নির্বাচন কমিশনের সংস্কার প্রস্তাবে অতিরিক্ত কিছু সুপারিশ

লেখক: ড. বদিউল আলম মজুমদার  |  সোম, ১০ অক্টোবর ২০১১, ২৫ আশ্বিন ১৪১৮

নির্বাচন কমিশন দু’টি নতুন আইনের এবং কিছু বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। এগুলো হলো: (১) প্রস্তাবিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ পদ্ধতি) আইন; (২) প্রস্তাবিত নির্বাচনী প্রচারণা ব্যয় (জনতহবিল) আইন; (৩) প্রস্তাবিত নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ বিধিমালা। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রচলনও কমিশনের প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত।

কমিশনের উপরিউক্ত প্রস্তাবের সঙ্গে আমরা কতগুলো নতুন বিষয় সংযোজন করতে চাই: (১) গত জাতীয় নির্বাচনে ‘না ভোটে’র বিধান কার্যকর থাকলেও, নবনির্বাচিত সংসদ আরপিও থেকে এটি বাদ দেয়। আমরা না ভোটের বিধান আরপিও’তে সংযোজিত করার প্রস্তাব করছি। (২) গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংশোধিত আরপিও’র বিধানানুযায়ী, নিবন্ধিত দলের তৃণমূলের কমিটিগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি প্যানেল থেকে দল কর্তৃক মনোনয়নের বিধান ছিল। কিন্তু নবম সংসদ এটি রহিত করে প্যানেলটি শুধু বিবেচনায় নেয়ার বিধান আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত করে। এর মাধ্যমে দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রভাবিত করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়, যদিও এ ব্যাপারে তাদের পক্ষ থেকে কোনরূপ উচ্চবাচ্য নেই। দলের সদস্যদের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা আরপিও’র 90B(1)(b)(iv)-এর সংশোধন করে এ ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার সুপারিশ করছি। (৩) আমাদের উচ্চ আদালত ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের আদালত প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকারকে বাক্ স্বাধীনতা তথা মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়াও পিইউসিএল ও অন্যান্য বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলার রায়ে [(২০০৩) ৪ এসসিসি] আদালত স্বীকৃতি দিয়েছে যে, ভোটারদের এ অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না, নিরপেক্ষও না। তবে তথ্য দিলেই হবে না, তথ্য সঠিক ও বিভ্রান্তিমুক্ত হতে হবে। তাই নির্বাচন কমিশনের চুলচেরাভাবে তথ্যের সঠিকতা যাচাই করার আমরা প্রস্তাব করছি। আর সত্-যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত না হয়ে আসলে নির্বাচন অর্থবহও হবে না।  (৪) সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্য হলো এগুলো ভোটারদের কাছে সময়মতো পৌঁছে দেয়া, যাতে তারা জেনে-শুনে-বুঝে সত্ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা প্রকাশের দিন থেকে নির্বাচনের দিনের সময়ের ব্যবধান মাত্র সপ্তাহ দুই। এ সীমিত সময়ের মধ্যে প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর তথ্য সংকলিত করে ভোটারদের কাছে যথাসময়ে পৌঁছে দেয়া প্রায় অসম্ভব কাজ,  কিন্তু কাজটি নির্ভুল ও আরও ভালভাবে করার জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমরা মনোনয়নপত্র, হলফনামা, নির্বাচনের সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাবসহ সংশ্লিষ্ট ডকুমেন্টগুলো ইলেকট্রনিক্যালি (অন-লাইনে) জমা দেয়ার বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করছি। আরও সুপারিশ করছি ‘কাউন্টার এফিডেভিট’ বা বিরুদ্ধ হলফনামা প্রদানের বিধানটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করার। প্রসঙ্গত, বিরুদ্ধ হলফনামা প্রদানের বিধানটি নির্বাচন কমিশনের ১৭/১১/০৮ তারিখে জারি করা পরিপত্র- ৮ দ্বারা গত সংসদ নির্বাচনে কার্যকর করা হয়।  (৫) জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪ সংশোধন করে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আরপিও’র ১২ ধারার অন্তর্ভুক্ত অনুরূপ হলফনামা ও আয়কর রিটার্নের কপি জমা দেয়ার বাধ্য-বাধকতা সৃষ্টি করা আবশ্যক। হলফনামার ছকটিও নতুন করে তৈরির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেও আমরা মনে করি। (৬) আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ানো আবশ্যক। আরপিও’র ১২ ধারায় অন্তর্ভুক্ত কিছু সীমাবদ্ধতা— যেমন ইস্তফাদানকারী বা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ইস্তফাদানের বা অবসরের পর তিনবছর অপেক্ষা, মনোনয়ন লাভের জন্য দলে যোগদানের পর তিনবছর অপেক্ষা ইত্যাদি— মানসম্মত প্রার্থী প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে বলে আমাদের ধারণা। আর এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন দখল করে নিয়েছে। তাই এ সকল বাধা-নিষেধের ক্ষেত্রে নমনীয়তা প্রদর্শনের বিষয়টি আজ গভীরভাবে
িবেচনা করা দরকার। এছাড়াও এসব বাধা-নিষেধ নতুন ও ছোট দলগুলোর বিকাশের ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর মনোনয়ন লাভের জন্য তিনবছর অপেক্ষা করার বিধান অব্যাহত থাকলে দলের পক্ষ থেকে তাদের সদস্যের তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ ও নিয়মিত আপডেট করতে হবে। (৭) বর্তমানে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দায়িত্বও কমিশনের ওপর অর্পণ করার সুপারিশ করছি। এ জন্য অবশ্য সংবিধান সংশোধন করতে হবে। (৮) রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব (অনুচ্ছেদ-১১৯)। এর জন্য কমিশনকে স্বাধীনতা দিতে হবে, বিশেষত আর্থিক স্বাধীনতা, যাতে প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে না হয়। এজন্য কমিশনের ব্যয়কে ‘সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয়’ হিসেবে গণ্য করা আবশ্যক। তবে এ জন্য সংবিধানের ৮৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হবে, যার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আবশ্যক :প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরি, কমিশনে যথাযথ ব্যক্তির নিয়োগ প্রদান এবং কমিশনকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হলেও সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত নয়। এর জন্য আরও প্রয়োজন আমাদের বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন। আর তা বহুলাংশে নির্ভর করবে আমাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার উপর। তবে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক দল গড়ে না উঠলে এমন সদিচ্ছার আশা দূরাশাই থেকে যাবে।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে বড় বাধা হলো, দলীয়করণের কারণে প্রশাসনের নিরপেক্ষতাহীনতা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষেত্র বিশেষে পক্ষপাতিত্ব, নির্বাচনে টাকার খেলা ও পেশিশক্তির প্রভাব, প্রার্থীদের ছলে-বলে-কলে-কৌশলে নির্বাচনে জেতার মানসিকতা। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এসবগুলো সমস্যার সমাধান করা সম্ভবপর নয়। অতীতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দলীয় সরকারের রেখে যাওয়া দলীয় অনুগতদের দিয়ে তৈরি ‘সাজানো বাগান’ ভেঙ্গে দিত এবং নতুন পদায়িত কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষভাবে কাজ করার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করত। কিন্তু একটি জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার গুরু দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো ‘পাহারাদারের’ ভূমিকা পালন করা কমিশনের পক্ষে অসম্ভব। এটি কমিশনের দায়িত্বও নয়। অর্থাত্ সংশ্লিষ্ট সকলের সহায়তা ছাড়া কমিশনের পক্ষে এককভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সর্বোপরি,তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা ছাড়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে না।

তবে এসব সমস্যার অধিকাংশের সমাধানই রাজনৈতিক দলের হাতে। তারাই টাকা ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে। টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন বাণিজ্যে লিপ্ত হয়, দল কেনা-বেচা করে, ভোট কেনে, কর্মকর্তাদের উতকোচ প্রদান করে ইত্যাদি। রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরাই পেশিশক্তি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে হুমকি দেয়, ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসা থেকে বিরত করে, নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। এক কথায়, তারাই অধিকাংশ নির্বাচনী অপরাধের উত্স। এছাড়াও তারাই প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্রে লিপ্ত করে। তারা নিজেরা ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনী আইন (যেমন দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অঙ্গ সংগঠন ও বিদেশী শাখা বিলুপ্তি ইত্যাদি) অমান্য করে। তাই রাজনৈতিক দলগুলো সদাচরণ করতে বদ্ধপরিকর হলে নির্বাচনে নিরপেক্ষতার সমস্যা বহুলাংশে দূরীভূত হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশনকে আর তাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ‘ক্যাট এণ্ড মাউস’ খেলায় লিপ্ত হতে হবে না। তাই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের ‘বল’ আজ বহুলাংশে রাজনৈতিক দলের কোর্টে।

পরিশেষে, একথা সুস্পষ্ট যে, আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথের আজ সর্বাধিক বড় চ্যালেঞ্জ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পথ কন্টকমুক্ত করা। কারণ নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা বদলের পথ রুদ্ধ হলে আমরা চরম সঙ্কটের দিকে ধাবিত হতে পারি, যা কারোরই কাম্য নয়। কতগুলো সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উদ্যোগটির জন্য কমিশনকে ধন্যবাদ, যদিও আমরা মনে করি যে, কমিশনের প্রস্তাবে কিছু সংযোজন-বিয়োজন প্রয়োজন। আমরা আশা করি যে, বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো তাদের করণীয় করার জন্য এগিয়ে আসবে। বিশেষত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শনের লক্ষ্যে অনুসন্ধান কমিটি গঠন ও সংস্কার প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করবে এবং এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

[লেখক:সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক]

সূ্ত্র: ইত্তেফাক, ১০ অক্টোবর ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s