‘দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীগণের তথ্য প্রকাশ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

Press conf. 02.01.14‘আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যগণ তাদের বেতন ছাড়া অন্য কোনো আয় বৃদ্ধিমূলক কাজের সাথে যুক্ত হতে পারবেন না এবং কোনো লাভজনক পদে আসীন হতে পারবেন না। অথচ আমাদের অনেক সংসদ সদস্য ব্যবসায়িক উদ্যোগের সাথে জড়িত থেকে তাঁদের সম্পদ বাড়িয়েছেন, যা সংবিধান সম্মত নয়।’ আজ সকাল (২ জানুয়ারি ২০১৪) ১১.০০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সুজন নেতৃবৃন্দ এ মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুজন নির্বাহী সদস্য কাজী এবাদুল হক, সুজন জাতীয় কমিটির সদস্য ড. শাহদীন মালিক,সুজন নির্বাহী সদস্য ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সুজন নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক অজয় রায়, সুজন ঢাকা জেলা কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মুজবাহ আলীম ও সুজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আগামী ৫ জানুয়ারি, ২০১৪ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন ১৫৩ জন প্রার্থী। অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে সর্বমোট ৩৯০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সে অনুযায়ী, ৩০০ নির্বাচনী এলাকার সর্বমোট প্রার্থীর সংখ্যা ৫৪৩ জন।’

তিনি বলেন, ‘প্রার্থীগণ কর্তৃক প্রদত্ত হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, ‘শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে ৫৪০ জন (৫৪৩ জনের মধ্যে তিন জন প্রার্থীর হলফনামা পাওয়া যায়নি) প্রার্থীর মধ্যে অধিকাংশই (৩৮২ জন বা ৭০.৭৪%) স্নাতক বা স্নাতকোত্তর। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য অপেক্ষমান ১৫৩ জন প্রার্থীর মধ্যে এই হার ৮২.৩৫% (১২৬ জন) এবং ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩৮৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬৬.১৪% (২৫৬ জন)। ৫৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে স্বল্প শিক্ষিত অর্থাৎ এসএসসি বা তার চেয়ে কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীর হার ১৭.২২% (৯৩ জন)। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য অপেক্ষমান ১৫৩ জন প্রার্থীর মধ্যে এই হার ৫.২২% (৮ জন) এবং ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩৮৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ২১.৯৬% (৮৫ জন)।’

সুজন সম্পাদক বলেন, ‘৫৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে অধিকাংশের পেশা (৫২.২২% বা ২৮২ জন) ব্যবসা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য অপেক্ষমান ১৫৩ জন প্রার্থীর মধ্যে এই হার ৫২.৯৪% (৮১ জন) এবং ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩৮৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫১.৯৪% (২০১ জন)।

প্রার্থীদের মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘৫৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫৯ জনের (১০.৯২%) বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা আছে, অতীতে মামলা ছিল ১৯৪ জনের (৩৫.৯২%) বিরুদ্ধে, অতীত ও বর্তমানে উভয় সময়ে মামলা ছিল বা রয়েছে এমন প্রার্থীর সংখ্যা ২৯ জন (৫.৩৭%)। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান ১৫৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ২২ জনের (১৪.৩৭%) বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা আছে, অতীতে মামলা ছিল ৮১ জনের (৫২.৯৪%) বিরুদ্ধে। ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩৮৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩৭ জনের (৯.৫৬%) বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা আছে, অতীতে মামলা ছিল ১১৩ জনের (২৯.২০%) বিরুদ্ধে।’

প্রার্থীদের আয় সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘৫৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে বাৎসরিক ২ লক্ষ টাকা বা তার চেয়ে কম আয় করেন ৫৮ জন (১০.৭৪%) প্রার্থী। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান ১৫৩ জন প্রার্থীর মধ্যে এই হার ১.৩০% (২ জন) এবং ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩৮৭ জন প্রার্থীর মধ্যে  ১৪.৪৭% (৫৬ জন)। ৫৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে বাৎসরিক ১ কোটি টাকার বেশি আয় করেন ৬০ জন (১১.১১%) প্রার্থী। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান ১৫৩ জন প্রার্থীর মধ্যে এই সংখ্যা ২৮ জন (১৮.৩০%) এবং ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩৮৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন (৮.২৭%)। বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে, সর্বোচ্চ ৩১.৬৭% (১৭১ জন) প্রার্থীর বাৎসরিক আয়সীমা ৫ লক্ষ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা।’

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘৫৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে অধিকাংশরই (২৭৭ জন বা ৫১.২৯%) সম্পদ কোটি টাকার উপরে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান ১৫৩ জন প্রার্থীর মধ্যে এই হার ৭৫.১৬% (১১৫ জন) এবং ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩৮৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪১.৮৬% (১৬২ জন)। ৫৪০ জন জন প্রার্থীর মধ্যে ৫ কোটি টাকার বেশি সম্পদের অধিকারী ১০৩ জন (১৯.০৭%) প্রার্থী। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান ১৫৩ জন প্রার্থীর মধ্যে এই সংখ্যা ৫৫ জন (৩৫.৯৪%) এবং ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩৮৭ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪৮ জন (১২.৪০%)। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান প্রার্থীদের সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি।’

প্রার্থীদের দায় দেনা সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘৫৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে ২২৬ জন (৪১.৮৫%) ঋণ গ্রহীতা। ৫ কোটি টাকার অধিক ঋণ গ্রহণকারী প্রার্থীর সংখ্যা ৩৯ জন (৭.২২%)।’

সুজন সম্পাদক বলেন, ‘৫৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে আয়কর প্রদানকারীর হার ৫০.১৮% (২৭১ জন)। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান ১৫৩ জন প্রার্থীর মধ্যে এই হার ৬৪.৭০%(৯৯ জন) এবং ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩৮৭ জন প্রার্থীর মধ্যে  ৪৪.৪৪% (১৭২ জন)। ৮৬ জন প্রার্থীর আয়কর সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র পাওয়া গেলেও আয়কর প্রদান সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। ১০ লক্ষ টাকা অধিক আয়কর প্রদানকারী প্রার্থীর সংখ্যা ৪৮ জন (৮.৮৯%)।

যদিও এ নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক নয়, তারপরেও সুজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তথ্যের যে কাজটি করেছে তা একটি রুটিন কাজ আখ্যায়িত করে বিচারপতি এবাদুল হক বলেন, ‘আমরা হলফনামায় প্রার্থী প্রদত্ত তথ্যের একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরেছি, যার উদ্দেশ্যই হলো Ñ ভোটারদের ক্ষমতায়িত করা, যাতে তারা জেনে-শুনে-বুঝে সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীদের নির্বাচিত করতে পারেন।’

ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘সংবিধানের ১৪৭ (৪) ধারায় বর্ণিত সরকারের মন্ত্রীসহ ৮টি পদে যারা আসীন আছেন, তাদের বেতন ছাড়া অন্যান্য আয় অর্জন নিষেধ এবং কোনো লাভজনক পদে আসীন হতে পারবেন না। অথচ আমরা দেখছি যে, গত পাঁচ বছরে আমাদের অনেক সংসদ সদস্য ব্যবসায়িক উদ্যোগের সাথে জড়িত থেকে তাদের সম্পদ অনেক গুন বাড়িয়েছেন, যা সংবিধান সম্মত নয়। এ ছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২-কে (শ)’ ধারা অনুযায়ী, সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কে লিপ্ত ব্যক্তিবর্গ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার এবং সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হলেও, এ ধরনের অনেক প্রার্থীই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।’ বিষয়টি যাচাই পূর্বক নির্বাচন কমিশন কর্তৃক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘সুজন-এর নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা ও উচ্চ আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে নাগরিকদের বাক স্বাধীনতা তথা মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবেই প্রার্থীদের তথ্য প্রদানের বিষয়টি আইনে সন্নিবেশিত হয়েছে। অথচ একটি প্রধান রাজনৈতিক দল তথ্য প্রদানের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা রহিতকরণের প্রচেষ্টায় লিপ্ত, যা অত্যন্ত দু:খজনক।’ এ সময় তিনি হলফনামায় প্রার্থীদের সম্পদের বর্তমান মূল্য উল্লেখ করার দারি জানান।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘দশম নির্বাচনে প্রাথীদের অনেকেরই অস্বাভাবিক সম্পদ বাড়লেও দুদক বলছে সম্পদের তথ্য নিয়ে তাদের মাথাব্যাথা নেই। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ ধরনের বক্তব্য কাম্য নয়। কারণ সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা হলে দুর্নীতি কমবে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।’

অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, ‘দুর্নীতি হ্রাসে সরকারি দর পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতাকর্মীদেরও সম্পদ ও আয়করের তথ্য খতিয়ে দেখা উচিৎ। একইসাথে তাঁরা যে গাড়ি ক্রয় করেন সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার।’

ইঞ্জিনিয়ার মুসবাহ আলীম বলেন, ‘দেশের সংঘাতময় রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এ জন্য প্রয়োজন একটি স্থায়ী সমাধান।’ এ লক্ষ্যে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।’

প্রতিবেদক: নেসার আমিন, সুজন সচিবালয়।

তাং – ০২-০১-২০১৪

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s