আসন্ন নির্বাচন, সংখ্যালঘু সম্পদ্রায়ের নিরাপত্তা এবং করণীয় শীর্ষক সুজন এর নাগরিক সংলাপ

SAM_5613নির্বাচন এলেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। এই আতঙ্কের বড় কারন অতীত নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি না করা। এই আতঙ্ক বৃদ্ধি পাওয়ার আর একটি বড় কারন হচ্ছে সামপ্রতিককালে পাবনার সাঁথিয়া, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও মহেন্দ্রনগর এবং বরিশালের চর কাউয়ার কালা গ্রামে বিভিন্ন অজুহাতে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা।
অথচ সংখ্যালঘুসহ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আইনগত বাধ্যবাদকতা রয়েছে জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষার। সকল মানুষকে রক্ষা করার জন্য জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলসমূহের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। সামাজিক নেতৃবৃন্দ তথা সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের রয়েছে এ সংক্রান্ত সামাজিক দায়বদ্ধতা। কিন্তু আমরা ব্যর্থ হচ্ছি সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে।  

আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কিছু ভ্রান্ত ধারণা আছে। যেমন, হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভোট মানেই একটা বিশেষ জনগোষ্ঠীর ভোট, এরকম একটা ধারণা আছে। এ ধারণার উপর ভিত্তি করে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার জনগোষ্ঠী নির্বাচনের সময় অহেতুক হুমকি-ধামকির সম্মুখিন হয়। তাদের ভোট পাওয়া যাবে না বলে ধারণা করে তাদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা প্রদান করা হয়। যাদের ভোট পাওয়া যাবে না বলে ধারনা করা হয় তাদের বল প্রয়োগ করে ভোট কেন্দ্র থেকে বিতাড়ন করা হয়। ভোটে হেরে গেলে সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এ অপরাজনীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের।
মানুষের এই নিরাপত্তাহীনতার অবসানে সচেতন নাগরিকদেরকে সংঘবদ্ধভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতিরোধ করতে হবে। প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে দুস্কৃতিকারীদের প্রতিরোধ করতে হবে। রাজনৈতিক দলসহ সাধারন নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এ সমস্যার সমাধানে সহায়ক হবে।

এ লক্ষ্যে সুজন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের মধ্যে আস্থা সৃষ্টিসহ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সচেতন জনগোষ্ঠী এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সংলাপ করেছে। সংলাপ পরিচালনা করেন সুজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।

গৌরনদী, বরিশাল
‘আসন্ন নির্বাচন: নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য’ শিরোনামে প্রথম নাগরিক সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয় ২৯ নভেম্বর ২০১৩ সকাল ১০.০০টায় গৌরনদী উপজেলা সদরের কারিতাস মিলনায়তনে। ২৫০ জনের উপসি’তিতে নারী ছিলেন ১৫%। এতে সভাপতিত্ব করেন সুজন গৌরনদী উপজেলার সভাপতি সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম জহির।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপসি’ত ছিলেন সুজন কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও বরিশাল জেলা কমিটির সভাপতি জনাব আক্কাস হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপসি’ত ছিলেন গৌরনদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম। অন্যান্যের মধ্যে উপসি’ত ছিলেন সুজন বরিশাল জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজল ঘোষ, সুজন বরিশাল মহানগরী কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুশান- ঘোষ ও গৌরনদী প্রেসক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ।

রামপাল, বাগেরহাট
৬ ডিসেম্বর ২০১৩ সকাল ১০ টায় বাগেরহাটের রামপাল ডিগ্রী কলেজে ’আসন্ন নির্বাচন, সংখ্যালঘু সম্পদ্রায়ের নিরাপত্তা এবং করণীয়’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সমপ্রদায়ের ১২৭ জন অংশ নেন এ সংলাপে যেখানে ৫৫% নারী উপসি’ত ছিলেন। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন স’ানীয় সুজন সভাপতি অধ্যাপক আকবার আলী।

অতিথি হিসেবে উপসি’ত ছিলেন এবং বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তযোদ্ধা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ আবদুল জলিল, অধ্যক্ষ মজনুর রহমান, এডভোকেট মহিউদ্দীন শেখ, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা দিলারা খানম, প্রধান শিক্ষক শেখ আ. মান্নান, প্রভাষক মো. বজলুর রহমান, কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ ’র খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী এস এম ইকবাল হোসেন রিপন, এম এ সবুর রানা, নারী নেত্রী হোসনে আরা মিলি, আলহাজ্ব শেখ আহম্মদ আলী, প্রভাষক গোলাম ইয়াছিন, প্রভাষক আ. হান্নান, মো. বাকী বিল্লাহ, এনজেল মৃধা, শেখ আফজাল হোসেন, প্রভাষক মোস্তফা কামাল পলাশ, শাহনেওয়াজ হোসেন, জ্যেতির্ময় প্রবীর বিশ্বাস, মিলন মন্ডল, তাসলিমা বেগম, কৃষ্‌ন রানী, মনির হোসেন, শাহনাজ সুলতানা  প্রমুখ।

SAM_5632মংলা, বাগেরহাট
৭ ডিসেম্বর ২০১৩ সকালে মংলা প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় সংলাপ। ১০০ জনেরও অধিক সচেতন নাগরিক এ নাগরিক সংলাপে অংশ নেন যেখানে নারীর উপসি’তি ছিল ২০% এর বেশি। আয়োজনে সভাপতিত্ব করেন সুজন মংলার সভাপতি ফ্রান্সিস সুদান হালদার।
এ সংলাপে মতবিনিময় করেন উপজেলা চেয়ারম্যান মো. ইদ্রিস আলী, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মিসেস কামরুন্নাহার হাই ও মংলা থানা অফিসার ইনচার্জ মো. আমিনুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা নিখিল চন্দ্র রায়, বিএনপি নেতা খলিলুর রহমান, মাহবুবুর রহমান মনির, প্যানেল মেয়র বাবুল চৌধুরী, সাংবাদিক এম এ মোতালেব, পুজা উদযাপন পরিষদের পান্না লাল দে, উপাধ্যক্ষ বিভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, গণশিল্পী সংস’ার সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক অফিসার মো. সোহাগ, গঠন’র নির্বাহী পরিচালক সুশান- রায়, কলতান শিল্পী গোষ্ঠীর জেমস শরৎ কর্মকার, মানবাধিকার কর্মী সুমী লীলা, সুজন মংলার সম্পাদক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. নূর আলম শেখ প্রমুখ।

বটিয়াঘাটা, খুলনা
৮ ডিসেম্বর ২০১৩ সকালে খুলনার বটিয়াঘাটা ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় সংলাপ। নাগরিক সংলাপে সমাজের বিভিন্ন স-রের ৬৪ জন নাগরিক অংশগ্রহণ করেন। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বটিয়াঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনোরঞ্জন মন্ডল।

মত বিনিময় করেন বটিয়াঘাটা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বাবু নিতাই গাইন ও ভগবতী গোলদার, জলমা ইউনিয়নের সুজন সভাপতি শানি-ময় দত্ত, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নির্মেলেন্দু বিম্বাস। বক্তব্য রাখেন সিপিবি বটিয়াঘাটা সম্পাদক অশোক কুমার সরকার, নদী রক্ষা কমিটির সংগঠক বিভাস মন্ডল, মুক্তিযোদ্ধা মৃণাল বিশ্বাস, উৎপল বিশ্বাস, শ্রমিক লীগ নেতা অলোক মল্লিক, ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি তন্ময় সরকার, সম্পাদক গৌর দাস বিশ্বাস, সিপিবি সভাপতি স্বপন কুমার মহালদার, নারী নেত্রী শিখা বিশ্বাস, আওয়ামী লীগ নেতা হাদীউজ্জামান হাদী।

আগৈলঝাড়া, বরিশাল
১৩ ডিসেম্বর ২০১৩ সকাল ১০ টায় বরিশালের আগৈলঝাড়া সদর মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় সংলাপ। ৭৯ জন সচেতন নাগরিক অংশ নেন সংলাপে যেখানে ২০% নারী উপসি’ত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন আগৈলঝাড়া সুজন এর সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক সরদার।

মতবিনিময় করেন আগৈলঝাড়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিন সরদার, মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রইছ সেরনিয়াবাত, জহুরুল ইসলাম জহির, শিক্ষাবিদ নীলকান- বেপারী ও দয়ানিধি বিশ্বাস, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল হোসেন লাল্টু, দিনেশ চন্দ্র হালদার, মো. আবদুল্লাহ লিটন, জেমস প্রদীপ রায়, আবদুল হালিম, হরে কৃষ্‌ন রায় পলাশ, ফখরুল আজম, দীনেশ চন্দ্র ঘটক, আভা মুখার্জী, আজাদ রহমান, অমল সরকার প্রমুখ।

সংলাপে উঠে আসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অভিমত

* সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দল-মত নির্বিশেষে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ৭১ এ স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিল অথচ বর্তমানে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের বাড়িতে হামলা করছে যা অগ্রহণযোগ্য;
* সংখ্যালঘু ইস্যুতে ছোট কোনো ঘটনাকেও অনেক সময় মিডিয়া বড় করে প্রচার করে। তখন ঘটনাটি বড় আকার ধারণ করে। তাই এ ব্যাপারে মিডিয়াকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে;
* সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন প্রতিরোধে সুজনের নেতৃত্বে সারাদেশে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি করতে হবে;

*নাগরিক হিসেবে আমরা কাকে ভোট দিবো সে অধিকার আমাদের রয়েছে। তাই এ অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয় তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
* কোনো ধর্মেই কারও অনিষ্ট করার কথা বলা হয়নি। ইসলাম ধর্মের নবী হযরত মোহাম্মদ সাঃ বিদায় হজ্বের ভাষণে অমুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার করার কথা বলেছেন যা আমরা বুলে যেতে বসেছি;
* সংবিধান অনুযায়ী সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি অটুট রাখতে হবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s