০৭ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের তথ্য উপস্থাপন এবং নির্বাচন নিয়ে সুজন-এর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার লক্ষ্যে আজ ২৩ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে অনলাইনে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সুজন-এর সহ-সম্পাদক জনাব জাকির হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি নির্বাচনের একটি সামগ্রিক চিত্র, নির্বাচিত ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের হলফনামা ও আয়কর প্রদানের তথ্যের বিশ্লেষণ, নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য ও নির্বাচন নিয়ে সুজন-এর মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘সুজন একটি নির্দলীয় সংগঠন। আমরা জনগণের স্বার্থে ও কল্যাণে কাজ করি, আমরা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পরিচ্ছন্ন করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করি।’
তিনি বলেন, ‘প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য হলো, প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ভোটারদেরকে ক্ষমতায়িত করা, যাতে তারা জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। আমি মনে করি, নির্বাচন কমিশন যদি হলফনামাগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতো, তাহলে হলফনামা আমলনামায় পরিণত হতে পারতো এবং এর মাধ্যমে আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়াও পরিচ্ছন্ন হতো।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন মানেই বহুদলীয় গণতন্ত্র। কিন্তু বিগত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিফলন ঘটেনি। মাননীয় সিইসির মতো আমরাও মনে করি, আইনগতভাবে বৈধ হলেও এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে দশম এবং ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল একতরফা। আর দ্বিতীয়টি অংশগ্রহণমূলক হলেও নির্বাচনের মাঠ ছিল ক্ষমতাসীনদের দখলে ও ফলাফল ছিল একতরফা। ফলে দুটো বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে বাংলাদেশে যে অস্বাভাবিকতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু এবারও জনগণের সে আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য থাকে, যার মধ্যে অন্যতম হলো: ১. নির্বাচনী ফলাফলের অনিশ্চয়তা; ২. ভোটারদের সামনে বিভিন্ন দল, মত ও কর্মসূচিসম্পন্ন বিকল্প প্রার্থী থাকা; ৩. সকল প্রার্থীদের জন্য সমসুযোগ; ৪. ভোটারদের প্রভাবমুক্ত হয়ে বেছে নেওয়ার সুযোগ; এবং ৫. ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদলের সম্ভাবনা; ৬. সর্বজনীনতা; ৭. নির্বাচনী আইনের যথাযথ অনুসরণ। কিন্তু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সকল রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি বিধান কোন দল সরকার গঠন করবে তা আগেই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। একইভাবে নির্বাচনে অনেক দল অংশ না নেওয়ায় সর্বজনীনতার শর্তটিও পূরণ হয়নি। তৃতীয়ত, নির্বাচনী আইনেরও যথাযথ অনুসরণ হয়নি। নির্বাচনে ব্যাপকভাবে আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা ও সহিংসতা দৃশ্যমান হয়েছে।’
সুজন-এর সহ-সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, ‘যে ৫৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে সেখানে হয়তো ভোটের হার বেশি হতে পারে। কিন্তু বাকি আসনগুলোতে মানুষ সে অর্থে ভোট দিতে যায়নি। ভোটের ব্যাপারে মানুষের তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। তাই ভোটের হার কীভাবে এত বেশি হয় সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। আরেকটি বিষয় হলো, স্বতন্ত্রদের মধ্যে অনেকে নির্বাচনে ব্যাপকভাবে টাকার ব্যবহার করেছেন। আমার মতে, বর্তমানে নির্বাচন অনেকটাই টাকার খেলায় পরিণত হয়েছে।’
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সুজন-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘গত ৭ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত হলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে মোট ভোটার ১১ কোটি, ৯৬ লাখ, ১৬ হাজার ৬৩৩ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ছিল ৪২,০২৪টি। নির্বাচনে ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। নির্বাচন বর্জন করে ১৬টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। উল্লেখ্য, এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাতীয় পার্টি-জেপিকে ৩২টি আসন ছেড়ে দেয়।’
তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনের একটি অভিনব বিষয় ছিল ক্ষমতাসীন দল থেকে বিপুল পরিমাণে স্বতন্ত্র ও ডামি প্রার্থী হওয়া। পরবর্তীতে এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং তার জোটসঙ্গীদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। সেকারণে বলা যায়, নির্বাচনে স্বতন্ত্রদের মধ্যে যারাই জয়লাভ করেছেন, তারা প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন দলের নেতা। তাই কিছু আসনে নৌকা প্রতীকের পরাজয় কিংবা স্বতন্ত্রদের জয়ে ক্ষমতাসীনদের কোনো ক্ষতি হয়নি। মূলত কৃত্রিমভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ সৃষ্টি করার জন্যই দলীয় নেতৃবৃন্দকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপারে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সম্মতি প্রদানের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল।’
দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘২৯৯টি আসনের ফলাফলে দেখা যায় যে, এই নির্বাচনে যারাই জয়লাভ করেছেন তাঁরা প্রায় সকলেই আওয়ামী লীগ মনোনীত বা আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগের কোনো অংশের সমর্থনপুষ্ট অথবা আশির্বাদপ্রাপ্ত। ২৯৯টি আসনে দলভিত্তিক আসন প্রাপ্তির চিত্র নি¤œরূপ: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ: ২২৩টি; জাতীয় পার্টি: ১১টি; জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ): ১টি; বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি: ১টি; বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি: ১টি; স্বতন্ত্র প্রার্থী: ৬২টি (যাঁদের মধ্যে ৫৯ জনই আওয়ামী রাজনীতির সাথে যুক্ত, কয়েকজন রয়েছেন একাদশ সংসদের সদস্য)। এই নির্বাচনে ২০ জন নারী এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু প্রার্থীদের মধ্যে ১৪ জন নির্বাচিত হয়েছেন।’
প্রার্থীদের হলফনামার তথ্যের বিশ্লেষণ তুলে ধরে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘নবনির্বাচিত ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৮২.৬০% (২৪৭ জন)-এর শিক্ষাগত যোগ্যতা ¯œাতক বা ¯œাতকোত্তর। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে এই হার শতকরা ৮৪.৭৫% (১৮৯ জন), জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে এই হার ৭২.৭২% (৮ জন), অন্যান্য দল থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে এই হার ৬৬.৬৭% (২ জন) এবং স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিতদের মধ্যে ৭৭.৪২% (৪৮ জন)। উচ্চ শিক্ষার হার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ভোটাররা উচ্চশিক্ষিতদের যেমন অধিক হারে গ্রহণ করেছেন, তেমনি স্বল্পশিক্ষিতদের বর্জনও করেছেন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। একাদশ জাতীয় সংসদে উচ্চশিক্ষিতের (¯œাতক বা ¯œাতকোত্তর) হার ছিল শতকরা ৮১% (২৪৩ জন); দ্বাদশ জাতীয় সংসদে যা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে (৮২.৬০%)। এই বিষয়টিও ইতিবাচক।’
তিনি বলেন, ‘নবনির্বাচিত ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে অধিকাংশের পেশাই (৬৬.৮৯% বা ২০০ জন) ব্যবসা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে এই হার শতকরা ৬৫.৯২% (১৪৭ জন), জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে এই হার শতকরা ৮১.৮২% (৯ জন), অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে ৬৬.৬৭% (২ জন) এবং স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে এই হার ৬৭.৭৪% (৪২ জন)। নবনির্বাচিত ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৯ জন (৯.৩৯%) আইনজীবী। এই ২৯ জনের মধ্যে ২৪ জনই (৮২.৭৫%) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত। বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে ব্যবসায়ীর হার ছিল শতকরা ৫৮.৭১% (১১৪২ জন); নির্বাচিতদের মধ্যে এই হার দাড়িয়েছে ৬৬.৮৯% (২০০ জন)। প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় ব্যবসায়ীদের নির্বাচিত হওয়ার হার ৮.১৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।’
দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘নবনির্বাচিত ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জনের (৬.৬৯%) বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা আছে, অতীতে মামলা ছিল ১২১ জনের (৪০.৪৭%) বিরুদ্ধে, অতীত ও বর্তমানে উভয় সময়ে মামলা ছিল বা রয়েছে এমন সংসদ সদস্যের সংখ্যা ১২ জন (৪.০১%)। ৩০২ ধারায় বর্তমানে মামলা আছে ৩ জনের (১.০০%) বিরুদ্ধে, অতীতে ছিল ৪০ জনের (১৩.৩৮%), উভয় সময়ে আছে বা ছিল ১ জনের (০.৩৩%) বিরুদ্ধে। একাদশ জাতীয় সংসদের তুলনায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদে মামলার হার বর্তমান, অতীত ও উভয় সময়ের মামলা ক্ষেত্রে মামলার সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ও বিজয়ীদের মধ্যে সিংহভাগই ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট হওয়ায় বর্তমান মামলার হার কম এবং তবে অতীত মামলার হার বেশি।’
তিনি বলেন, ‘নবনির্বাচিত ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে বাৎসরিক ৫ লাখ টাকা বা তার চেয়ে কম আয় করেন মাত্র ১৫ জন (৫.০১%)। আয়ের ঘর পূরণ না করা ৫ জনসহ এই হার দাড়ায় ৬.৬৯% (২০ জন)। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে এই হার শতকরা ৪.০৩% (৯ জন) এবং স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে এই হার ১৭.৭৪% (১১ জন)। বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, স্বল্প আয়ের প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার হার প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় অনেক কম হলেও, অধিক আয়কারীদের নির্বাচিত হওয়ার হার প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্লেষণে একথা নিদ্বিধায় বলা যায় যে, জাতীয় সংসদে অধিক আয়কারীদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘নবনির্বাচিত ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৬৯ জনের (৮৯.৯৭%) সম্পদ কোটি টাকার উপরে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে এই হার শতকরা ৯৫.০৬% (২১২ জন), জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে এই হার শতকরা ৯০.৯১% (১০ জন), অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১০০% (৩ জন) এবং স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে এই হার ৭০.৯৬% (৪৪ জন)। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৫ লাখ টাকার কম স¤পদের মালিক রয়েছে ৯ জন (৩.০১%)। বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় স্বল্প স¤পদের অধিকারীদের নির্বাচিত হওয়ার হার যথেষ্ট কম এবং অধিক স¤পদের মালিকদের নির্বাচিত হওয়ার হার প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় অনেক বেশি।’
তিনি বলেন, ‘হলফনামায় স¤পদের যে তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে, তাতে স¤পদের প্রকৃত চিত্র ওঠে আসে না। কেননা, অনেক প্রার্থীই সম্পদের মূল্য উল্লেখ না করায় আর্থিক মূল্যে সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয় না। অপরদিকে বর্তমান বাজারমূল্য উল্লেখ না করার কারণেও সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করা যায় না। আমরা অনেক আগে থেকেই নির্বাচন কমিশনের কাছে ছকটি পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছি।’
দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘নবনির্বাচিত ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে মাত্র ১৩৪ জনের (৪৪.৮১%) ঋণ ও দায়-দেনা রয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ১০.৪৮% দেনাদার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়েছেন ৪৪.৮১%। একাদশ জাতীয় সংসদে দেনাদারের শতকরা হার ১৩.৩৩% (৪৩ জন) হলেও, দ্বাদশ জাতীয় সংসদে এই হার ৪৪.৮১%।’
তিনি বলেন, ‘নবনির্বাচিত ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে আয়কর প্রদানকারীর হার ৭৬.৯২% (২৩০ জন)। ২৩০ জন আয়কর প্রদানকারীদের মধ্যে ১০ লক্ষাধিক টাকার অধিক আয়কর প্রদানকারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৯৫ জন (৩১.৭৭%)। বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ৪৭.০৪% আয়কর প্রদানকারী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়েছেন ৭৬.৯২%। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় আয়কর প্রদানকারীদের নির্বাচিত হওয়ার হার অধিক। একাদশ জাতীয় সংসদে করদাতার শতকরা হার ৬৩% (১৮৯ জন) হলেও, দ্বাদশ জাতীয় সংসদে এই হার ৭৬.৯২%; যা পূর্ববতী সংসদের তুলনায় ১৩.৯২% বৃদ্ধি পেয়েছে।’
দিলীপ কুমার সরকার তাঁর বক্তব্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কিছু বৈশিষ্ট্য এবং নির্বাচনী সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেন। দ্বাদশ নির্বাচনের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: এক. একতরফা নির্বাচন; দুই. আসন ভাগাভাগি নির্বাচন; তিন. অভিযোগের নির্বাচন; চার. সবচেয়ে কম দলের সংসদ; পাঁচ. প্রদত্ত ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন; ছয়. বিপুলসংখ্যক ভোটারের অনুপস্থিতি; সাত. কিংস পার্টির ভরাডুবি; আট. হলফনামা বাছাই, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে শিথিলতা; নয়. নির্বাচনে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব; দশ. সীমিত পর্যবেক্ষণ।
নির্বাচনের ফলাফলের মূল্যায়ন তুলে ধরে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেয় নিবন্ধিত ২৮টি দল। আওয়ামী লীগ (২২৩টি) এবং দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা (৫৯) মিলে জিতেছেন ২৮২ আসনে। জাতীয় পার্টি ১১টি এবং কল্যাণ পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের প্রার্থীরা একটি করে আসনে জিতেছেন। অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন তিনটি আসনে। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, কল্যাণ পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাকি ২৩ দলের প্রার্থীদের মধ্যে একজন ছাড়া অন্য সবাই জামানত হারিয়েছেন। ১০৪টি আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিপরীতে থাকা সবাই জামানত হারিয়েছেন। নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার ৪১ দশমিক ৮০ শতাংশ। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের ২৬৪ জন প্রার্থী মোট ৩ কোটি ১৯ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯৯ ভোট পেয়েছেন এবং প্রাপ্ত বৈধ ভোটের হার ৬৫.০৬%। জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীর সর্বমোট ভোট পেয়েছে ২১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৯ ভোট পেয়েছেন, মোট বৈধ ভোটের ৪%। এর আগে দলটি ২০১৮ সালে ৭.৩৩%, ২০১৪ সালে ৭.০%, ২০০৮ সালে ৭.০৪%, ২০০১ সালে ১.১২% ভোট পেয়েছিল। ২৪১ আসনে কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। যে ৫৮টি আসনে মাত্র ৩২টি আসনে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, যেখানে বিজয়ী ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোটের ব্যবধান ১০ হাজারের কম। এই ব্যবধান ২০ হাজারের কম ধরলে এই সংখ্যা হয় ৫৭। ২১টি আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা দুই লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন।’
প্রবন্ধের শেষভাগে তিনি বলেন, ‘ব্ল্যাকস ল ডিকশেনারি অনুযায়ী নির্বাচন হলো ‘দ্য এক্সারসাইজ অব এ চয়েস’ বা বিকল্প থেকে বেছে নেওয়া। যেখানে বিকল্প থাকে না, সেখানে ‘অ্যাক্ট অব চুজিং’ বা বিকল্প থেকে বেছে নেওয়ার বা নির্বাচনেরও কোনো সুযোগ থাকে না। তবে বিকল্প হতে হবে যথার্থ ও বিশ্বাসযোগ্য। একইসঙ্গে সত্যিকারের নির্বাচন হতে হলে অযাচিতভাবে প্রভাবিত না হয়ে তথা স্বাধীনভাবে বেছে নেওয়ার সুযোগও থাকতে হবে। কিন্তু দ্বাদশ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প ছিল না।’
সংবাদ সম্মেলনে নবগঠিত সরকার এবং ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতি সুজন-এর কিছু আহ্বান তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো: ১. রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে পথ অন্বেষণের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করুন; ২. নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নে বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুশীলন, মানবাধিকার সুরক্ষা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাস, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখা, সাম্প্রদায়িকতা এবং সবধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ রোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চা ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করুন; ৩. রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাসমূহের স্থায়ী সমাধানে সুদূর প্রসারী সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করুন; ৪. নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা ভাবুন; ৫. সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্তিশালী ও দলীয়করণমুক্ত করুন;৬. দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করুন।’
দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘সুজন আশা করে, সরকার এবং ক্ষমতাসীন দল সুজন-এর সুপারিশসমূহ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবেন এবং তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন; যা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টিসহ নির্বাচন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাসমূহের স্থায়ী সমাধান, দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা এবং একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্টগঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’
মূল প্রবন্ধ দেখতে এখানে ক্লিক করুন।