জনগণেরই পায়ের তলায় মাটি নেই!

prothom-alo-logo_v4

বদিউল আলম মজুমদার | আপডেট: ০০:০৭, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৪

সাম্প্রতিক কালে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপির পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে সরকারের পায়ের তলায় মোটেই মাটি নেই—তারা চোরাবালির ওপর দিয়ে হাঁটছে। পায়ের তলায় মাটি না থাকার প্রতীকী অর্থ ক্ষমতাহীনতা ও অসহায়ত্ব। আমরা মনে করি যে বর্তমান বাংলাদেশে জনগণই—যে জনগণকে আমাদের সংবিধান সব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মালিক বলে স্বীকৃতি দিয়েছে—সত্যিকারার্থে ক্ষমতাহীন ও অসহায়।
বাংলাদেশের জনগণ যে আজ অসহায় ও ক্ষমতাহীন, তা আমাদের গত এক বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই সুস্পষ্ট। ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে যে কয়েকটি নির্বাচন হয়েছিল, তার সবগুলোতেই জনগণ তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন। এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের নির্বাচন, যে নির্বাচনের ফলাফল অবশ্য টিকে থাকেনি। অন্য সব নির্বাচনে জনগণের ভোট মোটামুটি সঠিকভাবে গণনাও করা হয়েছিল। এসব নির্বাচনে ভোটের হারও ক্রমান্বয়ে বেড়েছিল। কিন্তু অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে যায় গত ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে।

গত ২২ বছরে প্রথমবারের মতো গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। যে ১৪৭টি আসনে ‘নির্বাচন’ হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের হিসাবমতে, সেগুলোয় ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশনের এ হিসাব বিশ্বাসযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) ৭০টি নির্বাচনী এলাকার প্রায় নয় হাজার পুলিং স্টেশনে ব্যবহৃত ব্যালট বইয়ের মুড়ি গুনে তৈরি হিসাব অনুযায়ী, এসব আসনে ৩০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনে আগের থেকে ব্যালটবাক্স ভর্তি, নির্বাচনের দিনে জোর করে সিল মারাসহ ব্যাপক কারচুপির ঘটনা গণমাধ্যমের সুবাদে সবারই জানা। তা সত্ত্বেও ইডব্লিউজির ব্যালট বইয়ের মুড়ি গণনা হিসাব মেনে নিলে ১৪৭টি আসনে প্রায় এক কোটি ৩৩ লাখ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন, যা থেকে জাতীয়ভাবে গড়ে ভোট দেওয়ার হার দাঁড়ায় প্রায় ১৪ শতাংশ। এর বিপরীতে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল প্রায় ৮৭ শতাংশ। তবে অনেকের মতে, কারচুপি বাদ দিলে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার হার ১০ শতাংশও ছিল না। অর্থাৎ ৫ জানুয়ারি একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবিতে। আমাদের সংবিধানের মূলনীতির অন্যতম হলো গণতন্ত্র। আর গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ভোটাধিকার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটের মাধ্যমে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে সরকার গঠিত হয়। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মতে, ‘বিকৃত ও ভোটারবিহীন নির্বাচন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে।’ [এএফএম শাহ আলম বনাম মজিবুর রহমান ৪১ ডিএলআর (এডি) ১৯৮৯]। তাই বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে স্বৈরাচারী এরশাদকে হটিয়ে অর্জিত ভোটাধিকার তথা ভোটের মাধ্যমে সরকার বদলের জনগণের সংবিধানস্বীকৃত ক্ষমতা ৫ জানুয়ারি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যা আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করল।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের সৃষ্টি। কমিশনের দায়িত্ব নাগরিকের স্বার্থ রক্ষা করা, কোনো দলবিশেষের নয়। এ লক্ষ্যে কমিশনকে অগাধ ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মতে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার খাতিরে নির্বাচন কমিশনের আইনি বিধিবিধানের সঙ্গে সংযোজন করার ক্ষমতাও রয়েছে [আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাসেম, ৪৫ ডিএলআর (এডি)১৯৯৩]। তা সত্ত্বেও আমাদের নির্বাচন কমিশন ৫ জানুয়ারির একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচন পরিচালনা করতে দ্বিধাবোধ করেনি, যা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অর্থাৎ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নাগরিকের স্বার্থ রক্ষা করা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলেও, বর্তমান কাজী রকিব কমিশন সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

শুধু ৫ জানুয়ারিরই নয়, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ভবিষ্যতের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সরকার বদলের জনগণের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অনেকের আশঙ্কা। স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের ফলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো ভবিষ্যতের সব জাতীয় নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বড় অংশের অশুভ ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রভাবের কারণে গত নির্বাচনের অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি হবে বলে অনেকের ধারণা। তাই মনে হয় যেন ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে জনগণকে অনেকটা স্থায়ীভাবেই ক্ষমতাহীন করা হয়েছে।

গণতন্ত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিকের কতগুলো মৌলিক অধিকার উপভোগের নিশ্চয়তা। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে এবং এর পরবর্তী সময়ে নাগরিকের এসব অধিকার যেন ক্রমাগতভাবে সংকুচিত হচ্ছে। জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার অধিকার ও জীবনের অধিকার অতিগুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার; যেগুলোর সংকোচন বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত (১০ ডিসেম্বর, ২০১৪) তথ্যানুযায়ী, এ বছরের প্রথম নয় মাসে ৮২টি গুম ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যা গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এসব অপহৃত ব্যক্তির ২৩ জনের লাশ পাওয়া গিয়েছে, বাকি ৫৯ জনের মধ্যে ৩৯ জন এখনো নিখোঁজ। অর্থাৎ এ ৩৯ জনের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং বাকিদের জীবন বিপন্ন। তাই তাঁদের জীবনের অধিকার, যা মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫ জানুয়ারি ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে নাগরিকের বাক বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে, কারণ আমাদের এবং প্রতিবেশী ভারতের উচ্চ আদালতের মতে, নাগরিক তাঁর বাক্-স্বাধীনতা প্রয়োগ করেন ভোটের মাধ্যমে [ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া বনাম অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্রেটিক রিফর্ম (২০০২) ৫এসসিসি ২৯৪]। যখন জনগণের মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে রাষ্ট্র কর্তৃক হরণ করা হয়, তখন তাদের অসহায়ত্ব বোধ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এমন অসহায়ত্ব বোধ করার একটি বড় কারণ হলো যে আদালতে গিয়েও এই অধিকার হরণের কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

নাগরিকের অসহায়ত্ববোধের আরেকটি কারণ হলো, চারদিকে ক্রমবর্ধমান হারে যে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন চলছে, যা রাষ্ট্রের প্রাণশক্তিকেই নিঃশেষ করে দিচ্ছে, সে ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের যেন কোনো মাথাব্যথাই নেই। গত কয়েক বছরে ব্যাংকিং খাতের লুটপাট সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। সরকারি দলের যে সাতজন সাংসদ ও সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের তদন্ত এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা শুরু করেছিল, তাঁরাও একের পর এক কমিশন থেকে দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ দায়মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি হলেন প্রকৌশলী এনামুল হক, যাঁর বিরুদ্ধে আগে এবং বর্তমানে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কে জড়িত থাকার এবং হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। প্রসঙ্গত, হলফনামায় তথ্য গোপনকারী সাংসদ হওয়ার কিংবা থাকার, কোনোটারই যোগ্য নন। এ ব্যাপারে শুধু দুদক ও নির্বাচন কমিশনই তাদের করণীয় করতে ব্যর্থ হয়নি, সংসদের নেতৃত্বও এ ক্ষেত্রে মনে হয় যেন সম্পূর্ণ নির্বিকার।

পরিশেষে, সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির মধ্যেই দুর্ভাগ্যবশত ক্ষমতাহীনতা ও অসহায়ত্ববোধ সবচেয়ে বেশি। কারণ, যেকোনো সমাজে সাধারণত দরিদ্র ও দুর্বল নাগরিকেরাই সবচেয়ে বেশি হয়রানি ও অন্যায়ের শিকার হয়। আমাদের সমাজেও তা-ই ঘটছে। কিন্তু তারা এসবের কোনো প্রতিকার পায় না বললেই চলে। তারা থানায় গেলে টাকা ও তদবিরের অভাবে একটি সাধারণ ডায়েরিও করতে পারে না। নিম্ন আদালতও বহুলাংশে প্রভাবিত। দুর্নীতি ও দলীয়করণের কারণে সাধারণ মানুষ প্রশাসনের কাছ থেকেও প্রাপ্য সেবা ও প্রতিকার থেকে বঞ্চিত। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিকারের জন্য যাওয়ার আর জায়গা নেই। তাই সত্যিকারার্থেই জনগণের, বিশেষ করে সাধারণ জনগণের, পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

প্রকাশিত: প্রথম আলো, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৪

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s