সুজন-এর উদ্যোগে ‘গুম ও অপহরণ: নাগরিক উদ্বেগ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

_DSC0002 বাংলাদেশে গুম ও অপহরণ এক সর্বনাশা মাত্রা লাভ করেছে। এতে নাগরিক সমাজ ক্ষুব্ধ, ব্যথিত ও শঙ্কিত বলে মন্তব্য করেছেন সুজন নেতৃবৃন্দ। আজ ৮ মে ২০১৪ জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে ‘গুম ও অপহরণ: নাগরিক উদ্বেগ ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে সুজন নেতৃবৃন্দ এ মন্তব্য করেন। একইসাথে গুম ও অপহরণ বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি এবং গুম ও অপহরণের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সোচ্চার হওয়ার জন্য আহ্বান জানান তারা।

সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনায় অংশ নেন সুজন সহ-সম্পাদক জাকির হোসেন, সুজন নির্বাহী সদস্য বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, সুজন নির্বাহী সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ, সুজন নির্বাহী সদস্য এএসএম শাহজাহান, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম শাখাওয়াত হোসেন, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদর রহমান মান্না, সুজন জাতীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, সুজন জাতীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক অজয় রায়, সুজন নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি আব্দুর রহমান ও সুজন নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটির সভাপতি এহসানুল করিম বাবুল প্রমুখ।

আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সুজন নির্বাহী সদস্য আলী ইমাম মজমুদার। তিনি বলেন, ‘আজকের বাংলাদেশে গুম ও অপহরণ এক সর্বনাশা মাত্রা লাভ করেছে। সমপ্রতি অপরাধের বহুমাত্রিকতা বিবেচনায় নিলে এ ক্ষোভ, বেদনা আর শঙ্কাকে অমূলক বলা যাবে না। গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে দিনে দুপুরে সাত জনকে অপহরণ করা হয় এবং পরে শীতলক্ষ্মা নদীতে ভাসমান অবস্থায় তাদের মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এ গুম ও অপহরণের ঘটনা যথাযথ তদন্ত করে দ্রম্নত বিচারে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি সমাজে বিভিন্ন কারণে অপরাধ হতে পারে। তবে সরকার অপরাধীর উপযুক্ত দণ্ডবিধান নিশ্চিত করতে পারলে এ প্রবণতা হ্রাস পায়। কিন’ বর্তমান সময়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা এ ধরনের ঘটনার জন্যে প্রধানত দায়ী। যেমন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার প্রধান অভিযুক্তের বাড়ি তল্লাশি করা হয়েছে এক সপ্তাহ পর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর ও সক্রিয় হলে এধরনের মর্মানিত্মক দূর্ঘটনা একের পর এক ঘটত না।’

সাবেক এই মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘৪ মে ২০১৪, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে ‘র‌্যাব’-এর বিরম্নদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তিন জনকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়েছে। তবে অপরাধ প্রমাণিত হলে শুধু বাধ্যতামূলক অবসরই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কঠোর শসিত্ম প্রদান। ঘটনার নেপথ্যে যদি কোন প্রভাবশালী মহলও জড়িত থাকে, নির্দ্বিধায় তাদেরকেও দাঁড় করাতে হবে বিচারের মুখোমুখি।’

এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘দেশে গুম ও অহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের প্রতি দোষারোপ করছে। গুম ও অহরণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখা দরকার।’ র‌্যাব কী উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে এবং কী কী কার্যক্রম পরিচালনা করছে তা জনগণ জানতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আজকে র‌্যাবকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, অথচ জরম্নরি মুহুর্তে কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশেই র‌্যাব গঠন করা হয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনীকে কার্যকর করে গড়ে তোলা দরকার।’ এ লক্ষ্যে এ বাহিনীতে চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এএসএম শাহজাহান বলেন, ‘যে সমাজে আইনের শাসন নেই, সে সমাজে সমস্যার সমাধানও নেই। আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি নিজেই আইন ভঙ্গ করে, তখন আইনের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা কমে যায়। তখন অপরাধ মহামারী আকার ধারণ করে। তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে কোন অপরাধের সাথে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘গুম ও অপহরণ বন্ধে নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে এবং সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। নারায়ণগঞ্জের খুনের ঘটনায় জড়িত দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করে সরকারকে আনত্মরিকতা প্রমাণ করতে হবে।’

ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘গুম ও অপহরণের পাশাপাশি বর্তমানে যে কোন বিরোধী মতের দমন বেড়েই চলেছে। এরসাথে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততা রয়েছে।’

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসেনি। তাই সরকার আইনশৃঙ্খলা ও রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। আমরা যদি আমাদের রাজনীতিকে টাকা ও পেশিশক্তি থেকে মুক্ত করতে না পারি, তাহলে গুম ও অপহরণ বন্ধ হবে না।’

বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় যাদের বিরম্নদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের গ্রেফতার করতে হবে। এতে প্রকৃত অপরাধীরা শাসিত্ম পাবেন এবং বাকীরা ছাড়া পাবেন। গুম ও অপহরণের ঘটনায় অপরাধীরা শাসিত্ম পেলে দেশে এধরনের ঘটনা কমে আসবে।’

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে দেশে অপরাধের মাত্রা বেড়ে চলেছে। তাই সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির অবসান।’ কাউকে গ্রেফতার করতে হলে আইনানুগ পদ্ধতিতেই তা উচিত বলেও মনত্মব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, ‘দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বত্তায়িত রাজনীতি পরিহার করতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যনত্মরে গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে।’ আজকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরম্নদ্ধে গুম ও অপহরণের সাথে জড়িত থাকার যে অভিযোগ উঠেছে তা গুরম্নত্বের সাথে তদনত্ম করে দেখা দরকার বলেও মন্তব্য করেন।

মাহমুদর রহমান মান্না বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় একজন মন্ত্রীর ছেলে ও মেয়ের জামাইয়ের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। কিন’ তিনি কীভাবে এখনো মন্ত্রী পদে বহাল রয়েছেন তা জাতি জানতে চায়।’ নারায়ণগঞ্জের খুনের ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরম্নদ্ধে তড়িৎ ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার জাতির সাথে প্রতারণা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s