‘রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সংলাপ, সমঝোতা, সমাধান জরুরি’ – গোলটেবিল বৈঠকে বক্তাগণ

গত ২৮ মে ২০১২, সকাল ১০ টায়, জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে, সুজনে’র উদ্যোগে ‘চলমান রাজনৈতিক সংকটের উত্তরণ কোন পথে’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদের পরলোকগত আত্মার শান্তি কামনা করে দাড়িয়ে এক মিনিট নিরবদা পালন করা হয়। সহ-সভাপতি জনাব এম হাফিজ উদ্দিন খানের সঞ্চালনায় বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মুজমদার। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ড. কামাল হোসেন, এ এস এম শাহজাহান, অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহম্মেদ, অধ্যাপক মুনিরুজ্জামান মিয়া, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন, জনাব আব্দুল লতিফ মন্ডল, ড. হামিদা হোসেন, ড. শাহদীন মালিক, জনাব ইনাম আহমেদ চৌধুরী, জনাব রাশেদ খান মেনন এমপি, জনাব ফজলুল আজিম এমপি, সৈয়দ আব্দুল মান্নান, জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না, অধ্যাপক তারেক শামসুর রহমান, ড. পিয়াস করিম, জনাব হুমায়ূন কবির হিরু, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, রুহিন হোসেন প্রিন্স, এডভোকেট আহসানুল করিম চৌধুরী বাবুল, এডভোকেট রুহুল আমিন খান, অধ্যাপক কামাল আতাউর রহমান, সাংবাদিক মুনির হায়দার, আবুল হাসনাত প্রমূখ।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের রাজনৈতিক সঙ্কট দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এর জন্য প্রধান দুটি কারণ মূলত দায়ী। প্রথমত রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি তথা অসহযোগিতা, অসহিষ্ণুতা, অশ্রদ্ধা, ও আগ্রাসী আচরণ। দ্বিতীয়ত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে এবং গণতান্ত্রিক ব্যস্থাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর সংশোধনের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা হওয়া আবশ্যক। তবে শুধু সমঝোতা হলেই হবে না, সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান হতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন হবে একটি সর্বব্যাপী বলিষ্ঠ সংস্কার কর্মসূচী। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপের মাধ্যমেই এ ধরনের ‘হোম-গ্রোউন’ সমাধান সম্ভব। তাই পারসপরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ১৯৯০-এর তিন জোটের রূপরেখার মতো তিনি একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রণীত হওয়া জরুরি বলে উল্লেখ করেন, যদিও সংসদীয় পদ্ধতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া তিন জোটের রূপরেখার আর কোনটিই বাস-বায়িত হয়নি। এজন্য অবশ্য প্রয়োজন হবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর জনস্বার্থ সমুন্নত রাখার প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়।

ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছি। জাতি দল, মত নির্বিশেষে সকলে এ সঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে চায়। সংবিধানে জনগণকে সকল ক্ষমতার মালিক বলা হলেও জনগণের নিয়ন্ত্রণে রাজনীতি থাকে না। জনগণ একদিনের জন্য ক্ষমতার অধিকারী হয়। তিনি আরো বলেন, আমাদের রাজনীতিতে মনোনয়ন বাণিজ্য ঢুকে পড়েছে। মনোনয়ন বাণিজ্য ও দলীয়করণ বন্ধ করতে হবে যা অত্যন- ক্ষতিকর।

জনাব এএসএম শাহাজান বলেন, জাতীয় স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে বর্তমানে সংলাপের বিকল্প নেই। এ সংলাপে নাগরিক ও গণমাধ্যমকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। জনাব এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে রাজনীতি কেন কোন কিছুই স্বায়িত্ব লাভ করে না। চলমান সংকট থেতে বের  হয়ে আসতে হলে তত্ত্বাবধায়ক বা অন-বর্তীকালীন সরকার যে নামেই কোন না তার বিকল্প নাই। ‘নির্দলীয়’ শব্দটির ওপর গুরুত্বারোপ করে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া বলেন, নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকেই নিরপেক্ষ হতে হবে। জনাব আব্দুল লতিফ মন্ডল চলমান সঙ্কট থেকে উত্তরণের একটি পন’া হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যয় দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের প্রস-াব করেন। বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্যে বলেন, নির্বাচনী আইন অনুযায়ী আপনারা আর জোট করে নির্বাচন করতে পারবেন না। দলকে যার যার প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে হবে। তিনি আরো বলেন পার্লমেন্ট ডিসলভ করে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্য থেকে কোয়ালিশন এর মাধ্যমে অনর্-বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যেতে পারে। ড. শাহদীন মালিক বলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল নিজেরাই নিজেদের সঙ্কট ডেকে আনছেন। আপতত আমি সঙ্কট উত্তরণের কোন পথ দেখছি না। বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন করতে পারেন তাতে করে সরকারের অবস’ানের কোন পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করি না। আগামী নির্বাচনে ভোট দিতে যাবো কি না এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ড. হামিদা হোসেন বলেন, ‘না’ ভোটের অপশন থাকলে অবশ্যই আমি না ভোট দেবো। কেননা আমার আর কোন বিকল্প জানা নেই। জনাব ইনাম আহমেদ চৌধুরী  বলেন, আগামী নির্বাচন একটি অন-বর্তীকালীন নির্দলীয় সরকারের অধীনে হতে হবে তা দেশের আপমর জনগণের আকাঙ্খা। তিনি অন-বর্তীকালীন সরকারের একটি রুপরেখা তৈরি করে জনসম্মুখে উপস’াপন করার জন্য সুজনকে আহ্বান জানান। সৈয়দ আব্দুল মান্নান দুই নেত্রীকে একত্রে সংলাপে বসার জন্য সুজনকে উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। জনাব শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, চলমান সংকটের সমাধান রাজনীতিবিদদেরকেই দিতে হবে। নাগরিকগণ পরামর্শ দিতে পারেন। তিনি রাজনীতিবিদরা ভুল পথে থাকলে তাদের সঠিক পথে আনয়নের জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান। ড. পিয়াস করিম বলেন, রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় যে প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করার কথা তা একদমই কাজ করছে না। দ্বিদলীয় ব্যবস্থার বাইরে একটি জোড়ালো নাগরিক প্লাটফরম তৈরি করতে হবে।

মূল প্রবন্ধের ৭ক অনুচ্ছেদের ব্যখ্যা সম্পর্কে একমত নন মন-ব্য করে জনাব রাশেদ খান মেনন বলেন, সংবিধানে অবৈধভাবে যারা ক্ষমতা দখল করেছে তাদের কাউকেই আমরা পরবর্তীতে বিচারের কাঠগোড়ায় দাঁড় করাতে পারিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা আমরা বহুদিন ধরে বললেও এ ব্যবস্থার সংস্কার হওয়া জুরুরি। বিচার বিভাগকে এ ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। জনাব ফজলুল আজিম এমপি বলেন, চলমান সমস্যার সমাধান করতে আমাদের সকলকে একত্রিত হতে হবে। এই মুহূর্তে প্রয়োজন সংলাপ। সমস্যাটা রাজনৈতিক আর তাই রাজনৈতিকভাবে সংকটের সমাধান করতে হবে। জনাব মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এ দুটি দল বসলেই যে সকল সমস্যার সমাধান হবে আমি মনে করি না। আপাতত সমাধান হিসেবে দুটি দল বসে মারামারি, সংঘাত বন্ধ করুক। আমরা নাগরিকরা শান্তিতে জীবনযাপন করতে চাই।  রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আর যাই হোক কোন দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারীদের একত্রিত হবার আহ্বান জানান।

Advertisements