বর্তমান সদস্যদের পুনর্নিয়োগের বৈধতা

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২৪-০১-২০১২

নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক এড়াতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সমপ্রতি ২৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করেছেন। গণমাধ্যমের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সংলাপে অংশগ্রহণকারী কিছু দল বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার শামসুল হুদাকে পুনর্নিয়োগ প্রদানের সুপারিশ করেছে। আবার কিছু দল পুরো কমিশনকেই রাখার পক্ষে মত দিয়েছে।

অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত পাঁচ বছরে বর্তমান কমিশন অত্যন্ত প্রশংসনীয়ভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। কিছু ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও কমিশন সফলতা ও নিরপেক্ষতার একটি উঁচু মানদণ্ড স্থাপন এবং দেশের বিরাট জনগোষ্ঠীর সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। বস্তুত, আমি মনে করি যে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান কমিশন থেকে অধিক করিৎকর্মা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন পাওয়া হবে প্রায় অসম্ভব। তবে প্রস্তাব দুটি কিছু গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সংলাপে প্রদত্ত পুনর্নিয়োগের প্রস্তাবের পর এ বিষয়ে ব্যাপক গুজব শুরু হয়েছে। গুজবের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। একদল বিশেষজ্ঞ দাবি করছেন যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য দুজন নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন ও ব্রিগেডিয়ার (অব.) শাখাওয়াত হোসেনকে পুনর্নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো সাংবিধানিক বাধা নেই। পক্ষান্তরে অন্য একদল বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে এমন সিদ্ধান্ত হবে অর্বাচীন ও সংবিধানের লঙ্ঘন।

আমাদের সংবিধানের ১১৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘এই সংবিধানের বিধানাবলি-সাপেক্ষে কোনো নির্বাচন কমিশনারের পদের মেয়াদ তাঁহার কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরকাল হইবে এবং (ক) প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এমন কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগলাভের যোগ্য হইবেন না; (খ) অন্য কোনো নির্বাচন কমিশনার অনুরূপ পদে কর্মাবসানের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনাররূপে নিয়োগলাভের যোগ্য হইবেন, তবে অন্য কোনোভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগলাভের যোগ্য হইবেন না।’

আপাতত দৃষ্টিতে মনে হয় যে একজন নির্বাচন কমিশনারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ প্রদান ব্যতীত কমিশনের অন্য সদস্যদের পুনর্নিয়োগ হবে অসাংবিধানিক। কারণ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে যিনি একবার নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন, তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের অযোগ্য। তেমনিভাবে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে যিনি/যাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত নন, তিনি/তাঁরাও প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের অযোগ্য।

কিন্তু প্রজাতন্ত্রের কর্মের সংজ্ঞা কী? সংবিধানের ১৫২ অনুযায়ী, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ অর্থ ‘অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার-সংক্রান্ত যেকোনো কর্ম, চাকরি বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলিয়া ঘোষিত হইতে পারে, এই রূপ অন্য কোনো কর্ম।’ তবে সংবিধানের ১৪৭(৩)(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, নির্বাচন কমিশনার ও সরকারি কর্মকমিশনের সদস্যরা লাভজনক পদ বা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তি বা সরকারি কর্মচারী বলে গণ্য হবেন না। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সংযুক্ত তহবিল থেকে বেতন-ভাতা পাওয়া সত্ত্বেও, সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, নির্বাচন কমিশনার ও সরকারি কর্মকমিশনের সদস্যরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত নন। ফলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পুনর্নিয়োগের ব্যাপারে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই বলেই মনে হয়, যদিও সংবিধানের ১১৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কমিশনারদের মধ্যে যিনি/যাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত নন, তাঁর/তাঁদের পুনর্নিয়োগের ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। তবে এটিই শেষ কথা নয়।

বিচারপতি এম এ আজিজের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলায় [অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস ও অন্যান্য বনাম বিচারপতি এম এ আজিজ ও অন্যান্য, ৬০ ডিএলআর (২০০৮)] বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি এস এম জিয়াউল করিম সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ সংবিধানের ১৪৭(৩)(৪) অনুচ্ছেদের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, যাঁরা রাষ্ট্রের সংযুক্ত তহবিল থেকে পারিশ্রমিক পান, তাঁরা অবশ্যই প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত।

রায়ে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম—পারিশ্রমিক—সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদের ৪ উপ-অনুচ্ছেদে বর্ণিত পদ অধিকারী ব্যক্তিরা নির্বাহী সরকারের অন্তর্গত নহেন। তবে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত এবং তাঁহারা ওই রূপ কর্মে নিয়োজিত রহিয়াছেন বিধায় রাষ্ট্রের সংযুক্ত তহবিল (Consolidated Fund) হইতে তাঁহাদের কর্মের বিনিময়ে পারিশ্রমিক (emoluments) পাইয়া থাকেন। যেহেতু প্রজাতন্ত্রের জন্য তাঁহারা নিজ নিজ অবস্থান হইতে কর্ম সমপাদন করেন, সেহেতু তাঁহারা সংযুক্ত তহবিল হইতে আইন দ্বারা নির্দিষ্ট হারে পারিশ্রমিক পাইয়া থাকেন। তাঁহারা প্রজাতন্ত্রের জন্য কর্ম সমপাদন না করিলে সংযুক্ত তহবিল হইতে কোনো পারিশ্রমিক পাইবার অধিকারী হইতেন না।’

অর্থাৎ সংবিধানের ১৪৭(৩)(৪) অনুচ্ছেদের ব্যতিক্রমী বিধান সত্ত্বেও আদালতের মতে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনই তাঁদের জন্য প্রজাতন্ত্রের কর্ম। তাই একবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ প্রজাতন্ত্রের সকল পদে নিয়োগের অযোগ্য হবেন। তেমনিভাবে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে একবার দায়িত্ব পালনের পর কোনো ব্যক্তি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছাড়া নির্বাচন কমিশনারসহ প্রজাতন্ত্রের অন্য সকল পদে নিয়োগের অযোগ্য হবেন।

সংবিধানের মর্মার্থ বা মূলবাণী হলো যে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল ইসলামের ভাষায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন এমন ব্যক্তি পুনরায় প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ লাভের অযোগ্য হবেন এবং নির্বাচন কমিশনার ছিলেন এমন ব্যক্তি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছাড়া অন্য কোনোভাবে প্রজাতন্ত্রের নিয়োগে অযোগ্য হবেন [মাহমুদুল ইসলাম, কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ, দ্বিতীয় সংস্করণ, (মল্লিক ব্রাদার্স, ২০০৮), পৃ. ৬৮৮]। অর্থাৎ আমাদের সংবিধান প্রণেতারা একজন নির্বাচন কমিশনার ছাড়া—যাঁকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে—প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনারদের মেয়াদ এক টার্মের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন। এর কারণ হলো, কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ভবিষ্যতে পুনর্নিয়োগের আশায় যেন তাঁরা প্রলুব্ধ না হয়ে স্বাধীন ও নির্মোহভাবে কাজ করতে সক্ষম হন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য দুই কমিশনারকে পুনর্নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে অবশ্য সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে। অতীতের অনেকগুলো সংবিধান সংশোধনই রাষ্ট্রের পরিবর্তে ব্যক্তির স্বার্থে করা হয়েছে, যার পরিণতি অনেক ক্ষেত্রে সুখকর ছিল না। আমরা আবারও কি সেই পথে হাঁটব? তিনজন ব্যক্তির জন্য কি সংবিধান সংশোধন করব? শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের অনেকেই এমন প্রচেষ্টার সঙ্গে একমত হবেন না। এ ছাড়া সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পুনর্নিয়োগপ্রাপ্ত কমিশনের সদস্যরাও নতুন বিতর্কের মুখোমুখি হবেন, যা তাঁদের দায়িত্ব পালনে অহেতুক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বলে আমার বিশ্বাস।

পরিশেষে, উপরিউক্ত বিশ্লেষণ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য একজন নির্বাচন কমিশনারকে কমিশনে পুনর্নিয়োগ প্রদান হবে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যদিও একজন নির্বাচন কমিশনারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে। অতীতের বলিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণে তাঁদের পুনর্নিয়োগ দেওয়া গেলে আমি নিজেও খুশি হতাম, কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের সংবিধান মেনে চলতে এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত হতে হবে। তাই তাঁদের পুনর্নিয়োগের উদ্যোগ থেকে সরকারের বিরত থাকাই হবে বাঞ্ছনীয়। আর আমি যতটুকু জানি, কমিশনের বর্তমান সদস্যরাও তাঁদের পুনর্নিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী নন।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

সূত্র: প্রথম আলো, ২৪ জানুয়ারি ২০১২

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s