সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণের আস্থা অর্জনই বর্তমান কমিশনের সামনে প্রধান চ্যলেঞ্জ’ – গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২, সকাল ১০ টায়, জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে, সুজনের উদ্যোগে নতুন নির্বাচন কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সঞ্চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সুজন সহ-সভাপতি জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খান বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ড. কামাল হোসেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার জনাব ছহুল হোসাইন বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) সাখাওয়াত হোসেন, সুজন নির্বাহী সদস্য জনাব এস এম শাহজাহান ড. তোফায়েল আহমেদ, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, অধ্যাপক কামাল আতাউর রহমান, সংবাদিক মনির হায়দার প্রমূখ।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার তিনি তার বক্তব্যে এই প্রথমবারের মত অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন পুনগর্ঠনকে একটি ইতিবাচক দিক বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, কমিশনকে দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক এবং অন্যটি প্রক্রিয়াগত। কমিশনের সামনে সবথেকে বড় প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ হলো এর সংখ্যা। অতীতে কোনো কমিশনেই তিনজনের বেশি সদস্য ছিলেন না। তাই পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট বর্তমান কমিশনের ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকি হল অনেক বিষয়ে তাদের মধ্যে মতৈক্য পৌঁছা। কমিশনের সামনে আরও বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো কমিশনের ¯স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখা। কেননা আইন করে স্বাধীনতা দেয়া যায়, কিন্তু সে স্বাধীনতা  ‘assert’ বা প্রয়োগ করতে হয়। তিনি প্রবন্ধে বিগত নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে করা আইনি সংস্কার গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেন। বিগত নির্বাচন কমিশন অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও দূরূহ কাজ করে গিয়েছে, যার অন্যতম হল ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন, রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সংস্কার, প্রার্থীদের তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ, কমিশনের স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। এছাড়াও বিগত কমিশন একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে এবং এটি বাস্তবায়নের জন্য অর্থের সংস্থানও করে গিয়েছে। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও আমাদের কিছু   প্রস্তাব রয়েছে। তিনি বলেন, এসব প্রস্তুতি নতুন সুযোগের সৃষ্টি করেছে এবং পুনর্গঠিত কমিশনের কাজকে সহজ করে দিয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস। এসব অগ্রগতির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন কমিশনকে এখন সততা, নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। পরিশেষে তিনি সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণের আস্থা অর্জনই বর্তমান কমিশনের সামনে প্রধান চ্যলেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন।

নতুন নির্বাচন কমিশনকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের ব্যাপারেও তৎপর হতে হবে উল্লেখ করে ড. কামাল হোসেন বলেন, আইন প্রয়োগকারীরা যদি প্রভাবশালীদের বিপক্ষে আইন প্রয়োগ করতে দ্বিধাগ্রস্থ থাকে তবে সে দেশে আইন বলে কিছু থাকে না। তিনি আরো বলেন, রাজনীতিতে সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে হবে সুষ্ঠুভাবে আইন প্রয়োগ করে। তিনি জনগণের আমানত ভোটাধিকার রক্ষার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের বলে মন্তব্য করেন।

জনাব ছহুল হোসাইন বলেন, আমরা অন্তত নির্বাচনী সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছি। আমাদেরকে আরো শক্তভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। তবে তিনি বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, তাদেরকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আমাদের সকলের উচিৎ তাদেরকে সহযোগিতা করা। তিনি রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন বিষয়ে বলেন, এটা রাখা যাবে না এই মর্মে আইন হলেও সহযোগী সংগঠন নামে এখন তারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। তিনি বলেন, আইন মানার দায়িত্ব সকলের, এ সংস্কৃতি আমাদের সকলকে রপ্ত করতে হবে। জনাব এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে যারা অছেন তারা সবাই সৎ যোগ্য মানুষ। তিনি বর্তমান কমিশনকে তাদের কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অনুরোধ করেন। আর তা না হলে যেটুকু অর্জন হয়েছে তা নিঃশ্বেষ হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন। তিনি নির্বাচনী ব্যয়ের ব্যাপারে বলেন, এ ক্ষেত্রে আমরা তেমন কিছু করতে পারি নি। তবে তিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, এখন আর অগের মতো টাকা দিয়ে ভোটার কেনা যায় না, যার প্রকৃষ্ট উধাহরণ নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন। তিনি কাউন্টার এফিডেভিট সম্পর্কে বলেন, এটি আইনের মাধ্যমেই করতে হবে এমনটি নয়, আমরা কয়েকটি নির্বাচনে এর প্রয়োগ করেছি। তিনি তৃণমূলের সুপারিশের ভিত্তিতে দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে বলেন, আমরা মনোনয়নপত্রের সাথে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের দ্বারা মনোনয়ন সম্বলিত একটি সার্টিফিকেট প্রদানের সুপারিশ করেছি। পূর্বের নির্বাচন কমিশনকে এযাবৎকালের সবচেয়ে ভালো ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন উল্লেখ করে এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, তারা কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব রেখে গেছেন। আমরা আশা করবো বর্তমান নির্বাচন কমিশন সংস্কার প্রস্তাবসমূহ পাশ করানোর ব্যাপরে সরকারকে রাজি করাতে সক্ষম হবে। জনাব এ এস এম শাহজাহান বলেন, আমাদের দেশে সরকার আইন সাধারণত জনস্বার্থে ব্যবহার করে না, দলীয় এবং ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করে। ক্ষমতাসীনদের সাথে যাদের সম্পর্ক রয়েছে তারা নিজেদেরকে আইনের বাইরে মনে করে। তিনি আরো বলেন, ‌’Rule of Law’ এবং ‘Rule by Law’ এক কথা নয়। তিনি আরো বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে সকলের আস্থা অর্জন করতে হলে সাহসিকতা প্রদর্শন করতে হবে। ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা নির্বাচন কম
শনের একার দায়িত্ব নয়। এখানে রাজনৈতিক দলসহ সাধারণ জনগণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি নতুন কমিশনকে পূর্বের নির্বাচন কমিশনসহ এব্যাপারে অভিজ্ঞ নাগরিকদের পরামর্শ গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেন।

 

Advertisements