নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে সংশয়

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২৩-১১-২০১২

১১ নভেম্বর ২০১২ তারিখের প্রথম আলোয় প্রকাশিত দুটি সংবাদের শিরোনাম আমাদের মনে দারুণ সংশয়ের সৃষ্টি করেছে। শিরোনাম দুটি হলো: ‘সব মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব চাওয়া হবে: ইসি এখন নিজেকে যথেষ্ট ক্ষমতাধর মনে করছে না’, এবং ‘সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন: তিন বছর সদস্য থাকার বিধান বাতিলের চেষ্টা’। এসব সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অতীত অবস্থানের সঙ্গে শুধু অসংগতিপূর্ণই নয়, এগুলো কিছু গুরুতর আশঙ্কারও উদ্রেক করে।

প্রতিবেদক তাঁর প্রতিবেদনেই উল্লেখ করেছেন, গত জুন মাসে মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার দাবি করেছিলেন যে কমিশন সাংবিধানিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী এবং নির্বাচন পরিচালনার জন্য আর ক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। গত নির্বাচন কমিশন যে চারটি মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্বাচনকালে কমিশনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছিল, তিনি তারও বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে ওই সব মন্ত্রণালয়ের ওপর কর্তৃত্ব বাড়াতে গেলে সাংবিধানিকভাবে অর্পিত দায়িত্ব কমিশনের পক্ষে পালন করা সম্ভব হবে না। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে অতীতের অবস্থান থেকে সরে এসে কমিশন এখন সব মন্ত্রণালয়ের ওপর তাদের কর্তৃত্ব দাবি করার কথা ভাবছে।

বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনের ওপর চারটি সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব অর্পণ করেছে: (১) রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠান; (২) সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান; (৩) সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ; এবং (৪) রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ। সংবিধানের অন্য কোনো অনুচ্ছেদ বা আইনের দ্বারা অর্পিত দায়িত্ব পালন করতেও কমিশন অবশ্য বাধ্য।

পক্ষান্তরে, আমাদের সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের জন্য অবশ্যকরণীয়। অর্থাৎ সংবিধান নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব সুস্পষ্ট করে দিয়েছে: কমিশনের দায়িত্ব নির্বাচন পরিচালনা এবং নির্বাচনসংক্রান্ত আনুষঙ্গিক দায়িত্ব পালন করা; আর সরকারের দায়িত্ব সে কাজে কমিশনকে সহায়তা করা। সরকার পরিচালনা কিংবা কোনো মন্ত্রণালয়ের ওপর কর্তৃত্ব করা কমিশনের কাজ নয়। তাই মন্ত্রণালয়ের ওপর কমিশনের এ ধরনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব হবে আমাদের সংবিধানিক স্কিমের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। এ কারণে আমরা বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের গত জুন মাসের বক্তব্যের সঙ্গে একমত যে মন্ত্রণালয় পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে গেলে সংবিধান নির্দেশিত নির্বাচনসংক্রান্ত মূল দায়িত্ব পালনই কমিশনের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।

নির্বাচন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা জানেন যে একটি জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করা এক বিরাট কর্মযজ্ঞ। ১২-১৩ লাখ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত হন। রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, পুলিং কর্মকর্তাদের মতো নির্বাচন পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রদান কমিশনের দায়িত্ব। এ ছাড়া এই বিরাট কর্মী বাহিনী যাতে সঠিকভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন, তার প্রতি নজরদারি করাও কমিশনের দায়িত্ব। এই নজরদারি সরকার পরিচালনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং এর জন্য কমিশনের সর্বশক্তি নিয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে।

এ ছাড়া নির্বাচনের সময় কমিশনকে আরও বহুবিধ দায়িত্ব পালন করতে হয়। ব্যালট পেপার সরবরাহ থেকে শুরু করে আরও অনেক লজিস্টিকস কমিশনকে সারা দেশে প্রেরণ এবং এগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। মনোনয়নপত্র, হলফনামা ইত্যাদি তাদের প্রসেস এবং ভোটার ও গণমাধ্যমের কাছে বিতরণ করতে হয়। তাদের প্রার্থী ও দলের নির্বাচনী ব্যয় নিরীক্ষণ করতে হয়।

নির্বাচন কমিশনের একটি বড় কাজ হলো আপিল অথরিটি হিসেবে দায়িত্ব পালন। মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলসংক্রান্ত অভিযোগের সুরাহা কমিশনের করতে হয়। মাঠপর্যায়ের অনেক অভিযোগের সমাধানের দায়িত্ব কমিশনকে পালন করতে হয়। নির্বাচনী আইনের ব্যাখ্যা প্রদানও কমিশনের কর্তব্য। এ ধরনের বহুবিধ দায়িত্ব পালনের পর, কমিশনের মন্ত্রণালয়ের ওপর কর্তৃত্ব করার মতো সময় থাকার কথা নয়। তাই আমাদের আশঙ্কা যে সব মন্ত্রণালয়ের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হবে কমিশনের জন্য আত্মঘাতী।
একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন: মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অর্থ কী? কমিশনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মানে অবশ্যই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী/উপদেষ্টার অপসারণ বা তাঁদের ক্ষমতাহীন করা নয়। অথবা মন্ত্রণালয়ের সব নির্বাহী ক্ষমতা কমিশনের হাতে ন্যস্ত করা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার, বিশেষত কর্মকর্তার বদলির ক্ষেত্রে মন্ত্রী/উপদেষ্টার পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের পরামর্শ গ্রহণ, যা প্রদানের মতো তথ্য কমিশনের কাছে নাও থাকতে পারে। কিংবা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের কাছে কমিশনের সুপারিশ প্রেরণ। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে মন্ত্রী/উপদেষ্টা যদি কমিশনের মতামত বা সুপারিশের প্রতি কর্ণপাত না করেন?

অতীতে সরকার নির্বাচন কমিশনের অনুরোধ উপেক্ষা করেছে এবং নির্বাচনকালীন সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে এবং কিন্তু কমিশন সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেনি। সরকারের অসহযোগিতার একটি নগ্নতম উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছিল গত বছর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়ে, যখন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী সরকারের সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে ব্যর্থ হয়। নির্বাচনের পর কমিশনের এ ব্যাপারে কিছুই করার ছিল না।

এ ছাড়া সরকার, এমনকি বিরোধী দলও প্রতিনিয়ত নির্বাচনী আইন অমান্য করে যাচ্ছে, কিন্তু কমিশন এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্বিকার। উদাহরণস্বরূপ, সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অঙ্গ/সহযোগী সংগঠন এবং বৈদেশিক শাখা থাকা আইনের লঙ্ঘন। আইনানুযায়ী দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা করতেও দলগুলো বাধ্য। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো আইনের এসব বিধান লঙ্ঘন করেই যাচ্ছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে কোনো রকম ব্যবস্থা নিতে অপারগ। এমনকি বর্তমান কমিশন এ ব্যাপারে দলগুলোকে কারণ দর্শাতেও অনাগ্রহী। এ ধরনের অপারগতা বা অনাগ্রহ কমিশনের শক্তিহীনতা বা দুর্বলতার কারণে নয়, বরং আইনানুগ ক্ষমতা প্রয়োগে সদিচ্ছা বা সাহসের অভাবে। তাই কমিশনের শক্তি অর্জনের জন্য মন্ত্রণালয়ের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিতান্তই একটি অর্থহীন স্লোগান মাত্র, যদিও নিন্দুকেরা এটিকে ‘আইওয়াশ’ বলে মনে করতে পারেন।

মন্ত্রণালয়ের ওপর কমিশনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে আইওয়াশ বলার যৌক্তিকতা হলো যে এর মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে একটি বড় বাধা দৃষ্টির অগোচরে থেকে যেতে পারে। প্রশাসনে দলীয়করণ আজ নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে একটি বিরাট অন্তরায়। গত দুই দশকের সব সরকারই নির্বাচনের প্রাক্কালে ক্ষমতা ত্যাগের আগে তাদের অনুগত ব্যক্তিদের নির্বাচনের জন্য স্পর্শকাতর পদে আসীন করে গিয়েছে। অতীতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ ধরনের সাজানো বাগান ভেঙে দিয়ে অপেক্ষাকৃত দলনিরপেক্ষদের সেসব পদে নিয়োগ দিয়েছে এবং সব কর্মকর্তা যাতে নিরপেক্ষভাবে আচরণ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ‘স্টেটাস কো’ বা স্থিতাবস্থা বিরাজ রাখা সম্ভব হবে, ফলে প্রশাসনে দলতন্ত্রের সমস্যাটি ধামাচাপা পড়ে যেতে পারে। এ ধরনের নির্বাচন অবশ্য বিতর্কিত হতে বাধ্য। কারণ, পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা, যাঁরা বিভিন্ন ধরনের অন্যায় সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত বা অপকর্মের সঙ্গে লিপ্ত, নিজেদের স্বার্থেই ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাণান্ত হবেন।

আর নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য মন্ত্রণালয়ের ওপর কমিশনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং এর জন্য মূলত প্রয়োজন: (১) একটি যথাযথ আইনি কাঠামো; (২) কাঠামোটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কমিশনের সদিচ্ছা ও অনমনীয়তা; (৩) নিরপেক্ষ ও নির্ভীক ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগ প্রদান; এবং (৪) কমিশনকে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা প্রদান। নির্বাচনসংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনেক যুগান্তকারী সংস্কার করা হয়েছে, ফলে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত হলেও কাঠামোটি বহুলাংশে সন্তোষজনক। তবে আইনি কাঠামোটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের ব্যাপারে কমিশনের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ নিয়েও। আর্থিক স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও, কমিশনের জন্য একটি স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত যা পরিলক্ষিত হয়নি, তা হলো কমিশনের পক্ষ থেকে এ স্বাধীনতা প্রয়োগের লক্ষ্যে অনমনীয়তা।

আরেকটি প্রাসঙ্গিক বিষয়। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পেছনে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের অন্যতম যুক্তি হলো যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনির্বাচিত। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে অনেকেই সন্দিহান। তাই প্রস্তাব উঠেছে মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার। তবে এ ধরনের প্রস্তাব প্রদানকারীরা ভুলে যান যে কমিশনও নির্বাচিত নয়। তাই কমিশনের ওপর এ ধরনের দায়িত্ব অর্পণ অনির্বাচিত ব্যক্তিদের সরকারে রেখে নির্বাচন করার ‘সমস্যা’র সমাধান তো করবেই না, বরং এ নিয়ে নতুন জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।

দলীয় মনোনয়ন লাভের জন্য ন্যূনতম তিন বছরের দলের সদস্যপদ থাকার বিধান রহিত করার প্রস্তাবও ভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এর মাধ্যমে দলীয় শৃঙ্খলা সমপূর্ণ ভেঙে যেতে, ‘মনোনয়ন-বাণিজ্যে’র আরও প্রসার ঘটতে এবং পুরোপুরি নির্বাচন-প্রক্রিয়াই টাকার খেলায় পরিণত হতে পারে। ফলে আমাদের হয়ে যেতে পারে ‘বেস্ট ডেমোক্রেসি মানি ক্যান বাই’ বা টাকা দিয়ে কেনা যায় এমনই সর্বোত্তম গণতন্ত্র।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

সূত্র: প্রথম আলো, ২৩ নভেম্বর, ২০১২

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s