হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা ও কিছু আনুষঙ্গিক বিষয়

বদিউল আলম মজুমদার

মোটা অঙ্কের বিল দিতে হলেও আমার স্কয়ার হাসপাতালে থাকার অভিজ্ঞতা সুখময়। আমি আশা করি, যারা আমার মতো পরিচিত মুখ কিংবা পদবলে ভিআইপি নাগরিক নন, তারাও একই মানের সেবা এখান থেকে পেয়ে থাকেন। আরও আশা করি, এ ধরনের সেবার মান যেন বজায় থাকে, যা আমাদের দেশে বজায় রাখা দুরূহ। সর্বোপরি আমি অত্যন্ত খুশি হবো, যদি স্কয়ার হাসপাতালের উন্নতমানের সেবার উপকার কোনোভাবে এ দেশের অগণিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আমার সে অনুরোধ রইল।

গত ১০ জুলাই। ভোর ৫টার দিকে যথারীতি আমার ঘুম ভেঙে যায়। অনুভব করি বুকের বাঁ পাশে অর্থাৎ হার্টের ওপর এক ধরনের চাপ। খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে বিছানায় শোয়া অবস্থায়ই ইন্টারনেটে দিনের প্রধান খবরের কাগজগুলো পড়ে নিই। কিন্তু বুকের চাপ অব্যাহত থাকে।

ভাবি, হয়তো পরিশ্রান্ত বলেই শরীর প্রতিবাদ করছে। আগের দিন বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমী থেকে বাড়ি ফিরেছি। বিকেল ৫টার সময় রওনা দিয়ে রাত সাড়ে ১২টার সময় বাসায় পৌঁছেছি। যেখানে যাত্রাপথ মাত্র ৩-৪ ঘণ্টার, সেখানে লেগেছে সাড়ে সাত ঘণ্টা। আরডিএ থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টায় চন্দ্রা পর্যন্ত পৌঁছি, কিন্তু চন্দ্রা থেকে লাগে প্রায় চার ঘণ্টা।

আগের দিন আরডিএতে যেতেও লেগেছিল প্রায় সাত ঘণ্টা। এর বড় অংশই লেগেছে ঢাকা থেকে আশুলিয়া-ইপিজেড হয়ে চন্দ্রা পর্যন্ত। তাই ইপিজেড-আশুলিয়ার যানজট এড়ানোর জন্য ঠিক করি ফেরার পথে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে ফিরব। কিন্তু কোনো পথেই ঢাকার যানজট এড়ানো গেল না!

আরডিএ যাওয়া-আসার এবং আরও সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে মনে হচ্ছে, অতীতের ফেরি করে নগরবাড়ী হয়ে বগুড়ায় যাওয়া-আসার জন্য যে সময় লাগত এখনও প্রায় একই সময় লাগছে। অর্থাৎ শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু ব্রিজ নির্মাণের ফলে উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের সময় বাঁচানোর যে উপকারিতা তা কয়েক বছরেই দূরীভূত হয়ে গেছে। মাঝখানে শুধু বেড়েছে ব্যয় ও রাস্তায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি। আমার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে আমরা যাতায়াতের গতির দিক থেকে মধ্যযুগে ফিরে যেতে পারি। কিন্তু নাগরিকের এসব সমস্যা দূরীভূত করতে আমাদের সরকারগুলোর তেমন কোনো উদ্যোগই নেই, যেমন রয়েছে অপরাজনীতিতে লিপ্ত হওয়ার এবং মানুষের হৃদয়-মন জয় করার পরিবর্তে দমন-পীড়ন এবং মানুষের চোখে ধুলা দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার ও টিকে থাকার অপ্রচেষ্টায়।

বুকের ব্যথার কথায় ফিরে আসি। ব্যথা অব্যাহত থাকায় ভাবি, আরও কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলে তা হয়তো সেরে যাবে। তাই আরও ঘণ্টা দুই ঘুমানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এতেও তেমন লাভ হয় না। তবুও বিশ্বাস হারাই না_ সেরে যাবে।

অফিসে স্টাফ মিটিং। আবার হরতালের দিন। তাই সাড়ে ৯টার দিকে হেঁটে অফিসে রওনা দেই। যাওয়ার আগে জিহ্বার নিচে একটি এনজিস্ট নিই। বাসা থেকে একটু হাঁটার পরই দেখি আমার পাশে একটি রিকশা এসে দাঁড়ায়। আমাকে রিকশায় ওঠার আহ্বান জানান হাজম মাহেগীর, যিনি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ধানমণ্ডি শাখার ম্যানেজার। আগের হরতালের একদিনও তিনি আমাকে এভাবে তার রিকশায় করে অফিসের পাশে নামিয়ে দিয়ে যান। রিকশায় ওঠার পর তিনি বলেন, আমার অফিস হয়ে তিনি আজ ব্যাংকে যাবেন।

আমার অফিস পাঁচতলায়। লিফট নেই। তাই মাহেগীর সাহেবকে নিয়ে রোজকার মতো হেঁটে পাঁচতলায় উঠি। অফিসের দরজা খুলে ঢুকে হাঁপাতে থাকি। সাংঘাতিক ঘর্মাক্ত হয়ে পড়ি। মাথাও একটু একটু ঘুরাতে থাকে। বমির ভাবও অনুভব করি। সোফার ওপর শুয়ে পড়ি। আমার স্ত্রীকে ফোন করি। সহকর্মীদের খবর দেই।

সবাই তাগিদ দিতে থাকে হাসপাতালে যাওয়ার। নিজেও এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। আমাদের বহু বছরের বিশ্বস্ত ড্রাইভার সেকেন্দারকে সবাই খোঁজ করতে থাকে। কিন্তু তার ফোন বন্ধ।

হাজম মাহেগীর তখন নিজ থেকে বললেন, তিনি বাসায় গিয়ে গাড়ি এনে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। আমি বলতে থাকি_ হরতালের দিন, গাড়ি নিয়ে বের হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হবে। আমি রিকশায় হাসপাতাল যাব। কিন্তু তিনি তাতে কর্ণপাত করলেন না। তিনি বাসার উদ্দেশে রওনা দিলেন গাড়ি নিয়ে আসতে। তাকে বিরত করা গেল না। অর্থাৎ আমাদের সমাজে এখনও অনেক ব্যক্তি আছেন যারা পরোপকারের জন্য বড় ঝুঁকি নিতে দ্বিধাবোধ করেন না! এদের কারণেই শত স্বার্থপরতা সত্ত্বেও আমাদের সমাজটা এখনও চলমান আছে।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজে চালিয়ে মাহেগীর সাহেব গাড়ি নিয়ে এলেন। এখন সিদ্ধান্তের সময়_ কোন হাসপাতালে যাব? তিন বিকল্পের কথা ভাবা হলো : সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ল্যাবএইড ও স্কয়ার হাসপাতাল। এ প্রসঙ্গে আমার বারবার মনে পড়ে ১৫ বছর আগে একটি প্রাইভেট হাসপাতাল আমার মাকে তাদের অযত্ন-অবহেলার কারণে না খাইয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। আরও আগে বার-দুই সেখানে গিয়েছি, কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারিনি। একবার তো সোহরাওয়ার্দীতে গিয়ে রাত ৩টার সময় আমার বড় ছেলে মাহবুব, যে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড টিমের স্বেচ্ছাব্রতী-কোচ, ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছিল। এ কথা কারও অজানা নয়, সোহরাওয়ার্দীর মতো সরকারি হাসপাতালে গেলে সব ওষুধই বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। মাহবুব হাসপাতালের উল্টো দিকে ওষুধের দোকানে গিয়ে ছিনতাইকারীদের দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং সে অনেকটা ধস্তাধস্তি করেই দৌড়ে পালিয়ে আসে। তাই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে, যে প্রতিষ্ঠান নিজেই রুগ্ণ, না যাওয়ারই সিদ্ধান্ত হলো। প্রসঙ্গত কয়েক দশক আগেও সরকারি হাসপাতালগুলোর এমন করুণ দশা ছিল না_ বর্তমান অবস্থা বহুলাংশে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, দলতন্ত্র আর ফায়দাতন্ত্রেরই ফসল।

শুনেছি ল্যাবএইডের মান মোটামুটি ভালো। তবুও সবারই এক সুরে সিদ্ধান্ত স্কয়ারে যাওয়ার। অসুস্থ হলে আপনজনরা চায় রোগীর জন্য সর্বাধিক মানসম্মত চিকিৎসা_ হাসপাতালের ব্যয় নিজের সঙ্গতির মধ্যে কি-না সে বিবেচনা জরুরি অবস্থায় তেমন গুরুত্ব পায় না। তাই সবার চাপে স্কয়ারে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম।

হাসপাতাল নির্ধারণের সিদ্ধান্তে আরেকটি বিবেচনা গুরুত্ব পেয়েছিল। আগের দিন ভোরে আমার এক ভাতিজা মারা যায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তার সেখানে হাইমাস অপারেশন হয়েছিল। অপারেশনের পর সে মারা যায়, কিন্তু তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবারই আর্থিকভাবে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। যেমন তাকে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় করে দু’দু’বার বল্গাড-পল্গাজমা নিতে হয়েছিল, পরে সার্জনের সঙ্গে আলাপ করে আমি জানতে পারি যে, এর কোনো প্রয়োজনই ছিল না। এ ছাড়াও তাকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০টি হিমোগেল্গাবিন/ইমোগেল্গাবিন ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। এমন ব্যয়বহুল চিকিৎসা তার পুরো পরিবারকে আর্থিকভাবে সর্বশান্ত করে ফেলে। প্রসঙ্গত ১৩ লাখ টাকার ইনজেকশন কেনা হয়েছে আমাদের একজন ধনাঢ্য সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন ফার্মেসি থেকে। আমার একজন অতি পরিচিত ডাক্তারের অনুরোধে মালিক এ সর্বশান্ত পরিবারটির জন্য ইনজেকশনপ্রতি, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, মাত্র ৫০০ টাকা ছাড় দেন।

মাহেগীর সাহেব নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাকে নিয়ে আসেন হাসপাতালে। গাড়িতে বসে সৌদি আরবে কর্মরত আমার ডাক্তার-শ্যালকের কথামতো আরেকটি এনজিস্ট জিহ্বার নিচে দেই এবং তিনটি বেবি এসপ্রিন চিবিয়ে খেয়ে ফেলি (আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে খবর পৌঁছে যায়)। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রবেশ পথ দেখি ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ। কয়েকজন নিরাপত্তা প্রহরী ও পুলিশ দেখতে পাই পাশে। আমাদের তাই ঢুকতে হয় প্রবেশের পরিবর্তে প্রস্থানের পথ ধরে। জরুরি বিভাগের সামনে এসে দাঁড়াতে দেখি একটি পতাকা উড়ানো গাড়ি আসছে প্রবেশপথ দিয়ে। জানি না গাড়িতে কোনো মন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টা ছিলেন। তবে হরতালের দিনেও, যখন আশপাশে কোনো গাড়ি-ঘোড়া ছিল না, তার আগমনের জন্য জরুরি বিভাগের প্রবেশপথ বন্ধ রাখতে হলো। হায় রে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিআইপি নাগরিক!

জরুরি বিভাগে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই কর্তব্যরত নার্স ও সহযোগীরা তাদের করণীয় করতে শুরু করেন। কেউ অক্সিজেন লাগিয়ে দেন। কেউ বল্গাডপ্রেসার মাপতে থাকেন। আয়োজন চলতে থাকে রক্ত নেওয়ার। ইসিজি করার। ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের সেবার মান দেখে মনে হয়েছে, কোনো বিদেশের হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চেয়ে তাদের সেবার মান কম নয়। বাইরের হাসপাতালেও জরুরি বিভাগে আমার যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এ ছাড়া আমার এক ডাক্তার ছেলে বিদেশের এক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্মরত।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডাক্তার সারোয়ার-ই-আলম, যিনি স্কয়ার হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট, আসেন আমাকে দেখতে। তিনি প্রথমেই বলেন, তিনি আমাকে চেনেন। তিনি আমার কাছ থেকে জানতে চাইলেন আমার অবস্থা। তার সহকর্মীদের দিলেন প্রয়োজনীয় নির্দেশ। তিনি বললেন, আরেক ডাক্তার তাকে আমার স্কয়ার হাসপাতালে আসার ব্যাপারে টেলিফোন করেছেন। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ!

যাওয়ার আগে ডাক্তার সারোয়ার বলে গেলেন, কার্ডিওলজিস্ট ডা. তৌহিদুজ্জামানকে খবর দেওয়া হয়েছে, তিনি শিগগিরই আসবেন আমাকে দেখতে। তিনি দ্রুত এলেনও এবং আমার ইসিজি দেখলেন। আমার সঙ্গে কথা বললেন। জানতে চাইলেন আমার হৃদরোগের ইতিহাস। আমি বিস্তারিতভাবে বললাম। বললাম সাইলেন্ট হার্টঅ্যাটাকের কথা। তেরো বছর আগে তিনটি স্টান্ট বা রিং লাগানোর কথা। আমাদের দেশে বদনাম আছে_ ডাক্তাররা কথা বলেন না, তাদের সঙ্গে কথা বলাও যায় না। কিন্তু ডা. তৌহিদুজ্জামানকে নিঃসন্দেহে তার ব্যতিক্রম_ তিনি বিস্তারিতভাবে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আমার কথা শুনেছেন।

ডা. তৌহিদুজ্জামান আমাকে পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশ দিলেন। আমাকে সিসিইউতে_ ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে, শুনলেই ভয় পাওয়ার মতো!_ নিয়ে যাওয়া হলো। সিসিইউতে প্রবেশ করে আশ্বস্তবোধ করলাম। মনে হলো সবকিছু সাজানা-গোছানো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। নার্স এবং কর্তব্যরত ডাক্তারও তাদের দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। সবকিছুই রুটিনমাফিক চলমান।

হাসপাতালে এক রাত আমাকে থাকতে হলো। ইতিমধ্যে বারবার আমার ইসিজি করা হয়। রক্ত পরীক্ষা করা হয়। বিভিন্ন ওষুধ খাওয়ানো হয়। সর্বোপরি আমাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। লতা, ফারজানা, মর্জি, শম্পা নামের চারজন তরুণ বয়সের নার্স এবং কয়েকজন তরুণ ডাক্তার নিষ্ঠার সঙ্গে এ কাজটি করেন। কে বলে বাঙালিরা কাজ করে না_ অনুকূল পরিবেশে কর্মস্পৃহার দিক থেকে আমরা অদ্বিতীয়!

যথাযথ চিকিৎসা ও সেবার ফলে আরেকটি হার্টঅ্যাটাক এড়ানো গেল! তাই পরদিন আমার হাসপাতাল ত্যাগ করার কথা। বিদায়ের আগে ডা. তৌহিদুজ্জামান আমার চিকিৎসার জন্য কী কী করা হয়েছে তা ধৈর্যসহকারে বর্ণনা করলেন এবং কয়েকটি ওষুধ বদলিয়ে দিলেন। পরামর্শ দিলেন শিগগিরই যেন একটি এনজিওগ্রাম করি। আমার যথাযথ সেবা-যত্নের জন্য ডাক্তার ও তার সহকর্মীদের আন্তরিক ধন্যবাদ। আরও ধন্যবাদ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীকে, যারা বিভিন্নভাবে আমার খোঁজখবর নিয়েছেন এবং আমার শুভকামনা করেছেন_ এমনকি কিছু জায়গায় আমার জন্য প্রার্থনাও করা হয়েছে। সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমার মনে একটি ভাবনা বারবার উদিত হতে থাকে। বর্তমান বাজেটে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন মিলিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে মোট বরাদ্দ ৮ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। এ টাকায় বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জনপ্রতি হিস্যা প্রায় ৫৫৫ টাকা, যার সিংগভাগই ব্যয় হয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অবকাঠামো নির্মাণ ও সংরক্ষণ খাতে। অর্থাৎ এসব ব্যয় বাদ দিলে জনপ্রতি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য এর অতি সামান্যই (হয়তো কয়েক টাকা) বাকি থাকবে। কিন্তু সমাজের অতিদরিদ্র ব্যক্তিও তার নিজের ও পরিবারের জন্য স্বাস্থ্য খাতে বার্ষিকভাবে সরকারি বরাদ্দের চেয়ে অনেক বেশি মাথাপিছু ব্যয় করে। তাই স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় হওয়া উচিত কৌশলগত, যাতে সরকারি ব্যয় জনগণের ব্যয়কে আরও বেশি ‘ম্যাগনিফাই’ বা অধিক ফলপ্রসূ করে তুলতে পারে। অর্থাৎ সরকার পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো যদি কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, সেগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত লোকবল যদি সেখানে অবস্থান করে এবং তারা মানসম্মত সেবা প্রদান করে, তাহলে সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা অর্থ তাদের জন্য অনেক বেশি কল্যাণ বয়ে আনবে।

বিদায়ের আগে বিল নেওয়ার এবং পরিশোধের পালা। বিল মোটা অঙ্কের নিঃসন্দেহে। কিন্তু বিল দেখে আঁতকে উঠিনি, কারণ এতে একগাদা অপ্রয়োজনীয় টেস্ট বা প্রসিডিউরের চার্জ ছিল না, যা আমার ভাতিজার বেলায় ঘটেছিল। আমাদের সবারই জানা, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট প্রদান এবং তা থেকে ডাক্তারদের কমিশন আদায় আমাদের ডাক্তারি পেশার জন্য একটি বড় কলঙ্ক। মনে হয়, স্কয়ার এর থেকে মুক্ত।

পরিশেষে মোটা অঙ্কের বিল দিতে হলেও আমার স্কয়ার হাসপাতালে থাকার অভিজ্ঞতা সুখময়। আমি আশা করি, যারা আমার মতো পরিচিত মুখ কিংবা পদবলে ভিআইপি নাগরিক নন, তারাও একই মানের সেবা এখান থেকে পেয়ে থাকেন। আরও আশা করি, এ ধরনের সেবার মান যেন বজায় থাকে, যা আমাদের দেশে বজায় রাখা দুরূহ। সর্বোপরি আমি অত্যন্ত খুশি হবো, যদি স্কয়ার হাসপাতালের উন্নতমানের সেবার উপকার কোনোভাবে এ দেশের অগণিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পেঁৗছানো যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আমার সে অনুরোধ রইল।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক সুজন_ সুশাসনের জন্য নাগরিক

সূত্র: সমকাল, ১৪ জুলাই ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s