দুর্নীতি প্রতিরোধে ‘হুইসেলব্লোয়ার’ আইন

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২৪-০৮-২০১২

২০১১ সালের জুন মাসে ‘হুইসেলব্লোয়ার’ (whistleblower) বা জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আইনটির উদ্দেশ্য হলো, জনস্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে কোনো ব্যক্তি যদি সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কোনো কর্মকর্তার অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেন, তাঁকে সুরক্ষা প্রদান। এটি একটি যুগান্তকারী আইন এবং এটি পাসের জন্য আমরা বর্তমান সরকার ও নবম জাতীয় সংসদকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আইনটি সম্পর্কে জনসচেতনতা নেই বললেই চলে।

আইনের ২(৪) ধারায় সরকারি অর্থের অনিয়মিত ও অননুমোদিত ব্যয়; সরকারি সম্পদের অব্যবস্থাপনা; সরকারি সম্পদ বা অর্থ আত্মসাৎ বা অপচয়; ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা (maladministration); ফৌজদারি অপরাধ বা বেআইনি বা অবৈধ কার্য সম্পাদন; জনস্বার্থ, নিরাপত্তা বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ বা কোনো কার্যকলাপ; অথবা দুর্নীতি’বিষয়ক তথ্য ‘জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

হুইসেলব্লোয়ার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, তাই এ ধরনের ব্যক্তিদের সুরক্ষা প্রদান আবশ্যক। এ কারণে তাঁদের পরিচয় গোপন রাখার বিধানও আইনে রয়েছে। আরও বিধান রয়েছে তথ্য প্রকাশকারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি, দেওয়ানি, বিভাগীয় মামলা দায়ের বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোনোরূপ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞার। তবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন তথ্য প্রকাশ করে কাউকে হয়রানি করলে তথ্য প্রকাশকারীর বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানও আইনে রয়েছে।

আইনটির বিধানগুলো অত্যন্ত কঠোর। আইনের ২(৪) ধারা পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের, বিশেষত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যেমন: সরকারি সম্পদের অব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ অনেকের বিরুদ্ধেই আনা সম্ভব। তাই আইনের পরিধি আরও সীমিত করা প্রয়োজন বলে মনে হয়।

এ ছাড়া, বর্তমান অবস্থায় আইনটির অনেকগুলো সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যার একটি হলো সংজ্ঞাগত। যেমন: প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং অনৈতিক কাজের সংজ্ঞা কী। এ ছাড়া, বিচার বিভাগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে এবং অবৈধ ও অনৈতিক কাজের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।

আইনটি নিয়ে আরেকটি আশঙ্কা হলো, যদিও ৫(৪) ও ৫(৫) ধারায় তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় গোপন রাখার বিধান রয়েছে, আইনের ধারা ৫(৬) অনুযায়ী, ‘এই ধারায় অন্য যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো মামলার শুনানিকালে আদালতের নিকট যদি প্রতীয়মান হয় যে,…তথ্য প্রকাশকারীর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ ব্যতীত…মামলার ন্যায়বিচার নিশ্চিত সম্ভব নয়, তাহা হইলে আদালত সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় প্রকাশ করিতে…পারিবে।’ এই শর্তের ফলে মামলায় অভিযুক্তদের আইনজীবীর পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের খাতিরে তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় প্রকাশ করার দাবি আদালতে জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে। তাই তথ্য প্রকাশকারীর পরিচিতি গোপন রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য প্রকাশকারীর পরিচয় প্রকাশ করার বিরুদ্ধে আইনটিতে কোনো সুরক্ষা নেই। এসব সীমাবদ্ধতার কারণেও আইনটি সংশোধন করা আবশ্যক।

আইনটি সংশোধনের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আইনে শুধু জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকারী ব্যক্তিকেই সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার অভ্যন্তরে সংঘটিত অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যা আড়ালে থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি সরবরাহ করেন। আইনটি সংশোধনের ক্ষেত্রে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকারী মিডিয়াকে সুরক্ষা প্রদানের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘দ্য টেইস্ট অব পুডিং ইজ ইন ইটস ইটিং।’ অর্থাৎ পুডিং খাওয়ার মাধ্যমেই তার স্বাদ অনুভব করা যায়। তেমনিভাবে আইন প্রণয়নের সার্থকতা নির্ভর করে তা বাস্তবায়নের ওপর। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন আছে, কিন্তু এগুলোর বাস্তবায়ন নেই। যেমন: নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা, অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন এবং বৈদেশিক শাখার বিলুপ্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিধান আমাদের সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইন, ১৯৭২-এ রয়েছে; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এগুলো মানে না এবং কমিশনও এ ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য করে না। এমনকি আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতিও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বিদেশি শাখার প্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত এ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হলো একটি সহায়ক পরিবেশের অভাব। তথ্য প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য হলো অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ করা। তথ্য প্রকাশ হতে পারে দুভাবে: স্ব-উদ্যোগে এবং তৃতীয় পক্ষ দ্বারা। আর স্ব-উদ্যোগে তথ্য প্রকাশের বিস্তার ঘটলে হুইসেলব্লোয়ার বা তৃতীয় পক্ষ কর্তৃক তথ্য প্রকাশের পথ সুগম হবে। বর্তমানে গণমাধ্যমে যাঁদের সম্পর্কে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে, তাঁদের (যেমন: দুজন মন্ত্রী, হলমার্ক, সোনালী ব্যাংক, শেয়ারবাজারে কারসাজির হোতাদের) বিরুদ্ধে নির্মোহভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিলেও হুইসেলব্লোয়ারদের জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের পথ প্রশস্ত হবে।

এ ছাড়া, স্ব-উদ্যোগে স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ করলে এবং এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ভুল তথ্য প্রদানকারী ও তথ্য গোপনকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিলে সমাজে দুর্নীতির মাত্রা হ্রাস পাবে। ফলে তৃতীয় পক্ষ কর্তৃক জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তাও কমে যাবে। প্রসঙ্গত, আইনটির মাধ্যমে দুর্নীতি দমনের পরিবর্তে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে, যা নিঃসন্দেহে অধিক কাম্য।

আমাদের সমাজের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা, যাঁরা সরকারি অর্থ-সম্পদের হেফাজতকারী, তাঁরা নিজেরা স্ব-উদ্যোগে সম্পদের হিসাব প্রদান করলে তথ্য প্রকাশের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, যা সম্ভাব্য হুইসেলব্লোয়ারদের জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশে উৎসাহিত করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই সংস্কৃতি গড়ে ওঠার কোনো কার্যকর ও ধারাবাহিক উদ্যোগ আমাদের দেশে লক্ষ করা যায় না।

স্মরণ করা যেতে পারে, স্বপ্রণোদিত না হলেও আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে স্ব-উদ্যোগে তথ্য প্রকাশের একটি শুভ প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়। নাগরিক সমাজের দাবির মুখে গত সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব প্রার্থীকে তাঁদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে নিজেদের এবং তাঁদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের সম্পদ ও দায়দেনার হিসাব প্রদান করতে হয়েছে। নির্বাচনের আগে ঘোষিত তাদের ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রতিবছর সম্পদের হিসাব প্রদানের ও প্রকাশের অঙ্গীকার দু-দুবার ব্যক্ত করে। যেমন: ‘প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।’ বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রীও একাধিকবার একই ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমনকি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলের ২০০৫ সালে ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচিতেও এমন অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অদ্যাবধি সাংসদ, মন্ত্রী ও অন্য উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।

বরং আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সাম্প্রতিক যুক্তরাজ্য সফরকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ ব্যাপারে হতাশাব্যঞ্জক বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে সাংসদদের সম্পদের হিসাব নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে রয়েছে। এ ছাড়া, তাঁরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও এনবিআরের কাছে প্রতিবছর সম্পদের হিসাব দিয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী জানেন যে এনবিআরে দাখিল করা তথ্য জানার অধিকার কারোরই নেই। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সম্পদের হিসাব নিলেও তা প্রকাশ করা হয় না। আর নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে যে তথ্য রয়েছে, তা ২০০৮ সালের। এটি সুস্পষ্ট যে, বর্তমান সরকার প্রতিবছর ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে, যদিও এর মাধ্যমে সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারত। কিন্তু কার স্বার্থে?

সম্পদের হিসাব প্রকাশ যে দুর্নীতি ও অপকর্ম রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তার একটি জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় ১২ আগস্ট ২০১২ তারিখের প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, আমাদের ১৮ জন মাননীয় সাংসদ তথ্য গোপন করে পূর্বাচল ও উত্তরায় এক বা একাধিক প্লট পেয়েছেন। তথ্য গোপন করার বিষয়টি জানা গেছে ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় তাঁদের প্রদত্ত হলফনামা থেকে, যেগুলো সম্প্রতি বর্তমান লেখকের সম্পাদনায় ‘নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের তথ্যাবলি’ শিরোনামে প্রথমা প্রকাশন প্রকাশ করেছে। প্রসঙ্গত, প্রকাশনাটিতে মোট এক হাজার ৬৫৩ জন প্রার্থীর হলফনামা ও আয়কর বিবরণীর প্রদত্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কথিত আইনটি কার্যকর করার জন্য হুইসেলব্লোয়ারদের ইনসেনটিভ প্রদানের কথাও ভাবা যেতে পারে। হুইসেলব্লোয়ারদের তথ্য প্রকাশের ফলে সম্পদ ফিরে পেলে এর একাংশ তাঁদের দিলে তাঁরা উৎসাহিত হবেন।

পরিশেষে, এটি সুস্পষ্ট যে জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১ একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন এবং এটির বাস্তবায়ন জরুরি। তবে এটির সংশোধন আবশ্যক। আর এটি বাস্তবায়নের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের স্ব-উদ্যোগে তথ্য প্রকাশের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠলেই এমন একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে উঠবে। প্রাইভেট মেম্বার বিল হিসেবে জনাব সাবের হোসেন চৌধুরী কর্তৃক ২০১০ সালে সংসদে উত্থাপিত সংসদ সদস্য আচরণ আইন, যা সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি ইতিমধ্যে অনুমোদন দিয়েছে, দ্রুত পাস করা হবে এ ব্যাপারে একটি বিরাট পদক্ষেপ। আশা করি, সরকার এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নেবে।
 ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

সূত্র: প্রথম আলো, ২৪ আগষ্ট ২০১২

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s