বাজেট নিয়ে ভাবনা

লেখক: ড. বদিউল আলম মজুমদার ।
গত ৯ জুন আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বকালের বৃহত্তম বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করেছেন। মোট বাজেটের পরিমাণ ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা, যা বিদায়ী বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২৫.৮ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে ১৫.৬ শতাংশ বেশি। বাজেটে আয়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। উল্লেখ্য যে, প্রস্তাবিত বাজেটের বাইরেও সরকারকে আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ‘ডেট সার্ভিসিং’ বা ঋণের সুদ গুনতে হবে।

বাজেট অগ্রাধিকার এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দলিল। তাই প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আমাদের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন:এতে কার অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়েছে? এতে কি মূলত আমলাতন্ত্রের ধ্যান-ধারণাই প্রকাশ পেয়েছে? না-কি এতে জনগণ তথা নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়েছে? আর বাজেট থেকে কারাই বা কী পেল?

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার দিন-বদলের সনদে অন্তর্ভুক্ত ২৩টি অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি অগ্রাধিকার:দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ ও বিশ্বমন্দা মোকাবেলা; দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; বিদ্যুত্‌ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান; দারিদ্র্য ঘোচানো ও বৈষম্য রোখা; এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। ষষ্ঠ অগ্রাধিকার হলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ। এগুলোর ভিত্তিতেই জনগণ মহাজোটকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে। তাই এগুলোই মূলত জনগণের অগ্রাধিকার।

প্রস্তাবিত বাজেটের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, এর ব্যয় কাঠামোতে তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। শুধুমাত্র কৃষিক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধির হার কমেছে, বিদায়ী বছরের বরাদ্দ বৃদ্ধি যেখানে ছিল ১০.১ শতাংশ, সেখানে এ বছরের বরাদ্দ বৃদ্ধি ৭.৭ শতাংশ। এর মূল কারণ হল ইউরিয়া সারের মূল্য কেজিপ্রতি ১২ টাকা থেকে ২০ টাকা বৃদ্ধি। ফলে সরকারের ২৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি সাশ্রয়। মহাজোট সরকার তার মেয়াদের অর্ধেক সময় পার করেছে। তাই জনগণের অগ্রাধিকার তথা দিন-বদলের সনদে অন্তর্ভুক্ত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নই হওয়া উচিত বাজেটের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। কিন্তু বাজেটে আমরা তা দেখতে পাই না। অর্থাৎ বাজেটের প্রথাগত কাঠামোই অব্যাহত রয়েছে, একটি ছাড়া সর্বক্ষেত্রেই প্রায় সমহারে বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে, সরকারের মেয়াদ আড়াই বছর সামনে রেখে এর ব্যাপক পুনর্বিন্যাস লক্ষ্য করা যায় না।
বাজেটটি নিয়ে আমাদের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। বিশাল অঙ্কের এ বাজেটে বাংলাদেশের ১৬ কোটি নাগরিকের প্রত্যেকের হিস্যা ১০ হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ ৫ সদস্যবিশিষ্ট পরিবারের হিস্যা প্রায় ৫১ হাজার টাকা। এ বিরাট পরিমাণ অর্থের সমতুল্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পয়ঃনিষ্কাশন, নিরাপত্তা সেবা নাগরিকদের প্রাপ্য। তারা কি তা পায়? না-কি তার পরিবর্তে বিরাট সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি ও আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানির শিকার হয় তারা?

জনগণের নিজেদের অর্থে পালিত সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে যে তারা হয়রানির শিকার হতে পারে তার অন্তত একটি প্রমাণ ঝালকাঠির দুর্ভাগা ছেলে লিমন হোসেন। আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, সরকারের বিভিন্ন তদন্ত রিপোর্ট ও সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা যা-ই দাবি করুক না কেন, লিমন একজন সন্ত্রাসী বলে দেশের অতি নগণ্য সংখ্যক ব্যক্তিই বিশ্বাস করে। তা সত্ত্বেও পুরো রাষ্ট্রই যেন আজ এ হতভাগ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। একটি তদন্ত রিপোর্ট এবং একজন কর্মকর্তাও তার পক্ষে দাঁড়াতে বা সত্য উদ্ঘাটন করতে সাহস পাননি। অনেকেই এখন বিশ্বাস করা শুরু করেছেন যে, আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রায় ভেঙ্গে পড়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন দলতন্ত্র-ফায়দাতন্ত্রে লিপ্ত। সরকারি অফিসগুলো এখন অনেকটা ‘দোকানে’ পরিণত হয়েছে। সরকারের বেতনভুক্ত ব্যক্তিরা অনেকক্ষেত্রে দোকান সাজিয়ে বসে আছেন মক্কেল কখন আসবে এবং তাদের কাছ থেকে ‘রেন্ট-সিকিংয়ে’র মাধ্যমে টু-পাইস কামিয়ে নেয়া যাবে। অনেকক্ষেত্রে প্রকাশ্যভাবেই এখন উৎকোচ দাবি করা হয়। কয়েকদিন আগের একটি ঘটনা জানি, জেলা পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা যাবেন কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি তদন্তে এবং সে অজুহাতে কর্মকর্তার ড্রাইভার তেলের পয়সার নামে মক্কেলের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা আদায় করে নেয়। এছাড়াও কর্মকর্তাদের একটা বড় সময় ব্যয় হয় ক্ষমতাধরদের বৈধ-অবৈধ তদবির সামলাতে এবং তদবিরের কারণে অনেক সময় তাদেরকে ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকতে হয়। তবে প্রশাসনে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সত্‌ কর্মকর্তা আছেন, যদিও তারা চরম চাপের মুখে এবং তাদের বদৌলতেই বর্তমান ব্যবস্থা এখনও টিকে আছে। কিন্তু দিন-বদলের সনদে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, বাজেটে সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর কোনরূপ গুরুত্বই দেয়া হয়নি।

বাজেট নিয়ে একটি আশঙ্কা। বর্তমান সরকারের প্রথম নির্বাচনী অঙ্গীকার দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা। কিন্তু বাস্তবতা হলো যে, দ্রব্যমূল্য বেসামাল। বিশ্ববাজার পরিস্থিতি, বিশেষত খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানির দামে উর্ধ্বগতি, টাকার বিনিময় হারে নিম্নগতি ইত্যাদি এ পরিস্থিতিকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। এমতাবস্থায় বাজেটে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিমাণের বিরাট ঘাটতি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আগুনে পানির পরিবর্তে ঘি-ই ঢেলে দিতে পারে। বাজেটের বিরাট ঘাটতি দু’ভাবে পূরণ করা যেতে পারে। প্রথমত, আভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বন্ড, সেভিংস সার্টিফিকেট ইত্যাদির মাধ্যমে তা সংগ্রহ করা যেতে পারে। এর ফলে ব্যবসায়ী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বাজার থেকে ‘ক্রাউডেড আউট’ বা বিতাড়িত হবার সম্ভাবনা দেখা দেবে। ফলে সুদের হার বেড়ে যাবে, বিনিয়োগ হ্রাস পাবে এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি হবে। এমনিতেই ব্যাংকখাতে এখন বিরাজ করছে ব্যাপক তারল্য সঙ্কট। এছাড়াও সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করে, যা টাকা ছাপানোর সমতুল্য, এ ঘাটতির সমাধান করতে পারে। এর ভয়াবহ প্রভাবও দ্রব্যমূল্যে পড়তে বাধ্য। আর মুদ্রাস্ফীতি গরীবদের ওপর এক ধরনের অমানবিক ট্যাক্স।

আরেকটি বিকল্প হল সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, এর পরিণতি শুভ না হওয়ারই সম্ভাবনা। কারণ এর ফলে সরকারকে দাতাদের শর্ত মেনে জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমাতে,আভ্যন্তরীন বাজার আরও উন্মুক্ত, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরাষ্ট্রীয়করণ এবং সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। ফলে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে, যা সামপ্রতিক বছরগুলোতে অনেক দেশে হয়েছে এবং এগুলো ‘আইএমএফ রায়ট’ বলে খ্যাত।

বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়ে আসা যাক, যা নিয়ে ইতিমধ্যে অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন। অতীতে কোনোদিন এডিপি আমরা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারিনি, তাই ৪৬ হাজার কোটি টাকার প্রাক্কলিত এডিপি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক। বিদায়ী বছরের প্রাক্কলিত এডিপি ছিল ৩৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা আমরা বাস্তবায়িত করতে অসমর্থ হয়েছি এবং সম্পূরক বাজেটে তা ৩৫ হাজার ৮৮০ কোটি টাকাতে নামিয়ে আনা হয়েছে। সার্বিকভাবে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে এবং এর বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থা সম্পর্কে পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উন্নয়ন প্রশাসনের উপযোগিতা সম্পর্কে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতামত বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। দারিদ্র্য দূরীকরণ: কিছু চিন্তা-ভাবনা (আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৫) গ্রন্থে তিনি দ্বিধাহীনভাবে লিখেছেন:

“দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য যে ধরনের উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা দরকার, তার সামর্থ্য বা সদিচ্ছা কোনটাই এই আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের নেই। এ লক্ষ্যে আমি একটি ত্রিমুখী সংস্কার প্রস্তাব আনতে চাই: (১) যেসব রাষ্ট্রীয় দপ্তর উন্নয়নের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং যেসব রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন, বিধিমালা উত্পাদন খাতে জনগণের স্বাধীনতা, স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগকে ব্যাহত করছে, সেসব অবিলম্বে সনাক্ত করতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে তার সংস্কার করতে হবে; (২) বর্তমানে কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র যেভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে, তার উন্নয়ন-উপযোগিতা তলিয়ে দেখতে হবে এবং এ লক্ষ্যে সিভিল সার্ভিসের সংস্কার করতে হবে; (৩) আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা নয়, একমাত্র বিকেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র-ব্যবস্থাই দারিদ্র্য দূরীকরণের কর্মসূচি দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন ও তাতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। এবং এটা করার জন্য দক্ষ প্রতিনিধিত্বশীল একটি স্থানীয় সরকার কাঠামো গড়ে তুলতে হবেঃ আমি যে স্থানীয় সরকারের কথা বলছি তা হবে স্থানীয় পর্যায়ে সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তি”(পৃ. ২৩)। দুর্ভাগ্যবশত প্রশাসনিক সংস্কার ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার বিষয় দিন-বদলের সনদের অন্যতম অগ্রাধিকার হলেও, বাজেটে এব্যাপারে, বিশেষত স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা সম্পর্কে তেমন কিছুই বলা নেই। আর বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর করা ছাড়া এডিপি বাস্তবায়নে বিরাট পরিবর্তনও আনা যাবে না।

বাজেট বাস্তবায়ন হলেও, বাস্তবায়নের গুণগত মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, অনেক সময় অর্থবছরের শেষপ্রান্তে এসে টাকা খরচের মহোত্সব সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ একটি পত্রিকায় (১৬ জুন ২০১১ ) এক রিপোর্ট অনুযায়ী, জুন মাসে এডিপির ১০ হাজার ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরে কে কত টাকা ব্যয় করতে পারবে ২০ জুনের মধ্যে তা জানানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। তেমনিভাবে ২৫ জুনের ইত্তেফাকের একটি শিরোনাম ছিল ‘এক হাজার প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে মাত্র পাঁচদিনে’। তাই ব্যয় হলেও যথাযথভাবে এবং যথার্থ কাজে ব্যয় না হলে তা থেকে সুফল পাওয়ার আশা দুরাশামাত্র। এছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবও বাজেট বাস্তবায়নে বিরাট প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। উপরন্তু এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত অনেক প্রকল্পের মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে, তাই বাস্তবায়নে এবং প্রকল্প নির্ধারণে সুশাসন তথা স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাও অতি আবশ্যক।

বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত এবং তা থেকে সর্বাধিক সুফল পেতে হলে বাজেটের মাধ্যমে অধিক সম্পদ সেসব সেক্টরকে দিতে হবে যেগুলো সবচেয়ে বেশি ‘এফিসিয়েন্ট’ বা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বাধিক দক্ষ। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি এফিসিয়েন্ট, কারণ তারা তাদের সামান্য আয় দিয়ে কষ্ট করে হলেও একটি পরিবারের ব্যবস্থাপনা করতে পারে। তাই বাজেটের মাধ্যমে তাদেরকে অতিরিক্ত সম্পদ প্রদান করা হলে, আমরা ‘বিগেস্ট ব্যাংগ ফর দি বাক’ পাব। অর্থাৎ‌ ব্যয় থেকে সর্বোচ্চ প্রতিদান পাব। তাই বাজেটে দরিদ্রদের প্রাপ্ত হিস্যা পৃথকভাবে দেখানো আবশ্যক বলে আমরা মনে করি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি কর্মসূচি বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এসকল কর্মসূচির আওতায় বিদায়ী অর্থবছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত মোট ১৭ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বিতরণ করা হয়েছে, যা ঐতিহাসিকভাবে দুর্যোগকালীন সময় ছাড়া সর্বোচ্চ বিতরণ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি ও অপচয়ের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে অনেকক্ষেত্রে যাদের প্রাপ্য তারা এগুলো পায় না। তাই এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি, যা হতে পারে বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ আইনে অন্তর্ভুক্ত ‘ওয়ার্ডসভা’র বিধান কার্যকর করার মাধ্যমে। বর্তমানে এ কর্মসূচির আওতায় ৮৪টি প্রকল্প রয়েছে, যার কনসলিডেশনও আবশ্যক। এছাড়াও এ-ধরনের খয়রাতি কার্যক্রম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি টেকসই পন্থা হতে পারে না। কারণ ভিক্ষা দিয়ে ভিক্ষক বানানো যায়, কাউকে নিজের পায়ে দাঁড় করানো যায় না। উপরন্তু খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে খাদ্যে ভেজাল প্রদান ও বিষ প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে।

পরিশেষে বিদায়ী বাজেটের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপ বা পিপিপি, আগামী অর্থবছরের জন্য এ-খাতে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত এর অধীনে একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। আমরা মনে করি যে, দারিদ্র্য দূরীকরণের ব্যাপারে প্রথম পিপিপি হতে পার্। আমাদের দেশে অনেক সংগঠন আছে যাদের এক্ষেত্রে পরীক্ষিত সাফল্য রয়েছে। তাই পিপিপির যাত্রা এখান থেকেই শুরু হতে পারে। আশাকরি, মাননীয় অর্থমন্ত্রী এ ব্যাপারে ভেবে দেখবেন।
[লেখক:সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক]
সূত্র: ইত্তেফাক, ২৭ জুন ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s