চাই সংসদ সদস্য আচরণ আইন

prothom-alo-logo_v4

বদিউল আলম মজুমদার

‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাংসদ তথা রাজনীতিবিদদের জন্য ‘একটি সর্বসম্মত আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণের’ সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়েছে। আরও অঙ্গীকার করা হয়েছে সাংসদ ও সব ক্ষমতাধরের এবং তাঁদের পরিবারের বার্ষিক সম্পদের হিসাব প্রকাশ করার। বস্তুত, দিনবদলের সনদে এই অঙ্গীকার দুই-দুবার ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শপথ গ্রহণের ৩০ দিনের মধ্যে সাংসদদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, কোনো দলই কথা রাখেনি এবং সাংসদদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেনি।

নির্বাচনী অঙ্গীকার সত্ত্বেও গত পৌনে পাঁচ বছরে সাংসদদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়নের ব্যাপারে সরকার কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। তবে আমরা আনন্দিত হয়েছিলাম যে ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী বেসরকারি বিল হিসেবে ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ সংসদে উত্থাপন করেছেন।

বিলটি আইন হিসেবে পাসের সপক্ষে কমিটির সুপারিশে বলা হয়: ‘জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে মাননীয় সংসদ সদস্যদের অবস্থান মর্যাদাপূর্ণ। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং দেশের উন্নয়নে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অপরিসীম। সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের পাশাপাশি জনগণের নিকট জবাবদিহিতার বাধ্যবাধকতা থাকলে সংসদ সদস্যদের সম্মান ও মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পাবে। তাই পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্রে যেমন, ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্স, ভারতীয় লোকসভা ও রাজ্যসভা, কানাডিয়ান পার্লামেন্ট এবং সাউথ আফ্রিকান পার্লামেন্টে সংসদ সদস্যদের জন্য Code of Conduct রয়েছে। জনগণের প্রতি সংসদ সদস্যদের যে দায়দায়িত্ব রয়েছে, তার প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশেও এরূপ একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা আছে। সংসদের ভেতরে মাননীয় সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে কার্যপ্রণালি বিধিতে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান থাকলেও সংসদের বাইরে মাননীয় সংসদ সদস্যদের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে বিধিবদ্ধ কোনো আইন নেই … জনগণ তাদের প্রতিনিধির কাছে দেশের উন্নয়ন ও ভালো আচরণ প্রত্যাশা করে। আমরা মাননীয় সংসদ সদস্যগণ যদি সংসদে কুরুচিপূর্ণ, অশালীন, আক্রমণাত্মক ও অসংসদীয় বাক্য বিনিময় করি, তাতে জনসম্মুখে আমরা নিজেরাই হেয় প্রতিপন্ন হই। এইরূপ আচরণে এক কেজি চাল, আটা বা একজন গরিব মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসা বা একজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয় না। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির নিয়ত অনুশীলন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের মর্যাদা সমুন্নত করা সম্ভব।’

বহুদিনের সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার অভিজ্ঞতার আলোকে সাংসদদের আচরণের একটি মানদণ্ড ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘কমিটি অন স্ট্যান্ডার্ড ইন পাবলিক লাইফ’ তার পঞ্চম প্রতিবেদনে সাতটি এমন মানদণ্ড চিহ্নিত করেছে। মানদণ্ডগুলো হলো: নিঃস্বার্থতা, সত্যনিষ্ঠতা বা সাধুতা, বস্তুনিষ্ঠতা, দায়বদ্ধতা, উন্মুক্ততা বা মুক্তমনা ও নেতৃত্ব। এ ছাড়া ভারতীয় লোকসভার সদস্যদের জন্য প্রণীত আচরণবিধিতে আরও দুটি মানদণ্ড যুক্ত করা হয়: জনস্বার্থ ও দায়িত্ব।

এসব মানদণ্ডের আলোকে প্রণীত প্রস্তাবিত বিলটিতে ১৫টি ধারা রয়েছে, যেগুলো হলো ধারা-১: সংক্ষিপ্ত শিরোনাম; ধারা-২: সংজ্ঞা; ধারা-৩: সংসদ সদস্যগণের নৈতিক অবস্থান; ধারা-৪: সংসদ সদস্যগণের দায়িত্ব; ধারা-৫: স্বার্থগত দ্বন্দ্ব ও আর্থিক তথ্য; ধারা-৬: ব্যক্তিস্বার্থে আর্থিক প্রতিদান; ধারা-৭: উপঢৌকন বা সেবা; ধারা-৮: সরকারি সম্পদের ব্যবহার; ধারা-৯: গোপনীয় তথ্যের ব্যবহার; ধারা-১০: বাকস্বাধীনতা; ধারা-১১: সংসদ সদস্য বা জনগণকে বিভ্রান্ত ও ভুল পথে চালিত না করা; ধারা-১২: পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহিষ্ণুতা; ধারা-১৩: নৈতিক কমিটি ও আচরণ আইনের প্রয়োগ; ধারা-১৪: আইন লঙ্ঘনের শাস্তি; ধারা-১৫: নৈতিকতা কমিটির কার্যকাল।

এসব ধারার কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধারা-৪ অনুযায়ী: (১) সংসদ সদস্যগণ কার্যপ্রণালি-বিধি অনুযায়ী চলবেন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজে কোনো সুপারিশ করবেন না। (২) নিজ বা পরিবারের সদস্যরা আর্থিক বা বস্তুগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবেন না। (৩) তাঁরা এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না, যাতে তাঁদের সংসদীয় দায়িত্ব প্রভাবিত হতে পারে।

ধারা-৫ অনুসারে সংসদ সদস্যগণ নিজের বা অন্যের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে অবৈধ ও অসৎ পথ অবলম্বন করবেন না। তাঁরা নিজের ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব, আয় ও সম্পদের উৎসসংক্রান্ত তথ্য সংসদ কর্তৃক নির্ধারিত ছকে সংসদ শুরুর প্রথম অধিবেশনের মধ্যে প্রকাশ করবেন। তাঁরা সরকারি বা বেসরকারি খাতে কোনো প্রকার নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, জ্যেষ্ঠতা বা অন্য কোনো সিদ্ধান্তে সুবিধা পেতে ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না। সরকারি ক্রয়-বিক্রয়, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সরকারি নীতিনির্ধারণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত বা দলীয় প্রভাব বা স্বার্থ অর্জন থেকে বিরত থাকবেন। বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠার পথে কোনো প্রকার অন্তরায় সৃষ্টি করবেন না।

ধারা-৬ অনুযায়ী জনপ্রতিনিধি হিসেবে ভূমিকা পালনে সংসদ সদস্যগণ জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে প্রাধান্য দেবেন এবং আর্থিক প্রতিদান বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশ্যে সংসদ বা এর কোনো কমিটিতে কোনো বিষয় উত্থাপন, কোনো বিল বা প্রস্তাবের পক্ষে ভোটদান অথবা প্রশ্ন উত্থাপন করবেন না।

এ ছাড়া ধারা-৭-এ স্বার্থগত দ্বন্দ্ব রয়েছে অথবা দায়িত্ব পালনে প্রভাবান্বিত করতে পারে এমন ধরনের কোনো উপঢৌকন সদস্যদের গ্রহণের ওপর বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পরবর্তী ধারায় সাংসদ হিসেবে প্রাপ্ত বিশেষ সুবিধাসমূহ কোনো অবস্থাতেই আর্থিক উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করার কথা বলা হয়েছে। ধারা-৯-এ সাংসদ হিসেবে তথ্য অধিকার আইন বা অন্য কোনোভাবে জনগণকে জানানো যাবে না এমন কোনো গোপনীয় তথ্য অবগত হলে ব্যক্তিস্বার্থে তা ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ধারা-১১তে সাংসদদের জ্ঞাতসারে সংসদ বা জনগণকে বিভ্রান্ত ও ভুল পথে চালিত না করার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো ভুল বক্তব্য দিয়ে থাকেন, তবে স্বপ্রণোদিতভাবে যত দ্রুত সম্ভব তা সংসদীয় নথিতে সংশোধন করতে বাধ্য থাকবেন।

কমিটি প্রস্তাবিত বিলের ধারা-১২ বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। এ ধারাতে বলা হয়েছে: সংসদের পবিত্রতা, সম্মান ও ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতে সংসদ সদস্যগণ পরমতসহিষ্ণু এবং ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন। সংসদ অধিবেশনে সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী আচরণ করবেন। সংসদে আলোচনা বা বক্তব্য উপস্থাপনে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুৎসামূলক বক্তব্য, অযাচিত সমালোচনা বা স্তুতি, কটু বা অশ্লীল ভাষা এবং অসৌজন্যমূলক অঙ্গভঙ্গি সচেতনভাবে পরিহার করবেন।

ধারা-১৩ ও ১৪তে প্রস্তাবিত আইনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে স্পিকারের নেতৃত্বে সব দলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সমন্বয়ে নয়জন সাংসদের দ্বারা একটি সংসদীয় ‘নৈতিকতা কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যেকোনো ব্যক্তি ১৩ ধারায় গঠিত কমিটির গোচরে অভিযোগ আনতে পারবেন। অথবা নৈতিকতা কমিটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে অভিযোগ বিবেচনায় নিতে পারবে। কোনো সংসদ সদস্য আইন লঙ্ঘন করলে নৈতিকতা কমিটি যেরূপ বিবেচনা মনে করবে, সেরূপ শাস্তি-সম্পর্কিত রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপন করবে। অভিযুক্ত সংসদ সদস্য কমিটির যেকোনো নির্দেশ পালনে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন।

বিলটির সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো যে এতে সুস্পষ্ট কোনো শাস্তির বিধান নেই, যার কারণে আইনের বাধানিষেধগুলো মানা সংসদ সদস্যদের জন্য ঐচ্ছিক হিসেবে বিবেচিত হবে, বাধ্যতামূলক নয়। তাই প্রয়োজনীয় সংশোধনী ছাড়া বিলটি পাস করলে এর থেকে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। সুতরাং আমরা সুস্পষ্ট শাস্তির বিধানসহ আইনটি পাস করার জোর দাবি জানাই। প্রসঙ্গত, ভারতীয় আচরণবিধিতে আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য সংসদ সদস্যদের ভর্ৎসনা, তিরস্কার, সংসদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত, এমনকি বহিষ্কার করারও বিধান রয়েছে।

আমরা প্রস্তাবিত বিলের ১২ ধারাটি পুনঃস্থাপনেরও দাবি জানাই। দাবি জানাই, দিনবদলের সনদে প্রদত্ত অঙ্গীকার অনুযায়ী ‘প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশ’ করার। একই সঙ্গে দাবি জানাই সংসদ সদস্যদের কার্যপরিধি সংসদীয় কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার। বিশেষত তাঁদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে উপদেষ্টার ভূমিকা ও হস্তক্ষেপের অবসান আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। একইভাবে জরুরি হয়ে পড়েছে অন্যায় ও বৈষম্যমূলকভাবে তাঁদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি ও আবাসিক এলাকায় প্লট প্রাপ্তির সুযোগের অবসানের। আরও জরুরি হয়ে পড়েছে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতির ইতি টানার।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

প্রকাশিত: প্রথম আলো, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s