সংঘাত, না সংলাপ?

main-logo.gif

সুবিধাবাদী হালুয়া-রুটির রাজনীতি আমাদের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকর। বহুদলীয় গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায়, সেই সংস্কৃতি কি আমাদের দেশের রাজনীতিতে এখনো গড়ে ওঠেনি? আমাদের এই দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে? এই দেশ কি উগ্রবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হবে? তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপদ্ধতি নিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনের উপায় কী? একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত কিভাবে সম্ভব? দেশে যে সংঘাতময় পরিস্থিতি চলছে, তারই বা সমাধান কোন পথে? দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উঠে আসা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর-প্রত্যুত্তর নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন-এর সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার

আমাদের রাজনীতিতে যে মেরুকরণের চেষ্টা হচ্ছে, এই মেরুকরণ আমাদের জন্য ভয়ানক ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। এটা আমাদের রাষ্ট্রকে মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলতে পারে। সম্প্রতি হেফাজত ইসলামের সহিংসতা, বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোটের রাজনৈতিক অবস্থান ও সরকারের ভূমিকা দেখে আমার তো মনে হয়, আমরা একটা অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছি। আমার মনে হয়, বিএনপির জামায়াতিকরণ হচ্ছে। যখনি বিএনপি কোনো দাবি তোলে কিংবা কোনো রকম প্রতিবাদ করে, তখনি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকানোর জন্য করা হচ্ছে এবং জামায়াতের দোসর হিসেবে তাদের চিহ্নিত করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকেই বিএনপিকে জামায়াতের কোলে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, এমনকি আমাদের দুই-একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তো বলেই ফেলেছেন যে খালেদা জিয়া জামায়াতে ইসলামের আমির! একই সঙ্গে বিএনপি নিজেও জামায়াতের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ ও একীভূত হয়ে যাচ্ছে এবং তার মূল কারণ হলো বিএনপির যে মূল দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, তাদের সেই দাবি আদায়ের জন্য তারা মনে করে জামায়াতের সহযোগিতা দরকার। সরকারের অনড় অবস্থা তাদের এই দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমার মনে হয়, আমাদের রাজনীতিতে একটা মেরুকরণ হচ্ছে। এটা আমাদের রাজনীতির জন্য অশুভ সংকেত প্রদান করে। সম্প্রতি হেফাজতের সমাবেশের দিনে আমাদের ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, জামায়াত, বিএনপি ও হেফাজত এক ও অভিন্ন। এর মাধ্যমে একটি মেরুকরণের চেষ্টা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। যে মেরুকরণের পরিণতি ভয়ানক হতে বাধ্য। কারণ হেফাজত-জামায়াত-বিএনপি যদি এক হয়ে যায় এবং তারা যদি উগ্রবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়, তাহলে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীদের পক্ষে কোনোভাবেই এ দেশকে মৌলবাদ কিংবা জঙ্গিবাদ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। তো আমার মনে হয়, এটা একটা অশুভ চেষ্টা ও অশুভ লক্ষণ। সরকার ও বিরোধী দলের এমন অনাস্থা আমাদের একটা ভয়ানক ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করতে পারে।

সরকারের আহ্বানে ১৮ দলীয় জোটের ২ মের ডাকা হরতাল প্রত্যাহার ও প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের প্রস্তাবনা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিরসনে যে আশার সঞ্চার ঘটিয়েছিল তা বাস্তবায়নের কিংবা উত্তরণের ব্যাপারে আশাবাদী হওয়াটা বড় দুরূহ। কারণ উভয় জোটেরই, বিশেষত, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান অনড়। বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে জিততেই হবে। কারণ নির্বাচনে জেতা মানে পাঁচ বছরের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা, অনেক অন্যায় করে পার পাওয়ার সুযোগ, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের সুযোগ ইত্যাদি। বলতে গেলে পাঁচ বছরের রাজত্ব। নির্বাচনে হারলে পাঁচ বছরের নির্যাতন-নিপীড়ন, মামলা-হামলা ইত্যাদি। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে জিততেই হবে- এ রকম একটা মানসিকতা আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। সংগত কারণেই বিএনপি মনে করে, কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হলেই তারা নির্বাচনে জিতবে। আর যদি তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসে, তাহলে তারা নির্বাচনে না-ও জিততে পারে বলে তাদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে। তেমনিভাবে আওয়ামী লীগও মনে করে যে তাদের সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে কিংবা তাদের সরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপ নিয়ে নির্বাচন করলে তারা জিতবে। এ অবস্থান থেকে সরে এলে তাদের নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা কম। মূলত এ কারণেই উভয় দল তাদের এই অবস্থান থেকে সরে আসতে চাইছে না। তারা তাদের বর্তমান অবস্থানে অনড়; কারণ তারা নির্বাচনে হারার ঝুঁকি নিতে চায় না। নির্বাচনে পরাজয়ের ঝুঁকি নেওয়া মানেই এর চরম মাশুল দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাওয়া। তাই তারা এই অনড় অবস্থানে স্থির এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনাটা অতি ক্ষীণ মনে হয় আমার কাছে।

সুবিধাবাদী ও হালুয়া-রুটির রাজনীতি আমাদের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকর। বহুদলীয় গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায়, একাধিক দল অবস্থান করবে এবং দলগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দেখিয়ে সহবস্থানে থাকবে, এই সংস্কৃতি আমাদের দেশের রাজনীতিতে এখনো গড়ে ওঠেনি। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম এবং উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এসব সমস্যা থেকে উত্তরণ ও সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ সৃষ্টি সম্ভব। আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে, এ দেশ কি উগ্রবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হবে, নাকি আমরা একটা গণতান্ত্রিক রূপ নেব- সেটাই আজকে আমাদের বড় প্রশ্ন। উগ্রবাদ ঠেকানোই আজকে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমি মনে করি। কারণ যেভাবে রাজনীতিতে মেরুকরণের চেষ্টা হচ্ছে, সেই মেরুকরণ থেকে আমরা উগ্রবাদকে ঠেকাতেই পারব না। তাই আমি মনে করি, আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে আমাদের আগামী নির্বাচনটা হওয়া দরকার। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং এই সংলাপের ব্যাপারে আমি মনে করি, শুধু বিএনপি, আওয়ামী লীগের মধ্যে সংলাপ হলে হবে না, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই সংলাপে যুক্ত করতে হবে। কারণ বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে যে তারা সমস্যা সৃষ্টিই করে আসছে; সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। তাই অন্য দলগুলোরও যুক্ত হওয়া দরকার। সংলাপে নাগরিকসমাজ, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম, সুশীলসমাজের সম্পৃক্ত হওয়া দরকার এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজকে আমাদের কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। একটা হলো, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে এবং দ্বিতীয়টি হলো, নির্বাচন-পরবর্তী কিছু করণীয় নির্ধারণ করতে হবে; যাতে এই অবস্থার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়, বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল হয় এবং আমাদের দলগুলোতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। আজকে যদি আমরা ওই ধরনের ঐকমত্যে পৌঁছতে পারি, যেটা আগামী নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় সেটা নিশ্চিত করবে, সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে যেটা করবে সেটা হলো নির্বাচনপরবর্তী সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কার্য নির্ধারণ করবে, যেটা পরবর্তী নির্বাচিত সরকার বাস্তবায়ন করবে। তাহলেই আমরা মৌলবাদ ঠেকাতে পারব এবং এখন মৌলবাদ ঠেকানোই আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মৌলবাদ ঠেকাতে পারলেই আমরা একটি সুখী সমৃদ্ধিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে পারব।

হঠাৎ রাজনীতিতে আমরা ধর্মের ব্যবহারের যে উল্লম্ফন দেখতে পাচ্ছি, সেটা নতুন কিছু নয়। ধর্মের ব্যবহার পাকিস্তান আমল থেকেই শুরু হয়েছে। সেটারই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে এবং এটা বাংলাদেশে বহুদিন ধরে চলে আসছে। যেমন ১৯৯৩ সালে আমাদের সংসদে আলোচনা হয়েছিল জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার এবং সবাই মিলে ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে থাকার প্রয়োজনে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতেই হবে, দরকার হলে বাঘের পিঠে চড়তে হবে- সেই মানসিকতার কারণেই এই উগ্রবাদী শক্তিকে আমাদের প্রধান দুটি দল পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। দুধ-কলা দিয়ে সাপ পুষেছি, এখন সে সাপ ফণা তুলছে এবং সে সাপ এখন কামড় দেওয়ার জন্য উদ্যত হয়েছে। এটা আমাদের অতীতের পাপেরই ফসল।
জাতি হিসেবে আমাদের যতটুকু অগ্রসর হওয়ার কথা, অর্থনৈতিকভাবে আমরা ততটা অগ্রসর হতে পারিনি আমাদের অপরাজনীতি, রাজনীতিতে দেউলিয়াপনা, সুবিধাবাদী ও হালুয়া-রুটির রাজনীতির কারণে। এখন এই ক্ষমতার রাজনীতির ধারা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে আমাদের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়বে এবং আমরা দারুণ সংকটের মধ্যে পড়ব। আমাদের বেকার তরুণদের কর্মসস্থান দরকার, আমাদের অর্থনীতি যদি পঙ্গু হয়ে পড়ে তাহলে রাজনৈতিকভাবে আমরা আরো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ব। কারণ এই তরুণরাই আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। কারণ তাদের যদি কোনো অর্থবহ কাজের সঙ্গে জড়িত হওয়ার সুযোগ না থাকে, তাহলে তারা ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত হবে। আমাদের জন্য এটা অবশ্যই একটা অশনি সংকতে। আমাদের জন্য এক অনিশ্চত ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে, যদি আমাদের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকে।

গার্মেন্ট শিল্পে অগ্নিকাণ্ড-ধস, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি আমরা লক্ষ করছি, তা আমাদের নষ্ট রাজনীতিরই ফসল। আমাদের দেশে ব্যবসাকে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে, ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ হয়েছেন আর রাজনীতিবিদরা ব্যবসায়ী; যার ফলে দুটোর কোনটিই ভালো চলছে না। এই নষ্ট রাজনীতির কাজ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফায়দা দেওয়া। নষ্ট রাজনীতির বাহন হচ্ছে দলতন্ত্র, ফায়দাতন্ত্র। আমাদের দেশে দলবাজি, ফায়দাবাজি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি চারদিকে ব্যাপক ও প্রখর। এসব ক্ষেত্রে তারা অনেকেই অন্যায় করে পার পেয়ে যায় ক্ষমতাসীন দলের দলতন্ত্রের কারণে। দেশ আজ বাজিকর, ফায়দাবাজ, দলবাজ-চাঁদাবাজ ইত্যাদি অশুভ শক্তির হাতে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যারা জড়িত তারা বিভিন্ন রকম অন্যায় ফায়দা পায় এবং দলবাজির কারণে তারা বিভিন্ন রকম অন্যায় করে পার পেয়ে যায়। এখন আমাদের রাজনীতিতে যদি গুণগত পরিবর্তন না আসে, তাহলে কিন্তু আমরা এ থেকে মুক্তি পাব না। বাজিকর রানার কথা যদি বলতে হয়, তবে বলব, এ রানা কিন্তু একা নয়, সারা দেশে হাজার হাজার রানা রয়েছে, যাদের তাণ্ডব সারা দেশে চলছে। তারা দেশকে অস্থিতিশীল করছে, আমাদের সুশাসনকে পরাহত করছে এবং এগুলো আমাদের সুস্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতি পদে পদে বঞ্চিত হচ্ছে। এখনই আমাদের নষ্ট রাজনীতি ঠিক না হলে আমরা কিন্তু এসব থেকে মুক্তি পাব না।

অনুলিখন : শাহরিয়ার রহমান সুপ্ত

সূত্র: কালেরকণ্ঠ, ১৪ মে ২০১৩

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s