প্রয়োজন বিকেন্দ্রীকরণ, মন্ত্রণালয়ের সংকোচন ও পুনর্গঠন

বদিউল আলম মজুমদার

প্রয়োজন যোগাযোগ খাতসহ অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ, উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রম সংকোচন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে এসব কাজের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ। আর নির্বাচিত জেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা ও পুরো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই হতে হবে বিকেন্দ্রীকরণ ও দায়বদ্ধতা সৃষ্টির মাধ্যম।

মহাসড়কের বেহাল দশা, দায়িত্ব পালনে অপারগতা, অতিকথন এবং অনৈতিক আচরণের জন্য সম্প্রতি বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠেছে। সরকারদলীয় অনেক নেতা ও সংসদ সদস্য এবং মহাজোটের শরিকদের পক্ষ থেকেও এ দাবি তোলা হয়েছে। আর মন্ত্রীরা একে অপরের দোষারোপ করছেন। উদাহরণস্বরূপ মাননীয় যোগাযোগমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, অর্থ বরাদ্দের সমস্যার কারণে আমাকে পদত্যাগ করতে বলা ঠিক নয় (আমাদের সময়, ২০ আগস্ট ২০১১)। এমনকি পদত্যাগ দাবিকারীদের তিনি হুমকিও দিয়েছেন।

অনেক নাগরিকই মন্ত্রীদের পরস্পরের দোষারোপের অপচেষ্টায় ক্ষুব্ধ। অনেকেই মনে করেন, অজুহাত প্রদর্শন এবং অন্যকে দোষারোপ করার প্রতিশ্রুতি তো গত নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের ‘ভোটভিক্ষা’র অংশ ছিল না এবং এ জন্য ভোটাররাও তাদের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেনি। তারা নির্বাচিত হয়েছেন সেবা প্রদানের জন্য। বস্তুত সরকার দিনবদলের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় গেছে। তাই জনগণ সমস্যার সমাধান চায়, দোষারোপ নয়, এমনকি অতীত সরকারের অপকর্মের অজুহাতও আর নয়।

অবশ্যই বেশ কয়েকজন মন্ত্রী তাদের দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ। তারা তাদের মন্ত্রণালয় সঠিকভাবে চালাতে পারছেন না। তবে তারা আরও বড় মাত্রার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন নিজের দোষ স্বীকার না করে এবং অন্যের ওপর ব্যর্থতার দায়ভার চাপিয়ে। কারণ ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার প্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো দোষ স্বীকার করা এবং তা কাটিয়ে ওঠার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া। ব্যর্থতা স্বীকার না করলে তা কাটিয়ে ওঠার প্রশ্নই আসে না এবং এ ব্যাপারে সংশিল্গষ্ট ব্যক্তিরও কিছুই করার থাকে না। তাই স্কেপগোট বা ‘নন্দলাল’ খোঁজা আরও বড় ধরনের ব্যর্থতা।

এ ছাড়াও সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভা একটি যৌথ সত্তা। আমাদের সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন।’ অর্থাৎ মন্ত্রিসভার এক সদস্যের ব্যর্থতার জন্য সবাই দায়ী। তাই তাদের একে অপরকে দোষারোপ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে মন্ত্রীদের কেউ ব্যর্থ হলে তাকে অবশ্যই ব্যক্তিগতভাবে সেই দায়ভার নিতে হবে এবং সেই ব্যর্থতার জন্য প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের ৫৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার পদত্যাগের অনুরোধ করতে পারেন। সংশিল্গষ্ট মন্ত্রী পদত্যাগ না করলে প্রধানমন্ত্রী তাকে অপসারণের জন্য রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন।

রাস্তাঘাটের বেহাল দশার জন্য অবশ্যই যোগাযোগমন্ত্রীর ব্যর্থতা দায়ী। গত কয়েক মাস আগে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা নিয়ে সংসদে ব্যাপক আলোচনা হয়। মাননীয় সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ আলোচনার সূত্রপাত করলেও অনেকেই এতে অংশ নেন। এমনকি মাননীয় স্পিকারও এতে কণ্ঠ মেলান। এরপরও প্রয়োজনীয় মেরামতকার্য সম্পাদন করা হয়নি। যোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, তিনি এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাননি। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন না কেন? মন্ত্রিসভার বৈঠকে তা উত্থাপন করলেন না কেন? এটি যোগাযোগমন্ত্রীর ব্যর্থতা এবং এর দায়ভার তাকে নিতেই হবে। কারণ দায়বদ্ধতা না হলে গণতন্ত্র হয় না। এর জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক পথ হলো স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা। আর তিনি তা না করলে ‘ক্যাপ্টেন’ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকেই তাকে অপসারণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগই কিন্তু সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। সমস্যাটি হলো অতি কেন্দ্রিকতা। আমাদের বড় বড় সড়কের অনেকগুলোই এককালে তৈরি করেছে জেলা বোর্ড, যা একসময় একটি পরাক্রমশালী প্রতিষ্ঠান ছিল। এখন জেলা পরিষদ অস্তিত্বহীন। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা পরিষদের জন্য একটি আইন প্রণীত হয়, কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে অদ্যাবধি এর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। আর নির্বাচন না হলে পরিষদ গঠিত হয় না। জেলা পরিষদের অস্তিত্বহীনতার কারণে সব সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও এলজিইডির কাছে চলে যায়। এখন শুধু যোগাযোগ মন্ত্রণালয়েরই নয়, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলজিইডির অনেক রাস্তার অবস্থাও করুণ।

স্মরণ করা প্রয়োজন, এলজিইডির পুরো নাম ‘লোকাল গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট’ বা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ। অর্থাৎ এলজিইডি স্থানীয় সরকারের নামেই রাস্তাঘাট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে, যদিও নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এলজিইডি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগ_ এর ওপর সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের কোনো এখতিয়ার নেই।

সড়কগুলো যদি জেলা পরিষদের অধীনে থাকত, তাহলে এগুলোর এমন বেহাল দশা হতো না। উদাহরণস্বরূপ, যদি ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের যে অংশ গাজীপুরের মধ্যে পড়েছে, সেটুকু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গাজীপুরের নির্বাচিত জেলা পরিষদের ওপর থাকত, তাহলে রাস্তার মেরামত অনেক আগেই হতো। কারণ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা গাজীপুরের বাসিন্দা হিসেবে এ মহাসড়ক ব্যবহার করতেন এবং তারা এর অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা লাভ করতেন। আর রাস্তা মেরামত না হলে তারা প্রতিনিয়ত ভোটারদের তোপের মুখে পড়তেন। এ ছাড়াও নির্বাচনের সময় তাদের সড়কগুলো ভালো অবস্থায় রাখার প্রতিশ্রুতি প্রদান করতে হতো। আর প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে পরবর্তী নির্বাচনে এর মাশুল তাদের দিতে হতো।

অন্যদিকে মহাসড়কগুলো যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে, কিন্তু সংশিল্গষ্ট মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং ইঞ্জিনিয়ারদের অধিকাংশই ঢাকায় অবস্থান করেন। ফলে তাদের রাস্তা খারাপ হলে এর ভুক্তভোগী হতে হয় না। এ ছাড়া মন্ত্রী মহোদয়ের পরবর্তী নির্বাচনে জেতা নির্ভর করে তার নির্বাচনী এলাকার ভেটারদের ওপর, সারাদেশের নাগরিকদের ওপর নয়। উপরন্তু মন্ত্রণালয়ের বহু অগ্রাধিকার_ আকাশ, সড়ক, পাতাল রেল, পদ্মা সেতু ইত্যাদি। তাই রাস্তা মেরামতের প্রতি নজর দেওয়ার তাদের সময় কোথায়!

‘দুষ্ট লোকেরা’ অবশ্য বলেন, কর্মকর্তারা অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ক্রাইসিস বা জরুরি অবস্থা সৃষ্টি করেন। কারণ জরুরি অবস্থায় প্রচলিত নিয়মনীতি ও পদ্ধতি উপেক্ষা করে কাজ করতে হয়, তাই সেই সময়ে সংশিল্গষ্টরা বেশি বেশি ‘লাভ’ করতে পারে। তবে এবার ক্রাইসিসটা হয়তো বড় বেশি ও ব্যাপক হয়ে গেছে।

মন্ত্রণালয়ে একটি আমলাতন্ত্র রয়েছে, যা অনেক জটিলতা ও বিলম্ব সৃষ্টি করে। এ ছাড়াও আমাদের সরকার পদ্ধতি হলো সংসদীয় কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার, তাই মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের ওপর প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়েরও ব্যাপক খবরদারি রয়েছে। এ ধরনের খবরদারিও বিলম্ব সৃষ্টি করে। তদুপরি দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্রের নগ্ন চর্চার ফলে আমলাতান্ত্রিক কাঠামো আজ চরম বেহাল দশায় এবং অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদই এখন অযোগ্য ও অদক্ষদের করায়ত্ত। উপরন্তু সরকারের অধিকাংশ টেন্ডার এবং কাজকর্ম এখন দেওয়া হয় বহুলাংশে ফায়দা প্রদানের উদ্দেশ্যে, যথাযথভাবে কার্য সম্পাদনের জন্য নয়। এর ওপর দুর্নীতি তো আছেই! এসব কারণে অর্থ ব্যয় হলেও অনেক ক্ষেত্রে কাজের কাজ তেমন হয় না। আর এগুলোর অধিকাংশই কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থার সমস্যা। ‘বিগ-ব্যাং’ বা বড় ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্পদের হস্তান্তর এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সংকোচন করার মাধ্যমে এসব সমস্যার অনেকগুলোরই সমাধান সম্ভব।

বিকেন্দ্রীকরণের ভিত্তি অবশ্য ‘সাবসিডিয়ারিটি তত্ত্ব’। সাবসিডিয়ারিটি তত্ত্বের মূল কথা হলো, অধিকাংশ সমস্যা স্থানীয় এবং এগুলোর সমাধানও হতে হয় স্থানীয়ভাবে এবং ভুক্তভোগীদের সম্পৃক্ততায়। তাই সমস্যাগুলো সমাধানের প্রথম চেষ্টা হতে হবে সবচেয়ে নিম্নস্তরের ‘সরকারের’ তথা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে। যেসব সমস্যা ইউনিয়ন পর্যায়ে সমাধান সম্ভব নয়, সেগুলো উপজেলা/পৌরসভা পর্যায়ে সমাধান করতে হবে। পরবর্তীগুলো জেলা/সিটি করপোরেশন পর্যায়ে। অবশিষ্টগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে। এ তত্ত্ব অবলম্বন করলে কেন্দ্রীয় সরকারের দায়দায়িত্ব হয়ে পড়ে অতি সীমিত_ মূলত অর্থ, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, বৈদেশিক বাণিজ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে। কারণ এসব সমস্যা স্থানীয় নয় এবং এগুলোর সমাধানও স্থানীয়ভাবে অসম্ভব। লক্ষণীয়, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব অনেক সীমিত।

গাজীপুরের উদাহরণে ফিরে যাওয়া যাক। একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির আওতায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে সংকুচিত করে যদি মহাসড়কগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনে নির্মাণের দায়িত্ব সংশিল্গষ্ট নির্বাচিত জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তাহলে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের গাজীপুরের অংশ নির্বাচিত গাজীপুর জেলা পরিষদের ওপর অর্পিত হবে। আর বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচির আওতায় এসব কাজ করার জন্য সংশিল্গষ্ট বাজেট এবং জনবল যদি গাজীপুর জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তাহলে এগুলোর ওপর নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের এখতিয়ার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।

এ ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ অনেক সুফল বয়ে আনবে বলে আমাদের ধারণা। প্রথমত, এর মাধ্যমে জনগণের কাছে সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। কারণ স্থানীয় পর্যায়েই সত্যিকারের জবাবদিহিতা তথা দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা সম্ভব। কারণ গাজীপুর জেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সেখানকার ভোটাররা অতি সহজেই প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে পারবে, কিন্তু যোগাযোগমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে সত্যিকারের ও পরিপূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। স্মরণ করা প্রয়োজন, পরিপূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশনা রয়েছে। তৃতীয়ত, এ ধরনের বিকেন্দ্রীকরণের ফলে ঢাকা শহরের ওপর জনসংখ্যা ও সেবাপ্রাপ্তির চাপ কমে যাবে এবং সারাদেশের সুষম উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হবে। অর্থাৎ ঢাকা শহর যেভাবে ধীরে ধীরে ‘মৃত্যুর’ দিকে অগ্রসর হচ্ছে এর মাধ্যমে সে পরিণতি এড়ানো যাবে।

বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশার জন্য অবশ্যই মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে যোগাযোগমন্ত্রী দায়ী। কিন্তু এর জন্য আমাদের জাতীয় সংসদ, বিশেষত যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কি তার দায়িত্ব এড়াতে পারে? স্থায়ী কমিটি সংসদের প্রাণস্বরূপ। কারণ স্থায়ী কমিটির মাধ্যমেই সংসদ সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। কিন্তু কয়েকজন সংসদ সদস্য সংসদে যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা সম্পর্কে প্রশ্ন তুললেও কমিটির পক্ষ থেকে এ বিষয়টি নিয়ে কোনো জনশুনানি করা হয়েছে বলে আমরা শুনিনি। বরং কমিটির সদস্যদের কেউ কেউ মন্ত্রণালয় থেকে অবৈধ সুবিধা নিচ্ছেন বা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম প্রভাবিত করতে বিভিন্ন ধরনের তদবিরে লিপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত রেলওয়ের ঠিকাদারি সংসদীয় কমিটির প্রধানের নিজস্ব, অন্তত পারিবারিক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে বলে আমরা গণমাধ্যমে প্রতিবেদন দেখেছি। প্রসঙ্গত, সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কে লিপ্ত ব্যক্তি আইনানুযায়ী সংসদ সদস্য হওয়ারই অযোগ্য। তাই যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিও তাদের জনস্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে বলে মনে হয় না।

এ ছাড়া বিরোধী দলও সংসদে জনগণের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরার দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সরকারকে তারা জবাবদিহিতার মুখোমুখি করছে না। লাগাতার সংসদ বর্জনের ফলেই মূলত তা ঘটছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, লাগাতার সংসদ বর্জনের এ ঐতিহ্য আমাদের জাতীয় সংসদকে অকার্যকর করার পেছনে একটি বড় কারণ। পরিশেষে, সড়ক-মহাসড়কের দুরবস্থার কারণে অনেক উদ্বিগ্ন নাগরিক যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন, যা জরুরি ভিত্তিতে ঘটা আবশ্যক। কিন্তু এটি যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার স্থায়ী সমাধান নয়। এর জন্য প্রয়োজন যোগাযোগ খাতসহ অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ, উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রম সংকোচন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে এসব কাজের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ। আর নির্বাচিত জেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা ও পুরো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই হতে হবে বিকেন্দ্রীকরণ ও দায়বদ্ধতা সৃষ্টির মাধ্যম। তাই আজ সর্বাধিক প্রয়োজন পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার আমূল পুনর্বিন্যাস, সংস্কার তথা রূপান্তর।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)

সূত্র: সমকাল, ২৬ আগষ্ট ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s