সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ও তার তাৎপর্য-১

ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল ২৯১-১ ভোটে পাস হয়েছে। একমাত্র বিরোধিতাকারী ছিলেন স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম। অধিবেশনে অনুপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের ১১ জন ও জাতীয় পার্টির একজন সদস্য। উল্লেখ্য, মহাজোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৭০, জাপার ২৯, জাসদের ৩ এবং ওয়ার্কার্স পার্টির ২ জন সদস্য রয়েছেন।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মোটা দাগে সংবিধান থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ পড়ে গেল। স্থায়িত্ব পেল রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম। সংযুক্ত হল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা। স্বীকৃতি পেল বল প্রয়োগ করে সংবিধান সংশোধন, বাতিল, স্থগিত ও সংবিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থাহীনতা সৃষ্টি ইত্যাদি এবং এ কাজে সহযোগিতা বা উস্কানি প্রদান ও সমর্থন রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে। অবৈধ হল সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংশোধন। বর্ধিত হল সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন আরও পাঁচটি। বাতিল হল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার। হয়নি বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের লক্ষ্যে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের পুনঃস্থাপন ও আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান ইত্যাদি।

সংবিধানে এসব পরিবর্তনের দুটি দিক রয়েছে। একটি পদ্ধতিগত দিক, আরেকটি হল সংবিধান সংশোধনের বিষয়বস্তু সম্পর্কিত। এ দুটি দিক নিয়ে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যেই নয়, অনেক নাগরিকের মনেও গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বস্তুত আমাদের আশংকা, এসব পরিবর্তনের পরিণতি অশুভ হবে।

পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা
সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের পদ্ধতির প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাক। ২১ জুলাই ২০১০ তারিখে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়, যাতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কোন প্রতিনিধিত্ব ছিল না- সরকারের পক্ষ থেকে সদস্যপদ প্রদান করা হলেও বিএনপি তা গ্রহণ করেনি। কমিটির জন্য কোন টিওআর বা কার্যপরিধি নির্ধারিত ছিল না।

তবে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন- সামরিক ফরমান জারি করে অতীতে সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে; আর সেজন্যই সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের বুকে যাতে সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর আর চেপে বসতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিতেই এ কমিটি। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার অনুসরণে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে এটি গঠন করা হচ্ছে। কমিটি প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে এ বিষয়ে তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করবে (প্রথম আলো, ২১ জুলাই ২০১০)। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী কমিটির উদ্দেশ্য মূলত সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী সম্পর্কিত আদালতের রায় বাস্তবায়ন এবং অবৈধ ক্ষমতা দখল রোধ করা।

পরবর্তী সময়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে কমিটির সভাপতি বেগম সাজেদা চৌধুরী অবশ্য সংবিধান সংশোধনের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের কথা বলেন : অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার দখল বন্ধ করা; জনগণের স্বাধীন-সার্বভৌম ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা; মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত ও সংরক্ষণ করা; আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণ ও জনগণের প্রদত্ত ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করা এবং সর্বোচ্চ আদালতের রায় কার্যকর করা (যুগান্তর, ২৩ জুলাই ২০১০)।

কমিটি ২৭টি বৈঠক করা ছাড়াও তিনজন সাবেক প্রধান বিচারপতি, ১১ জন শীর্ষ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ, ১৮ জন বুদ্ধিজীবী, ১৮টি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, রাজনৈতিক দল ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম নেতাদের মতামত নেয়। সিপিবি কমিটির কাছে লিখিত সুপারিশ প্রদান করে। বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের অধিকাংশই বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত করার পক্ষে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার ও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে রাখার বিপক্ষে মতামত দেন। কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কোন সুপারিশ না রেখেই কমিটি তার রিপোর্ট চূড়ান্ত করে (যুগান্তর, ১ জুলাই ২০১১), যদিও প্রধানমন্ত্রী বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের ভিত্তিতে কমিটির প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কথা সংসদে বলেছিলেন। এছাড়াও কমিটি সাধারণ নাগরিকদের কোন মতামতই গ্রহণ করেনি।

গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী কমিটির চূড়ান্ত করা রিপোর্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ২৭ মে সমকালে’র হেডলাইন ছিল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার রেখেই সংবিধান সংশোধন হচ্ছে।’ অন্য প্রায় সব জাতীয় দৈনিকও একই হেডলাইন করেছিল। কিন্তু কমিটি ৩০ মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর প্রেক্ষাপট বদলে যায় এবং কমিটির অবস্থান দাঁড়ায়- ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার সুযোগ নেই’ (প্রথম আলো, ৩১ মে ২০১১)। কমিটির একাধিক সদস্য অবশ্য এ ব্যাপারে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে সংবাদপত্রে রিপোর্ট বেরিয়েছে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিয়ে গত ৮ জুন প্রকাশিত ৫১টি সুপারিশ সংবলিত কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট সংসদে উত্থাপন করা হয়। সুপারিশগুলো দেখে মনে হয় যেন কমিটি এক ধরনের ‘ফিশিং এক্সপেডিশনে’ লিপ্ত হয়েছে, যদিও কমিটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে বলতে শোনা গিয়েছে, তাদের সুপারিশে কোন বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা থাকবে না।

কমিটির সুপারিশগুলো ২০ জুন মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে এবং চারদিন পর ২৫ জুন এগুলো বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হয়। একই দিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দুই সপ্তাহের সময় দিয়ে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে এটি প্রেরণ করা হয়। কমিটি ৪টি উপ-দফা যুক্ত করার সুপারিশ করে মোট ৫৫টি দফা সংবলিত প্রতিবেদন দাখিল করে ২৯ জুন। পরদিন অর্থাৎ সংসদে উত্থাপনের পাঁচদিনের মাথায় বাজেট অধিবেশনেই- এর জন্য সংসদের কোন বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়নি- সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিলটি পাস হয়।

সংবিধান একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন; বস্তুত এটি কোন সাধারণ আইন নয়। এতে প্রতিফলিত হয় ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি’ [অনুচ্ছেদ ৭(২)]। সংবিধান জাতির জন্য ধ্রুবতারা সমতুল্য। এটি কোন ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়। তাই জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সংবিধান সংশোধন আবশ্যক। কিন্তু সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়েছে একতরফাভাবে, অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে এবং অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে। বিরোধী দলের সম্পৃক্ততা ছাড়া এবং বিশিষ্টজনদের মতামত সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেই। বিএনপি অবশ্য সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবেই সংসদ বর্জন করছে এবং সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন : ‘সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। বিরোধী দলের ইতিবাচক সমালোচনা, পরামর্শ এবং সংসদকে কার্যকর করতে তাদের ভূমিকা ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখব’ (প্রথম আলো, ১ জানুয়ারি ২০০৯)। কিন্তু বাস্তবতা হল, সংবিধান সংশোধনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজেও বিরোধী দলের কোন ভূমিকা ছিল না।

আরেকটি বিরাট পদ্ধতিগত ত্রুটি হল, সংশোধনটি পাস করার ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ এবং আইন ও সংসদবিষয়ক স্থায়ী কমিটি তাদের দায়িত্ব যথার্থভাবে পালন করেনি। সংসদীয় গণতন্ত্রে সব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিভাজিত হয় তিনটি বিভাগের মধ্যে : নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ। এ তিনটি প্রতিষ্ঠান স্বাধীন সত্তার অধিকারী হওয়া এবং পরস্পরের ওপর নজরদারিত্ব রাখার কথা। ক্ষমতার এরূপ বিভাজনের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করার ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ হিসেবেই কাজ করেছে। অর্থাৎ আবারও প্রমাণ হল যে, আমাদের সংসদ একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠান ও মূলত একটি রাবার স্ট্যাম্পিং বডি। আর আমাদের ‘বাঁ’-ঘরানার কয়েকজন সংসদ সদস্য কিছু পাঁয়তারা করলেও নীতি-আদর্শ সম্পূর্ণভাবে জলাঞ্জলি দিয়ে সংসদ সদস্য পদ রক্ষার খাতিরে শেষ পর্যন্ত সংশোধনীর পক্ষেই ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ তারা বিবেকের আদালতে হেরে গিয়েছেন।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সংসদের প্রাণ এবং এর ভূমিকা অতন্দ্রপ্রহরীর। কিন্তু দুই সপ্তাহ সময় দেয়া হলেও চারদিনের মধ্যে মাত্র দুটি বৈঠকেই সংশ্লিষ্ট কমিটি তার সুপারিশ চূড়ান্ত করে। কমিটি প্রস্তাবিত বিল থেকে কোন কিছুই বাদ দেয়নি, শুধু কয়েকটি গুরুত্বহীন সংযোজন এতে করা হয়েছে। কমিটি যে স্বাধীনভাবে কাজ এবং অতন্দ্রপ্রহরীর ভূমিকা পালন করেনি তা সুস্পষ্ট হয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের একটি বক্তব্য থেকে। তিনি বলেছেন : ‘আমি আওয়ামী লীগ করি। আওয়ামী লীগের নীতি ও সিদ্ধান্তই আমার নীতি ও সিদ্ধান্ত। শেখ হাসিনা আমার নেত্রী। এর বাইরে কিছু নেই’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১ জুলাই ২০১১)।

এটি সুস্পষ্ট যে, সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই, যাকে জেমস মেডিসন ও অন্যরা ‘টিরানি অব দি মেজরিটি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, জাতির ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এছাড়াও এর মাধ্যমে সমঝোতার পরিবর্তে সংঘাতের রাজনীতির প্রসার ঘটে।

সংবিধান সংশোধনের বিষয়বস্তু
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল ও নিরপেক্ষ নির্বাচন : সংশোধনীর বিষয়বস্তুর বিষয়ে আসা যাক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের রায় এখনও প্রকাশিতই হয়নি। গত ১০ মে তারিখে ঘোষিত সংক্ষিপ্ত ও বিভক্ত আদেশে আদালত বলেছেন : ‘(২) সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী ভবিষ্যতের জন্য বাতিল ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করা হল। (৩) যা সাধারণত আইনসিদ্ধ নয়, প্রয়োজন তাকে আইনসিদ্ধ করে, জনগণের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন- এ সকল সনাতন তত্ত্বের ভিত্তিতে দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন পূর্বে উল্লিখিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।’

অন্যভাবে বলতে গেলে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ‘প্রসপেকটিভলি’ বা ভবিষ্যতের জন্য অবৈধ ঘোষণা করে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার খাতিরে এটি আরও দুই টার্ম রাখার পক্ষে আমাদের সর্বোচ্চ আদালত মত প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ আদালত অতীতের এবং আগামী দুই টার্মের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ‘কনডোন’ বা মার্জনা করেছেন। আইন আদালতের রায়ের অজুহাত দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া দুরূহ।

তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বাতিল আমাদের এক ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত করতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন ছিল রাজনৈতিক দলের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের এবং দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়- জনগণের বিরাট অংশের এমন ধারণারই ফসল। এর জন্য আরও দায়ী নির্বাচন কমিশনের অকার্যকারিতা, রাজনৈতিক দলের অসদাচরণ ও বিধিবিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং প্রার্থীদের ছলে-বলে-কলে-কৌশলে নির্বাচনে জেতার মানসিকতা। এ অবস্থার পরিবর্তন এখনও হয়নি। যেমন- নির্বাচন কমিশন এখনও পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে বলে মনে হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, নবম জাতীয় সংসদ অনুমোদিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা, অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন ও বিদেশী শাখার বিলুপ্তি বাধ্যতামূলক হলেও আমাদের নির্বাচন কমিশনের পক্ষে, রাজনৈতিক দলগুলোর রক্তচক্ষুর কারণে, এগুলো কার্যকর করা সম্ভবপর হয়নি। এছাড়াও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও (অনুচ্ছেদ ১১৮), নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের ব্যাপারে এ পর্যন্ত কোন আইন প্রণয়ন করা হয়নি, ফলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনারদের মেয়াদ আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তীর্ণ হওয়ার পর পরবর্তীতে যে সৎ, যোগ্য, নিরপেক্ষ ও নির্ভীক ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেয়া হবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। এ ব্যাপারে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা ইতিবাচক নয়।

আর শুধু নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করলে এবং এতে যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিলেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত হবে না। এর জন্য আরও প্রয়োজন হবে প্রশাসন ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা। যেমন- একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ১০ লক্ষাধিক সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। এরা যদি নিরপেক্ষ আচরণ না করে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রায় অসম্ভব।

প্রসঙ্গত, ২২ জানুয়ারি ২০০৭ তারিখে অনুষ্ঠেয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। আমরা শুনেছি, ড. ইয়াজউদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বিচারপতি আজিজের নেতৃত্বের নির্বাচন কমিশনকে মেনে নিয়েই মহাজোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিল, কারণ তারা আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, নির্বাচনে জয়ী হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে এ আশংকা থেকে যে, তারা নির্বাচনে জয়ী হলেও চরম পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনী ফলাফল পাল্টে দিতে পারে। বিএনপির ডাকা গত ৬-৭ জুলাইয়ের হরতালের সময় পক্ষপাতদুষ্ট আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কী জঘন্য আচরণে লিপ্ত হতে পারে, তার একটি নমুনা দেশবাসী দেখেছে।

সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দল এবং তাদের মনোনীত প্রার্থীদের সদাচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গিয়েছে (যেমন- মাগুরার উপনির্বাচনে) ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও দলের মনোনীত প্রার্থীরা প্রশাসন এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে কিংবা পরোক্ষ নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে নির্বাচনী কারচুপিতে লিপ্ত হয়। তাই রাজনৈতিক দলগুলো অপকর্মে লিপ্ত এবং যে কোন মূল্যে নির্বাচনে জেতার জন্য বদ্ধপরিকর হলে সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হতে বাধ্য। তাই নির্বাচনী সমীকরণে নির্বাচন কমিশন একটি পক্ষ মাত্র। অর্থাৎ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। প্রসঙ্গত, ক্ষমতাসীনরা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বললেও প্রশাসন ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতার এবং রাজনৈতিক দলের সদাচরণ ও সংস্কারের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের ফলে দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের আশ্বাসে বিশ্বাস করলেও অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। অতীতে দলীয় সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনই নিরপেক্ষ হয়নি (আমাদের সময়, ৩ জুলাই ২০১১)। আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভবিষ্যতে তা সম্ভব বলেও আশা করা যায় না। আমাদের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে যে ধরনের দলীয়করণ হয়েছে এবং হচ্ছে, তাতে সরকারকে নির্বাচন প্রভাবিত করতে কিছুই করতে হবে না- এমনকি ক্ষমতাসীনদের চোখের ইশারাও লাগবে না। দলতন্ত্রে লিপ্ত ও ফায়দাতন্ত্রের সুফলভোগকারী কর্মকর্তারা তাদের নিজেদের স্বার্থে স্বপ্রণোদিত হয়েই তা করবেন। তাই বর্তমান বাস্তবতায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে সরানো প্রায় অসম্ভব হবে। ফলে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে এবং আমরা ভবিষ্যতে ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত হতে পারি। প্রসঙ্গত, পঞ্চদশ সংশোধনীর ফলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও কেউ কেউ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা বলে এক ধরনের ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব ও হানাহানির পরিণতি আমরা জানি। এ ধরনের অবস্থা আমাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করবে। উগ্রবাদকে উস্কিয়ে দেবে, কারণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত রাজনৈতিক দলগুলোই সমর্থনের বিনিময়ে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেবে, যা অতীতে হয়েছে। এছাড়াও উগ্রবাদীরা ঘোলাপানিতে মাছ শিকারে পটু। আর জঙ্গিবাদের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আমাদের ঘাড়ের ওপর ইতিমধ্যেই পড়ছে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

সূত্র: যুগান্তর, ২০ জুলাই ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s