জেলা প্রশাসক নিয়োগ:কেন এই স্বেচ্ছাচারিতামূলক সিদ্ধান্ত?

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ১৯-১২-২০১১

গত ১৫ ডিসেম্বর রাতে, বিজয় দিবসের প্রাক্কালে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৬১টি জেলায় দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে জেলা প্রশাসক নিয়োগ প্রদান করেছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনের নেতা। কেউ কেউ এই নিয়োগকে বিজয় দিবসের উপহার বলে আখ্যায়িত করেছেন। নিঃসন্দেহে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য এটি একটি উপহার, কিন্তু আমাদের আশঙ্কা যে জাতির জন্য এটি একটি দুঃসংবাদ।

জেলা পরিষদ আইন ২০০০-এর ৮২(১) ধারার অধীনে জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। আইনের এই বিধানকে অত্যন্ত ‘গর্হিত’ বলে আখ্যায়িত করে আমাদের বর্তমান মাননীয় অর্থমন্ত্রী তাঁর ২০০২ সালের জেলায় জেলায় সরকার গ্রন্থে লেখেন: ‘সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান না করেই নিজেদের মনোনীত ব্যক্তিকে দিয়ে জেলা সরকার গঠন করতে পারে। এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা বা (সম্ভবত দলীয় প্রীতি) কোনো সুযোগ একটি গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানে থাকা নিতান্তই লজ্জা ও ক্ষোভের বিষয়।’

দুর্ভাগ্যবশত প্রশাসক নিয়োগের এই সিদ্ধান্ত শুধু গর্হিত ও স্বেচ্ছাচারিতামূলকই নয়, এটি আমাদের সংবিধানের নগ্ন লঙ্ঘনও। একই সঙ্গে এটি আমাদের উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তেরও পরিপন্থী। এ ছাড়া এর মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে একটি চরম দ্বন্দ্বাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে বলে আমাদের আশঙ্কা। আর যেখানে দ্বন্দ্ব ও হানাহানি, সেখানে ইতিবাচক ও গঠনমূলক কিছু হয় না।

আমাদের সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ অর্থাৎ সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুসারে নির্বাচিত জেলা পরিষদ জেলায়, নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ উপজেলায়, নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ ইউনিয়নে, নির্বাচিত সিটি করপোরেশন সিটিতে এবং নির্বাচিত পৌর পরিষদ পৌরসভায় শাসনকার্য পরিচালনা করবে। অনির্বাচিত ব্যক্তি বা প্রশাসকের কোনোরূপ ভূমিকা পালনের সুযোগ সংবিধানে রাখা হয়নি। তাই জেলা পরিষদ বা অন্য কোনো স্থানীয় সরকার আইনে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ করার বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আর এই অসাংবিধানিক বিধানের অধীনে প্রশাসক নিয়োগ প্রদানও অসাংবিধানিক হতে বাধ্য।

এ ছাড়া অনেকেরই স্মরণ আছে যে ১৯৯১ সালে উপজেলা পদ্ধতি বাতিলের পর যে মামলা হয় তার রায়ে [কুদরত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ, ৪৪ ডিএলআর (এডি)(১৯৯২)] বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক সর্বসম্মত রায়ে বলেন, ‘সংবিধানের বিশেষ প্রতিনিধিত্ব সংক্রান্ত ৯ অনুচ্ছেদের আলোকে নির্বাচনের মাধ্যমে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে ৫৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ যথাশীঘ্রই নিতে হবে। তবে কোনো অবস্থায়ই যেন এ সময় এখন থেকে ছয় মাসের বেশি না হয়।’ ১৯৯২ সালে দেওয়া দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালতের রায় আজও বাস্তবায়িত হয়নি এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে এ রায় উপেক্ষা করেই। এর ফলে সরকার আদালত অবমাননা করেছে কি না এ নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রসংগত, সংবিধান সংশোধন ছাড়া জেলা পরিষদের নির্বাচন এড়ানো অসম্ভব। কারণ সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে জেলাকে—যদিও অন্য স্তরগুলোকে (যেমন, উপজেলাকে) আইনের মাধ্যমে—‘প্রশাসনিক একাংশ’ ঘোষণা করা হয়েছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশ বা স্তরে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার থাকা বাধ্যতামূলক। তাই যদিও আইনের মাধ্যমে প্রশাসনিক একাংশ ঘোষণা না করে অন্যান্য স্তরে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গঠন এড়ানো যায়, জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন ছাড়া তা করা অসম্ভব। তা সত্ত্বেও স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই, বর্তমান সরকারসহ, জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি, যা সংবিধানের একটি নগ্ন লঙ্ঘন।

বিদ্যমান আইনে জেলা পরিষদের জন্য পরোক্ষ নির্বাচনের বিধান রয়েছে। আইনের ১৭(১) ধারা অনুযায়ী, ‘প্রত্যেক জেলার অন্তর্ভুক্ত সিটি কর্পোরেশন, যদি থাকে, এর মেয়র ও কমিশনারগণ, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার চেয়ারম্যান ও কমিশনারগণ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ সমন্বয়ে উক্ত জেলার পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হইবে।’ নির্বাচন কমিশন এসব নির্বাচকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য একটি ভোটার তালিকা তৈরি করবে। আর আইনের ৪ ধারা মোতাবেক এসব ভোটার তাঁদের ভোটের মাধ্যমে জেলা পরিষদের জন্য একজন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের জন্য পাঁচজন মহিলা সদস্য নির্বাচিত করবেন। বলাবাহুল্য, গত বছর অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচন এবং এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাচকমণ্ডলী গঠন করে জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আইনের বিধানানুযায়ী, জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য গড়ে হাজার দেড়েক নির্বাচক নিয়ে ভোটার তালিকা তৈরি হওয়ার কথা। ফলে এ নির্বাচনটি সম্পন্ন করা সরকারের পক্ষে অত্যন্ত সহজ হতো। তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার স্বার্থে কেন সরকার এই সহজ উদ্যোগটি গ্রহণ করল না তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। তাহলে সরকারের কি কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে?

নতুন জারি করা প্রজ্ঞাপনটি এবং জেলা পরিষদ আইন ২০০০ একত্রে দেখলে কোনো বিশ্লেষকের মনেই সন্দেহ সৃষ্টি না হয়ে পারে না। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নবনিযুক্ত প্রশাসকদের নিয়োগের মেয়াদ এবং জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সময়সীমা নির্দিষ্ট করা নেই। এমনকি আইনের প্রশাসক সম্পর্কিত ৮২ ধারায় প্রশাসকের মেয়াদ এবং নিয়োগের কত দিনের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে তাও বলা নেই। তাই দলীয় বিবেচনায় ও ফায়দা প্রদানের লক্ষ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকেরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘জেলা পরিষদের কার্যাবলী সম্পাদন’ করে যেতে পারেন। নিঃসন্দেহে এ ধরনের দলীয়করণ আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে না। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের জন্যও এটি কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না বলে আমাদের আশঙ্কা।

জেলা পরিষদের মতো একটি বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের মাধ্যমে একটি অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্তও স্থাপিত হলো। এই নিয়োগ জায়েজ হয়ে গেলে ভবিষ্যতের কোনো সরকার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর নির্বাচন না করে যদি প্রত্যেকটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে দেয়, তাহলে সে সরকারকে কে রুখবে!

জেলা পরিষদকে দলীয়করণের এই সিদ্ধান্তে ক্ষমতাসীন দলও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রশাসক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে বঞ্চিত ব্যক্তিদের দ্বন্দ্ব সারা দেশে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে জেলা পরিষদগুলো দলবাজির আখড়ায় পরিণত হতে পারে, যা সরকারের জন্য ভবিষ্যতে বদনামের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে দলীয় প্রশাসকের মাধ্যমে আগামী নির্বাচন প্রভাবিত করার সম্ভাব্য প্রচেষ্টা বুমেরাং হতে পারে। উপরন্তু বিদ্যমান আইনের ৩০ ধারায় সাংসদদের জেলা পরিষদের উপদেষ্টা করার বিধান রয়েছে। তাই প্রশাসক নিয়োগের কারণে উপজেলার মতো জেলা পর্যায়েও একটি ত্রিমুখী দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে, যার পরিণতি অমঙ্গলকর হতে বাধ্য।

এ প্রসঙ্গে লক্ষণীয়, সরকার অনির্বাচিত ব্যক্তিদের শাসন বিলুপ্ত করার লক্ষ্যে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গত জুলাই মাসে—সুপ্রিম কোর্টের আরও দুই টার্মের জন্য এটি রাখার পর্যবেক্ষণ উপেক্ষা করে—তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। কিন্তু বছরের শেষে এসে সরকার নিজেই নির্বাচনের পরিবর্তে জেলা পরিষদে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে, যার ফলে সরকার তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনগণের সমর্থনই সরকারের ক্ষমতার মূল উৎস।

পরিশেষে, এটি সুস্পষ্ট যে, দলীয় ব্যক্তিদের জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ করে সরকার একটি মস্ত বড় ভুল করল, যার নেতিবাচক প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ব্যক্তিবিশেষের জন্য সুসংবাদ বহন করে আনলেও, এটি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সুফল বয়ে আনবে না, ক্ষমতাসীন দলের জন্যও না। তাই আমরা সরকারকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করছি। একই সঙ্গে আইনটি সংশোধন ও আধুনিকায়নেরও প্রস্তাব করছি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

সূত্র: প্রথম আলো, ১৯ ডিসেম্বর ২০১১

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s