কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে

সড়ক নিরাপত্তা

বদিউল আলম মজুমদার

‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে …।’ এ বিখ্যাত উক্তিটি দ্বারা কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনায় কবলিত ভুক্তভোগীর বেদনার কথা, যা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়, আমাদের স্মরণ করে দিয়েছেন। কথাটি যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্য আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় হাজার হাজার ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে। অসংখ্য ব্যক্তি আহত হয়। অগণিত পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একমাত্র আয় উপার্জনকারীর মৃত্যু বা আহত হওয়ার কারণে তাদের জীবন-জীবিকার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। তাদের জীবন তছনছ হয়ে যায়। মানসিকভাবে তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মৃত্যুবরণ করে তারা চিরতরে জনসমক্ষ থেকে বিদায় নেয়। কিন্তু মৃত ব্যক্তিদের পরিবার-পরিজন এবং যারা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বেঁচে যায়, তারা জনসমক্ষে থেকেও বহুলাংশে মানুষের দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যায়।

ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ এবং তার সঙ্গে যুক্ত আমাদের প্রশিক্ষিত একদল স্বেচ্ছাব্রতী-উজ্জীবকের নিরলস প্রচেষ্টা বহু বছর ধরেই আমাদের সড়ক-মহাসড়কের নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যুর মিছিলের প্রতি বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। কিন্তু বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও বিশিষ্ট সাংবাদিক মিশুক মুনীরের অকাল মৃত্যুর পর বিষয়টি যেন সমাজের বিবেককে নতুন করে ধাক্কা দিয়েছে। সমাজের বিশিষ্টজনসহ অনেকেই এ ব্যাপারে সোচ্চার ও প্রতিবাদী হওয়া শুরু করেছেন। আমাদের যোগাযোগ খাতে চরম অব্যবস্থাপনা ও সীমাহীন দুর্নীতি, যোগাযোগমন্ত্রীর সমস্যা সমাধানে চরম ব্যর্থতা এবং নৌমন্ত্রীর পরীক্ষা ছাড়া গাড়িচালকের লাইসেন্স প্রদানের স্বার্থপ্রণোদিত সুপারিশ যেন মানুষের ক্ষোভের অগি্নতে ঘৃত ঢেলে দিয়েছে। মানুষ অধিক হারে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। কিন্তু তবুও যেন দুর্ঘটনায় আহত এবং নিহতদের রেখে যাওয়া পরিবার-পরিজনের কথা আলোচনার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

সড়ক থাকলে এবং সড়কে যানবাহন চলাচল করলে দুর্ঘটনা ঘটবেই। পৃথিবীর সব দেশেই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় মানুষ হতাহত হয়। এটি আধুনিকতার আরেকটি অবশ্যম্ভাবী অভিশাপ। কিন্তু বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনাজনিত হতাহতের হার অনেক বেশি। সড়কের দুরবস্থা, অদক্ষ চালক, মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন (যেমন রিকশা ভ্যান), ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা এবং তা প্রয়োগে ব্যর্থতা, যানবাহনের ফিটনেসের অভাব (যেমন পেছনে লাল বাতিহীন ট্রাক-বাস), মহাসড়কের পাশে হাটবাজার ও স্থাপনা, জনগণের অসচেতনতা (যেমন যত্রতত্র রাস্তা পার হওয়া) ইত্যাদি এর মূল কারণ। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ফলে আমাদের সড়কগুলো এখন ‘হাইওয়ে টু ডেথ’ বা মৃত্যুর মহাসড়কে পরিণত হয়েছে। আমি নিজেও একাধিকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলাম।

যেহেতু সড়ক দুর্ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক এবং তা এড়ানো যাবে না, তাই কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘প্রিভেনটিভ’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এর সংখ্যা কমানো, দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত অকুস্থলে সহায়তা পৌঁছানো এবং আহত-নিহতদের পরিবার-পরিজনের প্রয়োজনের প্রতি দৃষ্টি প্রদান।

কাজের কারণে প্রতিনিয়ত আমাকে ঢাকার বাইরে যেতে হয়। সাধারণত প্রাইভেট গাড়িতেই যাই। ফলে গত ২০ বছরে আমি অনেকগুলো দুর্ঘটনায় কবলিত হয়েছি, যা আমাকেও মৃত্যুর মিছিলে শামিল করতে পারত। এর একটি ছিল গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। আমরা কয়েকজন রাজবাড়ী গিয়েছিলাম উজ্জীবক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করতে। বিরোধী দলের লাগাতার হরতালের কারণে আমরা সেখানে আটকা পড়ে যাই। যতটুকু মনে পড়ে, সচিব রাজিয়া বেগম, যিনি বছরখানেক আগে মানিকগঞ্জের মহাসড়কেই এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান, তখন রাজবাড়ীর ডিসি। নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গাজীপুর জেলাকে নিরক্ষরমুক্ত করার এক অনন্য প্রচেষ্টায় তার সঙ্গে আমার কাজ করার সুযোগ হয়। সেই সুবাদে তিনি সার্কিট হাউসে আমাদের জন্য সান্ধ্যভোজের আয়োজন করেন। খাবার শেষে মধ্যরাতে আমরা পুলিশের সহায়তায় ফেরিঘাট পর্যন্ত আসি এবং একটি ফেরি দিয়ে নদী পার হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেই।

তখন ছিল শীতকাল এবং রাস্তায় ঘন কুয়াশা। আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে আমরা সাভারে এসে পৌঁছি। তখন আনুমানিক ভোর ৪টা। সাভারের রাস্তায় তখন নির্মাণ কাজ চলছে। রাস্তা বড় করার জন্য দু’পাশে মাটি ফেলা হয়েছে। হঠাৎ করেই মাটি ধসে আমাদের গাড়িটি রাস্তার পাশে উল্টে পড়ে। ধীরগতিতে গাড়িটি চলছিল বলে কেউ তেমন গুরুতর আঘাত পায়নি। গাড়ি থেকে নেমে সামান্য একটু এগোতেই দেখি একটি ভাঙা পুল, কিন্তু ভাঙা পুল সম্পর্কে রাস্তায় কোনোরূপ সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বা প্রতিবন্ধক নেই। নেই কোনো বিকল্প রাস্তার দিকনির্দেশনাও। অর্থাৎ একটু এগোলেই গাড়িটি অনেক নিচে পড়ে যেত এবং আমাদের হতো নির্ঘাৎ মৃত্যু। আর এর কারণ হতো ঠিকাদার ও সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে দায়িত্বহীনতা। কিন্তু অনেকটা অলৌকিকভাবেই যেন আমরা বেঁচে গেলাম।

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দুর্ঘটনার পরপরই এলাকার মাস্তানরা হাজির। তাদের উদ্দেশ্য গাড়ি লুট করা। আমাদের ড্রাইভার জানাশোনা কিছু উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়। তবে গত এক দশকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে মাস্তানতন্ত্রের লাগামহীন বিস্তার ঘটেছে, তাতে এখন এমন দুর্ঘটনায় পড়লে হয়তো মাস্তানদের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া অসম্ভব হতো।

আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে বর্তমান বছরের প্রথম দিকে চন্দ্রার আগে ইপিজেডের কাছাকাছি। তাও ছিল রাতের বেলা। বগুড়া আরডিএ থেকে ফিরছিলাম। তীব্র যানজটের কারণে টাঙ্গাইলের পর রাস্তায় আটকা পড়ি। যেখানে সন্ধ্যার মধ্যে ঢাকা পৌঁছার কথা, সেখানে মাঝ রাতের পর চন্দ্রা পার হই। রাস্তায় আলো ছিল না। হেডলাইটের আলোতে আমরা দেখতে পাই, সামনে আমাদের গতিপথে নিজেদের পিক-আপ দাঁড় করিয়ে পুলিশ বাস-ট্রাক থেকে চাঁদা তুলছে। আমাদের ড্রাইভার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় সেখান থেকে শুরু হওয়া নিচু ডিভাইডারের সঙ্গে মাইক্রোবাসটি জোরে ধাক্কা খায়। ব্যাপক ক্ষতি হলেও গাড়িটি বন্ধ হয়ে যায়নি এবং ড্রাইভার পাশে নিয়ে বাহনটি দাঁড় করায়।

আশপাশের দুয়েকজন এগিয়ে আসে সাহায্য করার জন্য। পুলিশও ছুটে আসে, তবে সহায়তার জন্য নয়, হুমকি-ধমকি দিয়ে কিছু আদায়ের জন্য। পুলিশকে বিরত রাখতে এক পর্যায়ে আমাকে দৃঢ়ভাবে তাদের বলতে হলো গায়ে পড়ে ঝগড়া না লাগানোর জন্য। প্রসঙ্গত অন্ধকার রাস্তা এবং পুলিশের গাড়ির অবস্থানের কারণেই হঠাৎ করে শুরু হওয়া নিচু ডিভাইডারটি দেখা যাচ্ছিল না। এ ছাড়াও ডিভাইডারের গায়ে কোনো রিফ্লেক্টর বা উজ্জ্বল রঙ লাগানো ছিল না, যা রিফ্লেক্টরের কাজ করতে পারত। আবারও কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এবং অপকর্মের কারণেই আমাদের দুর্ঘটনা।

দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থানের কারণে আমি সেখানেও একাধিক দুর্ঘটনার কবলে পড়ি, যার একটির পরিণতি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। সে ১৯৮৩ সালের কথা। আমি তখন সিয়েটল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আমার সাবেক ছাত্র এক সৌদি যুবরাজ আমার পরিবারকে বনভোজনে যাওয়ার আমন্ত্রণ করে। আমাদের তিন সন্তানকে আত্মীয়ের বাসায় রেখে আমি এবং আমার স্ত্রী এক রোববারে যুবরাজের সফরসঙ্গী হই। যুবরাজের গাড়িটি ছিল সবার আগে, এরপর বনভোজনের উপকরণ নিয়ে একটি বড় ভ্যান এবং তারপর আমাদের গাড়ি। আমি নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিলাম।

আমাদের গন্তব্যস্থল ছিল মাউন্ট রেইনিয়ার। দিনটি ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তায় ওপরে উঠছিলাম। রাস্তায় ধুলা উড়ছিল। সামনে বেশিদূর দেখা যাচ্ছিল না। আমার স্ত্রী সামনের সিটে আমার পাশে বসে ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ করে একটি বড় পিক-আপ ভ্যান আমাদের সামনে এসে গেল এবং চোখের নিমিষেই সামনাসামনি সংঘর্ষ।

সংঘর্ষের পর হুঁশ হারিয়ে ফেলি এবং কী হয়েছে জানি না। হুঁশ হওয়ার পর বুঝতে পারি আমি শোয়া অবস্থায় এবং আমার কাঁধে ব্রেস লাগানো। আমার পাশে এক মেডিক বসা। আমি জিজ্ঞেস করি : আমি কোথায়? আমার স্ত্রী কই? মেডিক আমাকে জানান, আমি এবং আমার স্ত্রী হেলিকপ্টারে এবং আমাদের সিয়েটলস্থ ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের হার্বারভিউ মেডিকেল সেন্টারে, যা একটি আধুনিক ট্রমা সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মেডিক আমাকে বারবার আশ্বস্ত করেন, আমার স্ত্রী ভালো আছে।

হাসপাতালে নেওয়ার পর আমাদের উভয়কেই সরাসরি জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর আমাদের ভিন্ন ভিন্ন ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। পরে আমি জানতে পারি, সামনাসামনি সংঘর্ষের ধাক্কায় আমার স্ত্রীর মাথা গিয়ে গাড়ির ডেসবোর্ডে খাক্কা খায় এবং সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আর সংঘর্ষের ধাক্কায় গাড়ির স্টিয়ারিং এসে আমার বুকে সজোরে ধাক্কা দেয় এবং আমার পাঁজরের কয়েকটি হাড় ভেঙে যায়। আমার মাথা গিয়ে গাড়ির সামনের কাচে জোরে আঘাত করে, কাচ ভেঙে যায় এবং আমিও গুরুতরভাবে আহত হই। ডাক্তারের আশঙ্কা ছিল, পাঁজরের ভাঙা হাড় আমার ফুসফুসে হয়তো ছিদ্র করে ফেলেছে। কিন্তু সৌভাগ্যবশত এমন কিছু ঘটেনি।

দুর্ঘটনার পর থেকেই আমার স্ত্রী কোমায় নিপতিত হয়। সর্বাধুনিক চিকিৎসা সত্ত্বেও কয়েকদিন পর তার একটি ভয়ানক রেসপাইরেটরি এরেস্ট হয় এবং তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমের বা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু সে অবস্থা থেকে সে আর ফিরে আসেনি। সপ্তাহখানেক মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত সে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেয়।

সড়ক দুর্ঘটনা এবং ১৩ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে আমার স্ত্রীর অকালমৃত্যু আমার এবং আমার সন্তানদের জীবন সম্পূর্ণভাবে ওলটপালট করে দেয়। আমাদের তিন সন্তানের বয়স ছিল তখন যথাক্রমে এগারো, পাঁচ ও তিন। বিদেশের মাটিতে তাদের নিয়ে আমাকে তখন যাপন করতে হয় এক দুঃসহ জীবন। আমার মনে আছে, পাঁচ বছর বয়সী মাহফুজ দোলনায় চড়ে বলত তাকে জোরে ধাক্কা দেওয়ার জন্য যাতে সে দূর আকাশে মায়ের কাছে যেতে পারে। ছোট মেয়ে শাহিরা তো খাওয়া-দাওয়া ছেড়েই দিয়েছিল। অল্প বয়সে মা হারানোর কারণে আমার সন্তানরা অতি সহজেই মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারত। কিন্তু সৌভাগ্যবশত তা ঘটেনি এবং এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমার দ্বিতীয় স্ত্রী তাজিমার, যার স্নেহ ও মমত্বে তারা বড় হয়েছে। আমার সন্তানদের কাছে, সে-ই তাদের একমাত্র মা। তারা এমআইটি, স্টানফোর্ড, কলাম্বিয়া ও কেম্ব্রিজের মতো পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছে। তাই পরিবার হিসেবে আমরা অনেকটা ভাগ্যবান, যদিও আমরা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছি দুর্ঘটনায় মৃতের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের যাতনা।

দুর্ঘটনা এবং আমার গায়ে লাগা মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ_ বুকে সরাসরি স্টিয়ারিংয়ের প্রবল ধাক্কা দেওয়ার পর যৌক্তিকভাবে আমারই মরার কথা ছিল_ আমার জীবনকেও সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দেয়। আমার জীবনের অগ্রাধিকার বদলে যায়। মনে হতে থাকে, আমি যেন ‘ধার করা’ জীবনযাপন করছি। কোনো বৃহত্তর উদ্দেশ্যে যেন আমি অলৌকিকভাবে বেঁচে আছি। ফলে ১৯৯১ সালে দীর্ঘ ২১ বছরের প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুল প্রফেসরের স্থায়ী চাকরি, অনেক বৈষয়িক সম্পদ ফেলে রেখে কয়েকটি মাত্র সুটকেস হাতে করে সপরিবারে বাংলাদেশে পাড়ি জমাই।

আমেরিকায় দুর্ঘটনার পর আমরা শুধু সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে দ্রুত নামকরা হাসপাতালে যাওয়ার এবং সর্বাধুনিক চিকিৎসারই সুযোগ পাইনি, পুলিশের পক্ষ থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত ও ম্যানস্লটারের (manslaughter) একটি মামলাও দায়ের করা হয়। সর্বোপরি ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে একটি দেওয়ানি মামলাও রুজু করা হয় এবং তারা বীমা কোম্পানি থেকে ক্ষতিপূরণও লাভ করে।

পশ্চিমা দেশগুলোতে যানবাহনের জন্য দু’ধরনের বীমা করা যায়। প্রথমটি হলো, সার্বিক বা ‘কম্প্রি্রহেনসিভ’ বীমা, যার মাধ্যমে দুর্ঘটনার ফলে দোষী পক্ষের বীমা কোম্পানি দোষীর নিজের বাহনের ক্ষয়ক্ষতি, অন্যের বাহনের ক্ষয়ক্ষতি এবং তৃতীয় পক্ষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষয়ক্ষতির (মা-বাবার আহত-নিহতের কারণে সন্তানের ক্ষয়ক্ষতি, স্বামী কিংবা স্ত্রীর হতাহতের) জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। দ্বিতীয়টি হলো, শুধু ‘লায়াবিলিটি’ বা তৃতীয় পক্ষ বীমা। এ ধরনের বীমার অধীনে দোষী পক্ষের বীমা কোম্পানি অন্যান্য পক্ষকেই শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকে। লায়াবিলিটি বীমা অপেক্ষাকৃত সস্তা এবং সব গাড়িচালকের জন্য এ ধরনের বীমা ক্রয় বাধ্যতামূলক। উল্লেখ্য, যার ড্রাইভিং রেকর্ড যত ভালো, অর্থাৎ যে গাড়ি চালাতে গিয়ে যত কম দোষ করেছে, তার বীমার প্রিমিয়াম তত কম। আমাদের দেশেও এ ধরনের বীমার ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু সেগুলো নামকা ওয়াস্তে। এ ছাড়াও দুর্নীতির কারণে বীমা কোম্পানিগুলো থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা প্রায় অসম্ভব।

পরিশেষে ওপরের আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট, আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অতি উচ্চ হার কমানোর জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টদের অনেক কিছু করার রয়েছে। তাদের সড়কের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, ট্রাফিক সাইন স্থাপন, ট্রাফিক আইন যুগোপযোগীকরণ, আইনের পরিপূর্ণ প্রয়োগ, চালকের যথাযথ প্রশিক্ষণ ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়াও দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের, এমনকি অযোগ্য চালক নিয়োগের জন্য মালিকদের কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। উপরন্তু দুর্ঘটনায় যারা আহত কিংবা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তাদের ক্ষতিপূরণের এবং অন্যান্য সহযোগিতারও ব্যবস্থা করতে হবে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন_ সুশাসনের জন্য নাগরিক

সূত্র: সমকাল, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s