রায় দিয়েছেন। এ ব্যবস্থা আরো দুই টার্ম রাখা হবে কি না এবং কাকে প্রধান উপদেষ্টা – এগুলো রাজনৈতিক প্রশ্ন, যা আদালত যথাযথভাবে রাজনীতিবিদদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। ¬¬¬¬তিনি প্রস্তাব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে একটি প্যানেল গঠন করার। এই প্যানেলভূক্ত সাবেক বিচারপতিগণ সর্বসম্মত বা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্ধারন করবেন। সবার আগে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বয়োজেষ্ঠ্যদের এ প্যানেলে সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

তিনি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য শুধু নির্বাচন কমিশনকেই শক্তিশালী করা নয় তার পাশাপাশি নিরপেক্ষ ও দক্ষ প্রশাসন, আইন-শৃংখলা বাহিনী, রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের ইতিবাচক মানসিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে তিনি অমর্যাদাকর, ¯^we‡ivax ও অস্থিতিশীল ব্যবস্থা উলে¬খ করে বলেন, এ ব্যবস্থা সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে, দলগুলোকে দায়িত্বহীন আচরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে, সুশাসনের পরিবর্তে নির্বাচনের দিকে জনগণের দৃষ্টি নিবন্ধ করেছে এবং রাজনীতিবিদদের মাঝে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার আকর্ষণ তৈরি করেছে।

সুজন সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদ বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। রাজনৈতিক অবিশ্বাস, অনিরপেক্ষ প্রশাসন, নখদন্তবিহীন নির্বাচন কমিশন, ডান্ডা-হোন্ডা-গুন্ডার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের সমাজে বিরাজমান তা যতদিন অব্যাহত থাকবে ততদিন এই অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচন হওয়াই জনগণের জন্য মঙ্গলজনক হবে বলে তিনি মতামত দেন। ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভারতীয় নির্বাচন কমিশনকে সকলের কাছে সম্মানের জায়গায় পৌছে দিয়েছে, এ উদাহরণ টেনে তিনি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করে গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। নির্বাচন কমিশনকে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান এবং নির্বাচনের সময় প্রশাসনকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাখার প্রস্তাব করেন তিনি।

ব্যারিস্টার রফিক উল হক রাজনীতিবিদদের মানসিকতার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার পক্ষে। তিনি উভয় জোট থেকে ১০/১৫ জন সংসদ সদস্যর mgš^‡q পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আহ্বান জানান। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের একটি টিম এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে কাজ করতে পারেন বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। বিচারপতি কাজী এবাদুল হক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে লটারী করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত করার প্রস্তাব দেন। অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমেদ এবং অধ্যাপক মুনীরুজ্জামান মিয়া বলেন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মন এখনও গণতন্ত্রের জন্য তৈরি হয়নি। তারা অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা তৈরিতে যতটা না আগ্রহী তার চেয়ে বেশী আগ্রহী এমন একটা ব্যবস্থা খুঁজে বের করতে যে ব্যবস্থায় তারা সহজে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যেতে পারবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিগত তিনটি নির্বাচন সফল হয়েছে বলে উল্লে¬খ করে এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে এবং সংসদে গণতন্ত্র প্রত্যক্ষ করা যায় না। প্রশাসনও নিরপেক্ষ নয় বলে তিনি বলেন, আওয়ামী, বিএনপি উভয়ই প্রশাসনকে চূড়ান্তভাবে দলীয়করণ করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এ সংস্কৃতি সহসা পরিবর্তন হবে না বলে তিনি মনে করেন। তিনি অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার পক্ষে অভিমত দেন। অধ্যাপক আসিফ নজরুল তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর আমলে অনেক ভালো কাজ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। যেমন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, গ্রহণযোগ্য ভোটার তালিকা প্রণয়ন ইত্যাদি। অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, বিগত নির্বাচনগুলো নিরপেক্ষ হয়েছে।

আলোচনায় অন্তত আরো দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাখার ব্যাপারে ঐক্যমত্য সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিকর্তনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।

Advertisements