হলমার্ক জালিয়াতি রাজনৈতিক দুবৃর্ত্তায়নেরই প্রতিফলন – গোলটেবিল বৈঠকে বক্তাগণ

Roundtable-SHUJAN 039হলমার্ক জালিয়াতি রাজনৈতিক দুবৃর্ত্তায়নেরই প্রতিফলন সুজনের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।  গত ৭ অক্টোবর ২০১২, সকাল ১০ টায়,জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে, হলমার্ক জালিয়াতি,রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এবং ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যতশীর্ষকগোলটেবিল বৈঠকটি বিচারপতি কাজী এবাদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সুজন সম্পাদক  ড. বদিউল আলম মুজমদারের সঞ্চালনায় বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের ডিরেক্টর এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক জনাব মামুন রশীদ

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জনাব এ এস এম শাহজাহান ও জনাব মির্জা আজিজুল ইসলাম, মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব তাজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, অর্থনীতিবিদ জনাব আবু আহমেদ, পিআরআই এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ড. আহসান এইচ মনসুর, সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব জনাব আলী ইমাম মজুমদার, ব্যবসায়ী জনাব আব্দুল হক, জনাব হুমায়ূন কবির হিরু, অধ্যাপক কামাল আতাউর রহমান,আব্দুল হাই মজমুদার,সাংবাদিক মুনির হায়দার,রাজনীতিক মানবেন্দ্র দেব,আবুল হাসনাত প্রমূখ।

মূল প্রবন্ধে জনাব মামুন রশীদ হলমার্ক জালিয়াতির নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণগুলো উল্লেখ করে বলেন- ১. যে উপায়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমরা ইনল্যান্ড বিল পারচেজ বা অভ্যন্তরীণ বিল ক্রয় ও লোকাল বিল ডিসকাউন্টিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকি এবং এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করি তাতে গলদ আছে, ২. বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে আমরা যে উপায়ে ব্যাংকের দায় _ স্বীকৃতিপত্র  বা একসেপটেন্স ও ব্যাংক ঝুঁকি বিবেচনায় নেই না বা তদারকি করি না, ৩. রাষ্ট্রায়াত্ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও অনুমোদন করার ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্বলতা রয়েছে, ৪. ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বড় বড় গ্রাহকদের সামলাতে ও তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হচ্ছে, ৫. ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী সম্পর্কে অধিকাংশ পরিচালকের অজ্ঞতা ও এর ওপর নিবিড় নজরদারি নেই, ৬. নিয়মিত নিরীক্ষার অভাব, ৭. অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স বা পরিপালনীয় শর্তাবলী পালনে ঘাটতি, ৮. সঠিক উপায়ে তথ্য-উপাত্ত(এমআইএস) পাওয়া বা ব্যবস্থাপনা না করা ৯. ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার যথাযথ তত্ত্বাবধান না থাকা ১০. ব্যবসা বানিজ্যের নানামুখী বিকাশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নতুন নিয়মাবলী বা নীতিমালা প্রনয়ণের সীমাবদ্ধতা ১১. ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে জালিয়াতির প্রবণতা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাওয়া এবং ১২. ট্রানজেকশন প্রসেসিং বা লেনদেন প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পাদন, নিরাপত্তা ও জামানত পর্যালোচনা, লেনদেন সংক্রান্ত রিপোর্টিং এবং পরিচালনার ব্যাপারে সঠিক কোনো গাইডলাইন বা দিকনির্দেশনার অনুপস্থিতি। তিনি এ বিষয়ে যে সুপারিশ বা পরামর্শ প্রদান করেন তা হলো- ১. বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি একক কমিটি বা পর্ষদ গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি বা পর্ষদ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ডিজিএম থেকে তাদের জিএম পদে লোক নির্বাচন, পদোন্নতি প্রদান ও আন্ত: ব্যাংকে রদবদল বা বদলির কাজ সম্পন্ন করবে, ২. মালিকানা যার হাতেই থাকুক ব্যাংক খাতের ওপর সার্বিক নজরদারি ও তত্ত্বাবধান কার্যক্রম পরিচালনার সমুদয় দায়িত্ব পালনের দায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপরই ন্যস্ত হওয়া উচিত, ৩. অর্থমন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট বা ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনায় লোক নিয়োগের দায়িত্ব পালন করবে, ৪. দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের _ স্বায়ত্ত্বশাসন নিশ্চিতকরণ করতে হবে, ৫. অর্থমন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করা উচিত। তিনি প্রবন্ধে আমাদের ব্যাংক খাতে সংস্কার সাধন ও পুনর্গঠন জরুরি  হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে হলমার্কের মতো আরো অনেক ঘটনা লুকিয়ে আছে, এমনকি এ ধরনের আরো ঘটনা সংঘটনের প্রক্রিয়া চলছে যেগুলো এখনো প্রকাশ পায়নি।

সোনালী ব্যাংক সরকারি বলে হয়তো ততটা সমস্যা হচ্ছে না, বেসরকারী ব্যাংক হলে এর অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়তো উল্লেখ করে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বলেন, আমরা আমানতকারীরা হলমার্ক ইস্যুতে শংকিত হয়ে পড়েছি। হলমার্ক দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা আত্মস্মাত করেছে যা আমাদের সাধারণ জনগণের আমানত হিসেবে গচ্ছিত অর্থ, আমরা এর প্রতিকার চাই। জনাব এ এস এম শাহজাহান বলেন, এই ইস্যুতে Preventive measure এর ওপর জোর প্রদান করা উচিৎ। আমাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব যেন না থাকে। একইসাথে গণমাধ্যম এবং নাগরিকদেরকেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এরকম অপরাধ যেন ভবিষ্যতে না ঘটে সেব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

জনাব মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, হলমার্ক কেলেঙ্কারিকে সমস্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধ্বসের চিত্র হিসেবে যেন আমরা প্রচার না করি। আমাদের ব্যাংকিং ব্যস্থায় ক্ষতি হয়েছে সত্য কিন্তু আমরা তা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম। অনেকের বক্তব্য যে, প্রথম অগ্রাধিকার হলো যে টাকা হলমার্ক আত্মস্মাত করেছে তা পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু তিনি টাকা পুনুরুদ্ধার এবং এই কেলেংকারীর সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তি প্রদানের বিষয়টি একইসাথে চলা উচিৎ বলে মন্তব্য করেন। ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ফেইল করায় এই জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। ঘটনাটি সোনালী ব্যাংক এর পরিচালনা পর্ষদ জানে না এটা অবিশ্বাস্য। সকলের যোগসাজশে এই ঘটনা ঘটেছে। তিনি Financial Reporting Act না থাকা এবং ১৯৪৭ সালের ব্যাংক আইন দিয়ে ব্যাংকিং সেক্টর এর কাজ পরিচালনা করারও সমালোচনা করেন।

সোনালী ব্যাংক ইস্যুতে নিরপেক্ষ তদন্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে জনাব তাজুল ইসলাম এমপি বলেন, যে টাকা যেখানে গেছে সে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে, জড়িতদের মারলে বা জেলে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। রীতিনীতি যা কিছুই থাকুক না কেন ছিনতাইকারী ছিনতাই করলে তাদের কঠোর শাস্তি প্রদান করা হবে। সকল ব্যাংক তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে প্রদান করা উচিৎ মন্তব্য করে সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, হলমার্ক জালিয়াতির সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তি প্রদান করতে হবে। তিনি credit, market and operational risk জোরদার করার সুপারিশ করেন। তিনি রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাংকে এমআইএস এর অভাবের কথা উল্লেখ করেন। জনাব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, হলমার্ক কোন বিচ্ছিন্‌ ঘটনা নয়, এর সাথে ডেসটিনি, শেয়ার বাজার ইত্যাদি বিষয়সমূহ রয়েছে। তিনি বলেন সমস্যার মূলে রয়েছে মানুষ ও তার লোভ-লালসা। তিনি আরো বলেন, রাজনীতিবিদরাই পারেন এসকল অনাচার বন্ধ করতে।  জনাব আবু আহমেদ বলেন, ইসভেস্টিগেশন যাই হোক না কেন সাধারণ জনগণের এতে বিশ্বাস নাই। তিনি Financial Reporting Act টি পার্লামেন্টে পাস করার আহ্বান জানান। তিনি আরো বলেন, ফিনান্সিাল ক্রাইমের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন আইন আমাদের দেশে নেই, সুতরাং অপরাধী আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমি শুধুমাত্র এটাকে অর্থনৈতিক ইস্যু বলতে রাজি নয় এর সাথে রাজনীতি ও সুশাসন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি সরকারকে এব্যাপারে কঠোর শাস্তি প্রদান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার আহ্বান জানান। হলমার্ক ইস্যুতে জড়িতদের বিচার দাবি করে জনাব আব্দুল হক বলেন, পুজি নির্মাণের কৌশল বা দর্শনটা কি? যারা এদেশ থেকে পুঁজি বিদেশে পাচার করছে তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিৎ। তিনি দুদককে এব্যাপারে অগ্রনী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

Advertisements