কার সংলাপ, কী নিয়ে সংলাপ?

prothom-alo-logo_v4

বদিউল আলম মজুমদার | তারিখ: ২১-০৫-২০১৩

আমাদের নাগরিকদের পক্ষ থেকে অনেক দিন ধরেই সংলাপের মাধ্যমে বিরাজমান রাজনৈতিক বিবাদ মেটানোর দাবি উচ্চারিত হয়ে আসছে। এ দাবির উদ্দেশ্য হলো সবার অংশগ্রহণে যথাসময়ে নিরপেক্ষতার সঙ্গে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং এর মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার রদবদল নিশ্চিতকরণ। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের সামপ্রতিক বাংলাদেশ সফর যেন এ দাবির পালে নতুন করে হাওয়া জুগিয়েছিল, যদিও তা দ্রুতই বিলীন হয়ে যায়। তবু আমরা আশাবাদী হতে চাই যে সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হবে। কারণ, সংলাপের বিকল্প সংঘাত ও সম্ভাব্য অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: কাদের মধ্যে সংলাপ এবং কী নিয়ে সংলাপ?
কী উদ্দেশে সংলাপ অনুষ্ঠান, তার ওপর নির্ভর করবে সংলাপের বিষয় বা এজেন্ডা। একই সঙ্গে সংলাপের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করবে কাদের মধ্যে সংলাপ হওয়া প্রয়োজন। আমরা মনে করি যে সংলাপের মাধ্যমে কতগুলো মৌলিক বিষয়ে জাতীয় মতৈক্য সৃষ্টি এবং এর ভিত্তিতে একটি ‘জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষরিত হওয়া আবশ্যক। এ সনদটি প্রণীত হতে পারে ১৯৯০ সালের তিন জোটের—পনেরো, সাত ও পাঁচদলীয়—রূপরেখার আদলে।

জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে—যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে—চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের ৪২ বছর পরও আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথের বাধাগুলো দূর করতে পারিনি। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ আজ আমাদের দেশে হুমকির মুখে। সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিবর্তে বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা একটি অসম সমাজ আমরা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছি। আজ সময় এসেছে সংলাপের মাধ্যমে এসব বিষয়ে জাতীয় মতৈক্য সৃষ্টি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের।

তাই আমরা মনে করি যে সংলাপের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মোটা দাগে দুটি: ১. আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা; এবং ২. সব সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা, যাতে ভবিষ্যতে এগুলোর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। প্রসঙ্গত, সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে, আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ হলেও, নির্বাচনের পরপরই আবারও গুরুতর অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে এবং আমরা শাসনের অযোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে যেতে পারি।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে ‘নির্বাচন-পূর্ব কিছু করণীয়’ এবং ‘নির্বাচনের সময়ে কিছু করণীয়’ চিহ্নিত করে মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য অবশ্য নির্বাচন-পরবর্তী কিছু করণীয়ও চিহ্নিত করে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।

নির্বাচন-পূর্ব করণীয়
নির্বাচন-পূর্ব করণীয় বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে—দলীয় সরকার, না অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, না নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার—সিদ্ধান্ত গ্রহণ। তবে সামপ্রতিক জনমত জরিপ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে নাগরিকদের ৯০ শতাংশই মনে করে যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যতীত নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান অসম্ভব (প্রথম আলো, ১১ মে ২০১৩)। এ ছাড়া ‘কোনো সরকার যদি জানে যে নির্বাচনের সময় তাকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে, তাহলে সেই সরকার নির্বাচনের আগে যেসব ওয়াদা করবে, তা পালন করবে’ (শেখ হাসিনা, দারিদ্র্য দূরীকরণ: কিছু চিন্তাভাবনা, ১৯৯৫)।

দ্বিতীয় নির্বাচন-পূর্ব গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো, নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন ও শক্তিশালীকরণ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
আরেকটি নির্বাচন-পূর্ব করণীয় হলো নির্বাচনী আইনকানুনের কিছু পরিবর্তন; বিশেষত, প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠি এবং প্রার্থীদের তথ্য প্রদানের বিধানকে আরও কঠোরতরকরণ। এসব বিষয়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই সবার জন্য একটি সমতল ক্ষেত্র এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে।

নির্বাচনকালীন করণীয়
নির্বাচনকালীন একটি আচরণবিধি প্রণয়ন আবশ্যক, যা সবাই মেনে চলবে। এটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে নব্বইয়ের তিন জোটের রূপরেখায় অন্তর্ভুক্ত আচরণবিধিটি কাজে লাগানো যেতে পারে। ওই আচরণবিধিতে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে মোটা দাগে নয়টি অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। অঙ্গীকারগুলো ছিল: শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর, সংঘাত পরিহার করার, পারস্পরিক কুৎসা রটনা থেকে বিরত থাকার, সামপ্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় না দেওয়ার, প্রশাসনকে প্রভাবিত না করার, সরকারি প্রচারমাধ্যমের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার, সব বিরোধ তাৎক্ষণিকভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করার, নির্বাচনের দিনে সব কারচুপি ও দুর্নীতির অবসান করার, নির্বাচনী ব্যয়সীমা মেনে চলার, নির্বাচনের মাধ্যমে প্রদত্ত গণরায় মেনে নেওয়ার ইত্যাদি।

গত ২৩ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে নির্বাচনকালীন মেনে চলার জন্য আরও কয়েকটি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে অঙ্গীকার আবশ্যক। যেমন, দলগুলো মনোনয়ন-বাণিজ্যে নিয়োজিত হবে না, টাকা দিয়ে ভোট কিনবে না এবং দলের নেতা-কর্মীদের সুপারিশের ভিত্তিতে মনোনয়ন প্রদান করবে না। কারণ, আজ আমাদের হয়ে গেছে টাকা দিয়ে কেনা যায় সে রকম ‘উত্তম’ গণতন্ত্র। দলগুলোকে সুস্পষ্টভাবে আরও অঙ্গীকার করতে হবে যে তারা দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, দখলদার, কালোবাজারি, কালোটাকার মালিক, সন্ত্রাসী, ধর্ম ব্যবসায়ী, যুদ্ধাপরাধীদের মতো অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের মনোনয়ন প্রদান থেকে বিরত থাকবে। এ ছাড়া তারা সব নির্বাচনী আইনকানুন মেনে চলবে।

নির্বাচন-পরবর্তী করণীয়
নির্বাচন-পরবর্তী করণীয়গুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে নিচের অঙ্গীকারসমূহ: (ক) সংসদকে সত্যিকারের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলে ও কার্যকর করে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। (খ) গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা হবে। (গ) স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারালয় গড়ে তোলার লক্ষ্যে অযোগ্য, অদক্ষ ও পক্ষপাতদুষ্ট বিচারকদের অপসারণ করা হবে। ভবিষ্যতে নিয়োগের জন্য একটি আইন প্রণয়ন করা হবে। নিম্ন আদালতের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সত্যিকারার্থেই বিচার বিভাগকে পৃথক্করণ করা হবে। (ঘ) দুর্নীতি দমন কমিশনকে একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করা হবে। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে দক্ষ ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে পুনর্গঠন ও কার্যকর করা হবে। (ঙ) প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হবে। (চ) একটি বলিষ্ঠ বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে স্বায়ত্তশাসিত, শক্তিশালী ও কার্যকর এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ (যেমন, জাতীয় বাজেটের ৪০ শতাংশ) ও ক্ষমতা এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। (ছ) সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসমপন্ন কমিটি গঠন করা হবে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনপদ্ধতিতে পরিবর্তন (যেমন, সাংসদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ইলেকটোরাল কলেজ গঠন), সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের পুনর্মূল্যায়ন, রাষ্ট্রপতি পদের মতো প্রধানমন্ত্রী পদের জন্যও দুই মেয়াদ সীমিতকরণ, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির প্রচলন, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিধান, নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ সংসদীয় আসন সংরক্ষিত করে রোটেশনের ভিত্তিতে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে এগুলো পূরণ করা, গণভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তন ইত্যাদি হতে পারে কমিটির কার্যপরিধির অংশ। কমিটির সুপারিশগুলো সংসদে পাসের পর সেগুলো গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদন করা যেতে পারে। (জ) বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূল্যবোধের আলোকে রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত এবং পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তথা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা হবে। রাজনৈতিক দলগুলো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত করা ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান থেকে বিরত থাকবে। (ঝ) গণমাধ্যমের ওপর সব নিবর্তনমূলক বিধিনিষেধের অবসান ঘটিয়ে এর স্বাধীনতা পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত করা হবে।

ফায়দাতন্ত্র ও হুমকি-ধমকির অবসান ঘটিয়ে দলনিরপেক্ষ সিভিল সোসাইটি গড়ে ওঠার পথকে সুগম করা হবে। (ঞ) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রচলিত ব্যবস্থার সংস্কার করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। জাতীয় সমপদে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা হবে।

এটি সুস্পষ্ট যে আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে আসন্ন নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করার পাশাপাশি অন্য সব আনুষঙ্গিক সমস্যার আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে হবে। আর তাহলেই আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের, ধর্মনিরপেক্ষতাকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর এবং দেশে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। এ জন্য অবশ্য প্রয়োজন হবে দুই প্রধান দলের—আওয়ামী লীগ ও বিএনপির—বাইরেও বৃহত্তর পরিসরে সংলাপ অনুষ্ঠানের এবং কতগুলো বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছার, যে মতৈক্যের ভিত্তিতে একটি জাতীয় সনদ প্রণীত এবং স্বাক্ষরিত হবে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়াও এ সংলাপে অন্যান্য রাজনৈতিক দল, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনের মূল চেতনাকে ধারণ করে, ব্যবসায়ী সমপ্রদায়, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ আবশ্যক। সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে নব্বইয়ের মতো অন্যদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

সূত্র: প্রথম আলো, ২১ মে ২০১৩

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s