সংকট উত্তরণে প্রয়োজন নাগরিক ঐক্য

logo
ড. ব দি উ ল আ ল ম ম জু ম দা র
আগামী আট-নয় মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রথম আবশ্যকীয় পদক্ষেপ অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তবে শুধু নির্বাচিত সরকারই গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ব্যক্তি ও কোটারি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না করা, ব্যক্তিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্র পরিহার করা। পরিচ্ছন্ন ও জনমুখী শাসন কাঠামো গড়ে তোলা। বাক-স্বাধীনতাসহ নাগরিকদের সব অধিকার সমুন্নত রাখা। সব রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার চর্চা করা, যথাযথ আইনি কাঠামো প্রণয়ন ও তা পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সব কাজে সবার অন্তর্ভুক্তিকরণ, সমতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করা। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।আর এ ধরনের একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের জন্য প্রয়োজন কতগুলো শক্তিশালী, কার্যকর সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠন। যেমন- জাতীয় সংসদ, আদালত, স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, রাজনৈতিক দল, সংঘবদ্ধ নাগরিক সমাজ ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রের পিলার বা খুঁটিস্বরূপ।

এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বলিষ্ঠ ভূমিকার ওপরই মূলত নির্ভর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্রের কার্যকারিতা। উদাহরণস্বরূপ, সংসদের কার্যকারিতার মাধ্যমে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ও সব দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ সুগম হয়। স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ রোধ এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষিত হয়। নির্বাচিত ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সর্বস্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং সর্বোপরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গভীরতা অর্জনের পথ প্রশস্ত হয়। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং নির্ভীক ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠিত হলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভবপর হয়।

সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হয়। স্বাধীন ও কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্ষমতাধরদের ব্যক্তিগতভাবে এবং তাদের কোটারিদের লাভবান হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়। তথ্য কমিশনের মাধ্যমে নাগরিক তথা রাষ্ট্রের মালিকদের সত্য জানার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমেও নাগরিকদের অধিকার সমুন্নত থাকে। গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। সংগঠিত নাগরিক সমাজ সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নাগরিকদের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিতকরণসহ তাদের জনস্বার্থপরিপন্থী কার্যক্রম থেকে বিরত রাখে। এক কথায় বলতে গেলে, সাংবিধানিক, বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠনগুলোর তৎপরতার ওপরই মূলত গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে।

একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর আশা করা হয়েছিল, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারগুলো সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করবে এবং সত্যিকারের বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবে। তিন জোটের রূপরেখার মাধ্যমে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে লিখিত অঙ্গীকারও করা হয়েছিল। বিশেষভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নব্বই-পরবর্তী নির্বাচিত সরকারগুলো সংসদীয় পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করলেও সংসদকে কার্যকর করেনি এবং শাসন কাঠামোতেও তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেনি। বরং তাদের চরম যথেচ্ছাচার ও অর্বাচীনতার কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগতভাবে দুর্বল ও অকার্যকর হয়ে পড়ে। এছাড়াও রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো একের পর এক নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের চেষ্টায় লিপ্ত হয়, যা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে বিরাট প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।

তবে জনগণ অনেকটা আশান্বিত হয়েছিল যখন চারদলীয় জোট সরকারের বিভিন্ন কারসাজির মাধ্যমে পাতানো নির্বাচন অনুষ্ঠানের পাঁয়তারার মুখে ২০০৫-০৬ সালে ১১-দল ও পরবর্তী সময়ে মহাজোটের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কতগুলো সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবগুলো জাতীয় সংসদেও উত্থাপন করেন। এর আগ থেকেই অবশ্য ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)-এর পক্ষ থেকে একটি সার্বিক সংস্কার কর্মসূচির রূপরেখা প্রণয়ন করে সে কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনমত সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয় এবং গণমাধ্যম এ কাজে সর্বাত্মক সমর্থন জোগায়।

জনমতের চাপে ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্যোগে কিছু নির্বাচনী সংস্কার, উচ্চ আদালতে নিয়োগ, স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও রাজনৈতিক দলগুলোর বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তীকালে- বর্তমান মহাজোট সরকারের গত চার বছরের মেয়াদকালে- পদ্ধতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে থেমে যায়। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদে’ সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার ও উচ্চ আদালতে নিয়োগসংক্রান্ত সংস্কারগুলো নবম জাতীয় সংসদ অনুমোদন করেনি। কিছু নির্বাচনী সংস্কারও বাতিল করা হয়। বস্তুত, নবনির্বাচিত সরকার সংস্কার উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেয়। ফলে ‘সংস্কার’ কথাটি বর্তমানে একটি অবাঞ্ছিত শব্দে এবং ‘সংস্কারবাদী’ একটি গালিতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংসযজ্ঞও অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়াও অব্যাহত রয়েছে রাজনীতিতে পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা ও হানাহানি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনপীড়ন, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ ও ফায়দা প্রদানের অপসংস্কৃতি। প্রতিহিংসাপরায়ণতার রাজনীতির অংশ হিসেবে গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার জীবনের ওপর হামলা হয় এবং একাধিক বিরোধীদলীয় নেতার প্রাণহানি ঘটে। তবে বিরোধী দলের দমনপীড়নের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে, যদিও রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতি গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে। গত কয়েক মাসে বিএনপির প্রায় সব শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে একের পর এক হাস্যকর অভিযোগে মামলা দায়ের, তাদের গ্রেফতার, জামিন না দেয়া, রিমান্ডে নেয়া, কাউকে কাউকে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে গত কয়েক মাসে তিনবার জেলে প্রেরণ করা হয়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আইন-আদালতকে ব্যবহার, বস্তুত অপব্যবহার করে এ ধরনের দমনপীড়ন গণতান্ত্রিক নয়, বরং স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ, যা ভবিষ্যতে অকল্যাণই ডেকে আনবে।

ক্ষমতাধরদের অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার অতীতের অপসংস্কৃতি আমাদের সমাজে এখনও অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসন, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অনেক ক্ষেত্রে বিচারালয়ের পক্ষপাতিত্বের এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহারের কারণে আইনের শাসন হয়ে পড়েছে সুদূরপরাহত। উপরন্তু দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, নিয়োগ-বাণিজ্য, দখলদারিত্ব ইত্যাদি চারদিকে আজ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। শেয়ারবাজারে লুটপাট এবং ডেসটিনি, হলমার্ক ও পদ্মা সেতু ইত্যাদি কেলেংকারি যার নগ্নতম প্রতিফলন। রাজনীতি আর দুর্নীতি আজ বহুলাংশে সমার্থক হয়ে গেছে। অর্থাৎ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে পাঁচ বছরের জন্য লুটপাটের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার অতীতের সংস্কৃতি এখনও অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে ক্ষমতায় যাওয়ার ও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার অশুভ প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। বস্তুত, ক্ষমতায় গেলে লুটপাটের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ এবং ক্ষমতা হারালে নির্যাতন-নিপীড়ন ও মামলা-হামলার শিকার হওয়ার কারণে বাংলাদেশে এখন কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার ঝুঁকি নেয়ারই অবকাশ নেই।ক্ষমতার রাজনীতির এ অশুভ প্রতিযোগিতার ফলে রাজনীতি এখন বহুলাংশে রাজনীতিকদের হাতছাড়া হয়ে পড়েছে। দুর্নীতির ‘রাজনীতিকীকরণে’র ফলে রাজনৈতিক দলগুলো হয়ে পড়েছে অনেকাংশে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের অভয়ারণ্য। নির্বাচন পরিণত হয়েছে টাকার খেলায় এবং আমরা কায়েম করে ফেলছি ‘বেস্ট ডেমোক্র্যাসি মানি ক্যান বাই’ বা টাকা দিয়ে কেনা যায়- এ ধরনের উৎকৃষ্ট গণতন্ত্র। ফলে জাতীয় সংসদ হয়ে পড়েছে ব্যবসায়ীদের আখড়া। এ অবস্থায় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার থাকলেও সংসদে সাধারণ মানুষের জনপ্রতিনিধি হিসেবে বসার কোন সুযোগ নেই। তাই রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারিত হয় জনস্বার্থের পরিবর্তে মূলত ব্যক্তি, দল ও কোটারি স্বার্থে। আর এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ ক্রমাগতভাবে বঞ্চিত হচ্ছে এবং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দিন দিন আকাশচুম্বী হয়ে পড়ছে।

বস্তুত, সাধারণ মানুষের বঞ্চনা আজ সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। তারা প্রতিনিয়ত ‘ভিকটিম’ হচ্ছেন। থানা, অন্যান্য সরকারি অফিস, এমনকি নিম্ন আদালতে গেলে তাদের কাজ হয় না কিংবা তারা প্রয়োজনীয় প্রতিকার পান না, কারণ তাদের উৎকোচ দেয়ার টাকা নেই, নেই কেউ তদবির করার। এমনকি ভিজিডি-ভিজিএফ কার্ড দলীয় নেতা-কর্মীদের ‘পোষার’ কাজে ব্যবহূত হওয়ায় এগুলো থেকেও অনেক গরিব মানুষ এখন বঞ্চিত। গ্রামীণ শিক্ষার মানে ধস নামার ফলে তাদের সন্তান এখন পিয়ন-চাপরাশি ছাড়া অন্য চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে না। নিয়োগ-বাণিজ্যে ও তদবিরতন্ত্রের দৌরাত্ম্যে সে চাকরিও তাদের সন্তানের জন্য আজ অনেকটা সোনার হরিণ। সাধারণ মানুষের এ ধরনের বঞ্চনা আমাদের দেশে উগ্রবাদের জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করে ফেলেছে। কারণ বঞ্চিত মানুষই সাধারণত সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ করে।

প্রসঙ্গত, আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি গত বিশ বছরের নির্বাচিত সরকারের আমলে ভোটের রাজনীতিতে ধর্মকে নানাভাবে ব্যবহার এবং উগ্রবাদী শক্তিকে বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, যদিও ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল, ক্ষমতার রাজনীতির বিবেচনায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বারা পুনর্বাসিত হয়ে তারা এখন সারাদেশে ব্যাপক তাণ্ডব সৃষ্টির সক্ষমতা অর্জন করেছে। সাধারণ মানুষের ধর্মানুভূতিকে পুঁজি করে সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবির্ভাব ঘটেছে হেফাজতে ইসলাম নামের আরেকটি বড় মৌলবাদী শক্তির, যদিও সংগঠনের নেতারা এটিকে অরাজনৈতিক বলে দাবি করছেন।

দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে আমাদের দুটি প্রধান দল ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদী শক্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আঁতাত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। বলা বাহুল্য, আমাদের রাজনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, বিশৃংখলা এবং সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান বঞ্চনা এ দুটি ধর্মভিত্তিক শক্তির উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কারণ সাধারণ মানুষ শান্তি চায়, মুক্তি চায়, চায় সব অন্যায়ের অবসান।

গত দুই দশকের নির্বাচিত সরকারগুলোর অপরাজনীতি, হঠকারিতা, অদূরদর্শিতা, স্বার্থপরতা, অগণতান্ত্রিক আচরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যত ধ্বংসাবস্থা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বহুলাংশে অকার্যকর করে ফেলেছে। বস্তুত, সুশাসনবিবর্জিত ও নির্বাচনসর্বস্ব বিরাজমান এ ব্যবস্থা বর্তমানে ‘একদিনের গণতন্ত্রে’র রূপ নিয়েছে। এ ধরনের ‘মিনিমালিস্ট’ বা ন্যূনতম গণতন্ত্রও আজ চরম হুমকির মুখে। কারণ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলুপ্তির ফলে আগামী নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিরোধী দল বিএনপি ও তার মিত্ররা ইতিমধ্যেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের হুমকি দিয়েছে এবং এ নিয়ে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে সহিংস রূপ নিচ্ছে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধের দাবিতেও গত কয়েক মাসে জামায়াত-শিবির সারাদেশে ব্যাপক সহিংসতা সৃষ্টি করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত তিন মাসে ১৭১ জন খুন হয়েছেন। এ সময়ে ২৩০টি সহিংস ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬ হাজার ৪৯ জন। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের পর সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৩৭ জন। নিহতদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের ৪৪ জন, পুলিশ ৯ জন, গ্রামপুলিশ ১ জন, ৩ জন নারী, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মী ও সমর্থক ১০ জন এবং সাধারণ মানুষ ৭০ জন। এছাড়া দেশের ১০০টি উপজেলায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে। ওই সব হামলায় ৪২০টি মন্দির, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। উপরন্তু মার্চ মাসেই বিএনপি-জামায়াতের ডাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হরতাল হয়েছে ২৯টি (যুগান্তর, ২ এপ্রিল ২০১৩)।

এ ধরনের অব্যাহত সহিংসতা এবং বিরাজমান ভঙ্গুর ও অকার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বর্তমানে সারাদেশে এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। অস্থিতিশীলতা অনিশ্চিয়তার সৃষ্টি করে। আর অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে জনগণ তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে আতংকগ্রস্ত হয়। ব্যাহত হয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আমাদের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরোপুরিই ভেঙে পড়তে পারে, যা অগণতান্ত্রিক শক্তির ভবিষ্যৎ ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করবে। এ অবস্থায় বাংলাদেশে এমনকি জঙ্গিরাষ্ট্র কায়েমের আশংকাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণ আজ অতি জরুরি।

বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন হবে আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি ও শাসন প্রক্রিয়ার কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার এবং এগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজনীতিকদের ঐকমত্য ও সদিচ্ছা। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার বা ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার তথা ক্ষমতার রাজনীতিতে বিভোর রাজনীতিকরা এসব সংস্কারে আগ্রহী নন। সুতরাং সমাজের অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্টদের আজ সংস্কারের ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে ঐকমত্যে পৌঁছতে এবং এগুলো সম্পর্কে জনমত সৃষ্টি করতে হবে, যাতে রাজনীতিকরা এগুলো মানতে বাধ্য হন।

সম্ভাব্য পদ্ধতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার উদ্যোগের মাধ্যমে আজ নিশ্চিত করতে হবে যাতে- দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও অর্থবহ এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়; সংসদ কার্যকর এবং এর স্বাধীন সত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়; স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিকেন্দ্রীভূত, নিরপেক্ষ ও গণমুখী শাসন কায়েম হয়; গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ রাজনৈতিক দল সৃষ্টি হয়; দলীয় প্রভাবমুক্ত বিচারালয় প্রতিষ্ঠিত ও আইনের শাসন কায়েম হয়; দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ইত্যাদির মূলোৎপাটন হয়; সব সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ও কার্যকর হয়; মানবাধিকার নিশ্চিত হয়; ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত হয়; সমাজের সব স্তরে সমতা, ন্যায়পরায়ণতা ও অর্থনৈতিক সুশাসন কায়েম হয়; যুদ্ধাপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হয়; গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকে এবং একটি দলনিরপেক্ষ শক্তিশালী সিভিল সোসাইটি গড়ে ওঠে।

জরুরি ভিত্তিতে এ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় সংস্কার পদক্ষেপ না নেয়া হলে আমরা একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারি, যা বাংলাদেশে একটি উগ্রবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করতে পারে। এমন আশংকাকে ব্যর্থ করতে হলে নাগরিকদেরই আজ সক্রিয় ও সোচ্চার হতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে নাগরিকের অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

সূত্র: যুগান্তর, ২২ এপ্রিল ২০১৩
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s