সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর উদ্যোগে ‘রোহিঙ্গা সমস্যা: একটি মানবিক ইস্যু’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অবিলম্বে গণহত্যা ও নির্যাতন বন্ধে মিয়ানমার সরকারের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগে জাতিসংঘ-সহ আর্ন্তজাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ‘সুজন_সুশাসনের জন্য নাগরিক’ নেতৃবৃন্দ। তাঁরা আজ ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, সকাল ১১.৩০টায়, সুজন আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সমস্যা: একটি মানবিক ইস্যু’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সুজন নেতৃবৃন্দ এই আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, নির্বাহী সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ ও ড. তোফায়েল আহমেদ, সহ-সম্পাদক জনাব জাকির হোসেন এবং সুজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী জনাব দিলীপ কুমার সরকার উপস্থিত ছিলেন। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সি আর আবরার।

লিখিত বক্তব্যে ড. সি আর আবরার বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার বর্তমানে উত্তর আরাকানে জাতিগত নিধনযজ্ঞে লিপ্ত। সেখানে তারা নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের ওপর গুলিবর্ষণ, বেয়োনেট চার্জ থেকে শুরু করে হেলিকপ্টার গানশিপ ব্যবহার করছে। অতি সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠন ঐঁসধহ জরমযঃং ডধঃপয-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, উপগ্রহের মাধ্যমে ধারণকৃত ছবি থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, মংদু ও রাথিদং অঞ্চলের অন্তত ১০টি এলাকায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার জুড়ে আগুনে ভস্মিভূত হওয়া বাড়িঘরের আলামত পাওয়া গেছে। বলা বাহুল্য, ঐ দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও তাদের দোসররা এই অপকর্মে লিপ্ত ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।’

তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে বেশ কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা সম্পাদিত হত্যা, ধর্ষণ ও নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। এ ধরণের চরম পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাবার লক্ষ্যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে শরণার্থী হচ্ছেন। ইতিমধ্যে প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার বাংলাদেশে এসেছেন এবং আরও বিপুল সংখ্যক এদেশে প্রবেশের অভিপ্রায়ে সীমান্ত পাশ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। দেশ-বিদেশের প্রচার মাধ্যমে বিপদসঙ্কুল পথে তাদের দেশ থেকে পালানোর বর্ণনা ও চিত্র ফুটে উঠেছে। এদের মধ্যে নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীরা বিশেষভাবে সঙ্গীন অবস্থায় রয়েছেন। এরা ক্ষুধার্ত, দুর্বল ও অসুস্থ।’

এই প্রেক্ষাপটে সংবাদ সম্মেলনে সুজন-এর পক্ষ থেকে কতগুলো দাবি তুলে ধরা হয় যথা: ‘অবিলম্বে গণহত্যা ও নির্যাতন বন্ধে মিয়ানমার সরকারের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগে জাতিসংঘসহ আর্ন্তজাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হোক; আগামী ১১ সেপ্টেম্বর থেকে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হোক; একইসঙ্গে আমাদের প্রতিবেশি ও অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রদেরকে এ সমস্যার দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হোক; অবিলম্বে মিয়ানমারের কাছে প্রস্তাবিত সীমান্তে যৌথ অভিযানের প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রত্যাহার করা হোক; মানবতা ও প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান রেখে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের বন্দুকের মুখে ঠেলে না দেওয়ার আহ্বান জানাই। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বেঁচে থাকার ও জীবন ধারণের ন্যূনতম সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর চাপ লাঘবের জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্যের দাবি উত্থাপন করা হোক; শরণার্থীদের দায় কেবলমাত্র বাংলাদেশের হতে পারে না। এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলেও তৃতীয় দেশসমূহে পুনর্বাসনের আশু উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে দাবি উত্থাপন করা হোক এবং এ লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হোক; শরণার্থী রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাবার পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ, অভিযুক্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিচারের ব্যবস্থা এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়ার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হোক এবং মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের দাবি সংশ্লিষ্ট মহলে উত্থাপন করা হোক; শরণার্থীদের কার্যকরভাবে সেবা প্রদানে সমন্বয় আনা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাদের নথিভুক্ত করা এবং পরিচয়পত্র প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক; শরণার্থীদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, আশ্রয়সহ অন্যান্য সেবা প্রদানের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগঠনকে সম্পৃক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক; জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান-এর নেতৃত্বে গঠিত ‘রাখাইন রাজ্য আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরামর্শক কমিশন’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখিত সুপারিশসমূহ অবিলম্বে বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এটি কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় বিষয় নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। মানুষ হিসেবে আমরা চুপ থাকতে পারি না। আমরা এ সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান চাই।’

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে উল্লেখ করে সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘আমরা ভুক্তভোগী প্রায় পাঁচ/ছয় লাখ মানুষকে আশ্রয় দিয়েছি। এটি মানবিক দিক, কিন্তু এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার। এব্যাপারে প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহকেও এগিয়ে আসতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি পর্যালোচনা জরুরি। আমরা অন্যান্য দেশের চেয়ে দুর্বল নই। উপযুক্ত জবাব দেবার মত শক্তি আমরা রাখি তা আজ সকলকে জানাতে হবে।’

ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘প্রায় ছয় লাখ লোক সীমান্ত দিয়ে কক্সবাজার জেলায় ডুকে পড়েছে, এত লোকের স্থান সঙ্কুলান করা সম্ভব নয়। বিষয়টি এখন জটিল আকার ধারণ করেছে। এতে আমাদের পর্যটন ব্যবস্থা ধ্বংস হতে পারে।’ এমনকি এই সমস্যা আমাদের দেশের জন্য জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মূল প্রবন্ধ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s