‘আইনের শাসন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় অঙ্গীকার করা হয় যে, “আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হইবে”। কারণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে সুশাসন তথা কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, স্বাধীনতা অর্জনের ৪৭ বছর পরেও বাংলাদেশে সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সুদূর পরাহত রয়ে গিয়েছে।

এমনই প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নিয়ে নাগরিক ভাবনা তুলে ধরা-সহ সংশ্লিষ্ট সকলের করণীয় সম্পর্কে আলোচনার লক্ষ্যে ০৩ এপ্রিল ২০১৮, বিকেল ৩:৩০টায়, জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে নাগরিক সংগঠন ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে ‘আইনের শাসন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘সুজন’-এর নির্বাহী সদস্য বিচারপতি আব্দুল মতিন।

এছাড়া গোলটেবিল বৈঠকে সম্মানিত আলোচক হিসেবে ড. কামাল হোসেন, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম, ড. তোফায়েল আহমেদ, সৈয়দ আবুল মকসুদ, ড. আসিফ নজরুল, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, স্থপতি মোবাশ্বার হাসান, গোলাম মর্তুজা, এএসএম আকরাম, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বিচারপতি আব্দুল মতিন বলেন, ‘আইনের শাসন বা ‘রুল অব ল’ প্রতিষ্ঠা আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় জাতির জন্য অন্যতম অঙ্গীকার। যেমন, অঙ্গীকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে আমাদের সংবিধানই হচ্ছে সর্বোচ্চ আইন। তারই প্রস্তাবনায় আমাদের অঙ্গীকার এই যে, আমাদের রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হবে, সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।’

তিনি বলেন, ‘অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইনবেত্তা, ‘গ্রে’ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নেচার অ্যান্ড সোর্সেস অব ল’-তে বলেছেন, ‘আইন হচ্ছে তাই যা বিচারকরা আইন বলে ঘোষণা দেবেন (Law is what the judges declare)। তাই আইনের শাসন বলতে আমরা বুঝব, যা আমাদের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে ঘোষণাবলে ঘোষণা করেন। অনুচ্ছেদ ১১১ বলছে, হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন সকল অধস্তন আদালত এবং আপিল বিভাগ থেকে ঘোষিত আইনের সকলের জন্য অবশ্য পালনীয়। আইনের শাসন বা ‘রুল অব ল’ সম্পর্কে মাজদার হোসেন মামলায় এবং ইদ্রিসুর রহমান মামলায় বিস্তারিত ব্যাখা দেয়া আছে। ইদ্রিসুর রহমান মামলা অনযায়ী, আইনের শাসনের মূল অর্থ হলো, সরকারের কাজকর্ম আইনসম্মত কি-না তা নির্ধারণ করবেন বিচারকেরাই। তবে শর্ত এই যে, সে বিচারকরা নির্বাহী বিভাগ থেকে হবেন স্বাধীন।’

‘আইনের শাসন ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ আলোচনার পূর্বে আইনের শাসনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা রচিত হলো, যার প্রস্তাবনায় বলা হচ্ছে প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রকে অঙ্গীকার করতে হবে যে, তাদের নিজ দেশে তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করবে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই আমাদের সংবিধানে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছি।’

বিচারপতি আব্দুল মতিন বলেন, ‘আজ জাতির জিজ্ঞাসা, আমরা কি আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পালন করতে সক্ষম হয়েছি? নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র বা অনুমতির গণতন্ত্র, অসীম ক্ষমতাধর নির্বাহী বিভাগ, ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে অকার্যকর আইনসভা এবং আপিল বিভাগের একটি রায়কে কেন্দ্র করে নির্বাহী বিভাগের তাণ্ডবে প্রকম্পিত বিচার বিভাগ কি প্রমাণ করে না যে, আমরা সে অঙ্গীকার পালনে ব্যর্থ হয়েছি? ১১১ অনুচ্ছেদের ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও কুদরত-এ-এলাহী পনির মামলার রায় আজও অবহেলিত। মাজদার হোসেন মামলার নির্দেশনাগুলো এখনও অপ্রতিপালিত। ইদ্রিসুর রহমানের রায়ের নির্দেশনাবলি উপেক্ষা এবং সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের উপেক্ষা ও অবহেলা এবং সামরিক সরকারের সৃষ্ট ১১৬এ অনুচ্ছেদ বাতিল করে ১৯৭২ এর সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদকে পুনঃস্থাপিত না করা কি প্রমাণ করে না যে, আমরা আইনের শাসন নয়, বরং শাসকের আইনের মধ্যেই বসবাস করছি?’

প্রবন্ধের শেষভাগে তিনি বলেন, ‘আজ নাগরিক সমাজ তথা সমগ্র জাতির একান্ত কর্তব্য সংবিধানের প্রস্তাবনায় যে অঙ্গীকার আমরা করেছিলাম তার বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া। অন্যথায় আমরা অঙ্গীকার ভঙ্গকারী জাতি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে বাধ্য।’

ড. কামাল হোসেন বলেন, দেশের মানুষ জীবনবাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা সংবিধানে সেটা স্বীকার করেছি। ৪৭ বছর পরেও আমাদের সংবিধান বহাল আছে। এদেশের মালিক জনগণ–এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ষোড়শ সংবিধান ৭ জন বিচারপতি বাতিল করেছেন। আমরা সবাই বলেছি যে, এটা অসাংবিধানিক। তাই আমার মনে হয় না যে, রিভিউর মাধ্যমে এটা বাতিল করা যাবে। এই সংশোধনী বাতিল করার ক্ষেত্রে বিচারকদের ভ’মিকা অস্বীকার করা যাবে না। স্বাধীন দেশের বিচারককে প্রকাশ্যে তুই তুকারি করা দেশের প্রতিটি মানুষকে অপমান করার শামিল।

মধুমতি টাউনের আদালতের রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেসব ক্ষেত্রে আইনের ব্যতয় ঘটছে সেখানে আমরা সবাই মিলে মিছিল করে তার প্রতিবাদ জানাতে পারি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের মালিক হিসেবে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে তুলি, তাদেরকে অধিকার সচেতন ও সোচ্চার করে তুলি।

তিনি বলেন, আইনের শাসনের জন্য জনগণের ভোটের মাধ্যমেই সরকার নির্বাচিত করতে হবে। এজন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে আশা করি।

ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম বলেন, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জনগণের সামনে আমরা কি বিষয়গুলো উত্থাপন করছি সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যম দ্বারা অনুমোদিত কিনা তাও গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান অনুধাবন করার মত করা উপযুক্ত নাগরিক আমরা নাগরিক তৈরি করতে পারছি কিনা তাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি বলেন, বিচারক নিয়োগে আইন করার জন্য আমরা স্বাধীনতার প্রারম্ভে পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। কিন্তু ৪৭ বছর পরও আমরা তা করতে পারিনি। ষোড়শ সংশোধনী মামলায়ও আমি এই বিষয়ে জোর দিয়েছিলাম। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রশাসন ও বিচার বিভাগ-সহ অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই।

চাকরিতে কোটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নয়। তাই কোটার মাধ্যমে তাদের সন্তানদের চাকরিতে নিয়োগ দেয়া তাদের প্রতি অসম্মান করার সমান।

বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বলেন, আইনের শাসন মানে জনগণের সম্মতির শাসন। আইন হতে হলে তাতে জনগণের সম্মতি থাকা লাগবে এবং আইন হতে হলে তা বিচারকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাস্কি বলেছিলেন, আইনসভার কাজ হলো আইন প্রণয়ন করা, বিচার বিভাগের কাজ হলো কাজ হলো সঠিকভাবে বিচার করা, আর নির্বাহী বিভাগের কাজ দেশ শাসন করা। এভাবে ক্ষমতার বিভাজন করা হয়েছে, যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার না হয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, আইন প্রণীত হতে হবে জনগণের ভোটে প্রকৃত প্রতিনিধি দ্বারা। এটা নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন সঠিক হতে হবে। যে কারণে আমরা সামরিক শাসনের আইনকে আমরা আইন হিসেবে সাধারণত মেনে নেই না। আর আইন কারো ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে, কারো ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে না তা আমরা মেনে নিতে পারি না।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, আইনের শাসনের মাহাত্ম হলো সাধারণ মানুষ থাকবে স্বস্তিতে এবং অপরাধীরা থাকবে। এমনকি রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বলতম ব্যক্তিটিও নিরাপদ থাকবে। একটি রাষ্ট্রে কম গণতন্ত্র মানা যায়, কিন্তু আইনের শাসনের ব্যতয় আমরা মেনে নিতে পারি না। আইনের শাসনের ব্যতয় ঘটছে কি-না তা তারাই বলতে পারবেন যারা গুম-খুনের শিকার হচ্ছেন।

ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, চাকরিতে কোটা সংবিধান সম্মত। কিন্তু সবার জন্য এ কোটা প্রযোজ্য হবে না, কোটা হলো অনগ্রসর শ্রেণির জন্য। বর্তমানে যারা কোটার সুযোগ নিচ্ছেন তাদের সবাই কোটার যোগ্য নয়। যে কোনো অর্ডার আইনসম্মত হতে হয়। কিন্তু আমরা বর্তমানে আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইন নয়, বরং অর্ডারের অধীনে রয়েছি।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ প্রধান ভ‚মিকা পালন করে। কিন্তু বিচার বিভাগের সাথে অন্য বিভাগগুলোকে সমান্তরালে এগিয়ে যেতে হবে। আমি মনে করি, মানুষের ভোটের অধিকার না থাকলে আইনের শাসন নিশ্চিত করা যায় না। তিনি বলেন, একজন প্রধান বিচারপতি হঠাৎ করে দুর্নীতিবাজ হয়ে গেলেন। কিন্তু তার বিচার কেন হলো না কেন? তিনি যে দুর্নীতি করেছেন তার সাথে কারা যুক্ত ছিলেন তাও আমরা জানতে চাই। আদালতের ব্যাপারে আমরা আস্থা হারাতে চাই না। কিন্তু জনগণের সম্মতির শাসন চাই, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চাই।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইনের শাসন ছাড়া যে শাসন তা সভ্য শাসন নয়। বিচারপতিদের নিয়োগে আইন পাশ করার দাবি জানান তিনি।

অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, বর্তমানে দেশে আইনের শাসন নেই। বরং দেশে আছে দুঃশাসন ও অপশাসন। আজকে একটা মহল দেশের ইচ্ছামত দেশ পরিচালনা করছে। আজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে ব্যবসা করা হচ্ছে। এই অবস্থায় দেশকে রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s