সুজন পরিচিতি

সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক

‘‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।” গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ: ১১।

সুজন কেন
বহু আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অমিত সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি হলেও, আজো জাতিগতভাবে আমাদের সুদীর্ঘকালের লালিত স্বপ্ন পূরণ হয়নি। আদর্শহীন রাজনীতি, সর্বস্তরে দুর্বৃত্তায়ন, সুশাসনের অভাব এবং সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অনুন্নয়ন ও তাদের প্রতি ব্যাপক বঞ্চনা আমাদেরকে বিভিন্নমুখি সংকটের আবর্তে জড়িয়ে ফেলছে। এই দুর্বিষহ অবস্থা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে ফেলেছে এবং আমাদেরকে ঠেলে দিয়েছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।

সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ…”। কিন্তু জনগণের এই ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। তারা বহুলাংশে তাদের মালিকানা হারিয়ে ফেলেছে একদল স্বার্থন্বেষী ব্যক্তির কাছে। এ সকল ব্যক্তিরা হয়েছে প্রভু, আর জনগণ যেন তাদের আজ্ঞাবহ করুণার পাত্র। কেন্দ্রিভূত শাসন ব্যবস্থা ও এক ধরনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তার যথেচ্ছাচার এর জন্য বহুলাংশে দায়ী, যা আমাদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানকে ক্রমাগতভাবে দুর্বল করে ফেলছে। আমাদের বহু কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে হলে এ অবস্থার অবসান একান্ত জরুরি।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার গুরু দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের, অন্য কারো নয়। বস্তুত রাজনৈতিক দলই গণতন্ত্রের ইঞ্জিন বা চালিকা শক্তি। তাই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্ব এবং যথাযথ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিরাজমান সকল সমস্যার সমাধান হতে হবে – অন্য কোনো বিকল্প বা অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নয়। তবে দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক শক্তিকে উৎসাহিত এবং তাদের ক্ষমতা দখলের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে। দুর্বল ও দুর্বৃত্তায়িত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনা উগ্রবাদী শক্তির উত্থানেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন দেশে সুস্থ, স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখি রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। রাজনীতিকে কালো টাকা ও পেশীশক্তির অধিকারী তথা দুর্বৃত্তদের কবল থেকে রক্ষা করা। সর্বোপরি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৎ, যোগ্য ও আদর্শবান ব্যক্তিদের অর্থাৎ সজ্জনদের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া। একইসাথে তাদের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো (যেমন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন) গড়ে তোলা, যাতে গণতন্ত্র শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারে। আরো প্রয়োজন রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে সাধারণ জনগণকে সচেতন, সংগঠিত করা ও সোচ্চার করা Ñ অন্যথায় কোনো পরিবর্তনই সম্ভব হবে না।

নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সুশাসন প্রতিষ্ঠাই আমাদেরকে নিয়ে যেতে পারে সংবিধানে নির্দেশিত অভিষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে। কারণ সুশাসন মানেই আইনের শাসন, প্রশাসনের সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক শাসন, মানবাধিকার সংরক্ষণ, সমতা, ন্যায়পরায়ণতা, দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সিদ্ধান্তগ্রহণে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলেই সাধারণ জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং তাদের প্রতি বঞ্চনার অবসান ঘটানো সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন ক্ষমতা ও সম্পদের ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ এবং সংবিধানের ৯, ১১, ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের আলোকে শক্তিশালী ও স্বায়ত্ত্বশাসিত স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা এবং গণমুখী প্রশাসন। আরো প্রয়োজন আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশায় জনগণকে জাগিয়ে তোলা এবং তাদেরকে, বিশেষত নারী ও সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদে তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।

সুশাসনের যে প্রত্যাশা আমরা লালন করছি, বিরাজমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য রাষ্ট্র তথা সমাজের সকল স্তরে প্রয়োজন একদল সচেতন নাগরিক গোষ্ঠীর সক্রিয়তা, যারা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে। একইসাথে সরকার, নীতি-নির্ধারক ও সেবাদানকারীদের উপর চাপ সৃষ্টি করবে। সচেতন নাগরিকদেরকে সংগঠিত, সক্রিয় ও সোচ্চার করার এ কাজটিতে সুজন নিবেদিত। কারণ বিখ্যাত মার্কিন বিচারপতি ফ্যান্সিস ফ্যাঙ্কফার্টারের ভাষায়, একটি রাষ্ট্রের নাগরিকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদ নেই।

সুজন-এর সৃষ্টি
সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সজ্জনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার লক্ষ্যে ২০০৩ এর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রাক্কালে, ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে, দেশের একদল সচেতন নাগরিকের উদ্যোগে সিটিজেনস্ ফর ফেয়ার ইলেকশনস্ (সিএফই) নামে একটি নির্দলীয় নাগরিক সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। জন্মলগ্নে সিএফই’র প্রচেষ্টা ছিল নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করে তা বিতরণ করা, যাতে ভোটাররা জেনে-শুনে-বুঝে তাদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। এ লক্ষ্যে ২০০৩ ও ২০০৪ সালে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনসমূহে সংগঠনটি জনগণের পরামর্শের ভিত্তিতে নিজস্ব উদ্যোগে প্রশ্নপত্র তৈরি করে প্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহ এবং ভোটারদের মাঝে তা বিতরণ করে। এ অভিজ্ঞতার আলোকে ভোটারদের তথ্যভিত্তিক ক্ষমতায়ণের আন্দোলন ও আইনি লড়াই শুরু হয়। আর এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রার্থীদের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করে হাইকোর্টের রায়কে ভণ্ডুল করার লক্ষ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে আবু সাফা নামের খুঁজে-না-পাওয়া এক ব্যক্তির দায়ের করা সুপ্রীম কোর্টে আপিল প্রতিহত করা সম্ভবপর হয়। সুজনে’র প্রচেষ্টায় এ অধিকার পরবর্তীতে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সৎ, যোগ্য, আদর্শবান ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীরা যাতে নির্বাচিত হয়ে আসতে পারে সে লক্ষ্যে সিএফই’র সাথে জড়িত স্বেচ্ছাব্রতীদের উদ্যোগে বিভিন্নমুখি সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোসহ প্রার্থীদেরকে এক মঞ্চে এনে ‘জনগণের মুখোমুখি’ করা হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অনেকগুলো এলাকায় নির্বাচনোত্তর ‘জনগণের মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। একইসঙ্গে তৃণমূল থেকে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার চর্চা শুরুর লক্ষ্যে ‘প্রকাশ্য বাজেট অধিবেশন’ আয়োজনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদসমূহকে উৎসাহিত করা হয়। এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগঠিত হতে থাকেন বিভিন্ন এলাকার সচেতন নাগরিকবৃন্দ এবং তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সংগঠনের বিস্তার ঘটতে থাকে। এমনি একটি প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র তথা সমাজের প্রতিটি স্তরে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে সিটিজেনস্ ফর ফেয়ার ইলেকশনস্-এর নতুন নামকরণ করা হয় ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’।

গত ২০০৩-এর ইউনিয়ন পরিষদ ও ২০০৪-এর পৌরসভা নির্বাচনের পাশাপাশি সুজনে’র আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ২০০৫ ও ২০০৬ এ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের ৫টি আসনের উপনির্বাচনে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করে প্রদত্ত হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন করা।

গণতান্ত্রিক উত্তরণে সুজনে’র ভূমিকা
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সত্যিকারার্থে কার্যকর করতে হলে শুধুমাত্র সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়ার প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য আরো প্রয়োজন নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সংস্কার। এ লক্ষ্যে ২০০৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর একটি গোলটেবিল বৈঠকের মধ্যদিয়ে সুজন একটি রাজনৈতিক সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে সংস্কারের একটি বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ এবং গণমাধ্যমের সক্রিয় সহযোগিতায় সারা দেশব্যাপী সংস্কার কর্মসূচি তথা পরিবর্তনের পক্ষে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করা হয়। জনমতের আলোকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ১৪ দলীয় জোট তাদের নিজস্ব সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়ন করে, যাতে সুজনে’র প্রস্তাবিত অধিকাংশ সংস্কার ভাবনা অন্তর্ভুক্ত হয়।

পরবর্তীতে সুজনে’র সংস্কার প্রস্তাবের আলোকে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’ তথা মূল নির্বাচনী আইনের সংশোধিত খসড়া প্রধান উপদেষ্টা ও আইন উপদেষ্টাসহ নির্বাচন কমিশনে পেশ করা হয়। সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:  ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন  নির্বাচন কমিশনকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বিযুক্ত করে স্বাধীন ও শক্তিশালীকরণ  নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ  তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিধান দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিলুপ্তকরণ  রাজনৈতিক দলসমূহের কাঠামোর গণতন্ত্রায়ন ও বাধ্যতামূলক নিবন্ধন  রাজনৈতিক দলসমূহের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ  তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলসমূহের প্রার্থী মনোনয়ন  ঋণখেলাপীদের পাশাপাশি কর খেলাপী, বিলখেলাপী ও আদালত কর্তৃক দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণার বিধানকরণ  নির্বাচনী ব্যয় হ্রাসের ব্যবস্থা গ্রহণ  নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে প্রার্থীদের ব্যয় মনিটরিং ও প্রার্থীগণ প্রদত্ত তথ্য যাচাইপূর্বক অসত্য তথ্য প্রদানকারী ও আচরণবিধি ভঙ্গকারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োজনে প্রার্থীতা বাতিলকরণ  নির্বাচনকে টাকা ও পেশীশক্তির প্রভাবমুক্তকরণ  ‘না’ ভোটের বিধান প্রবর্তন  নির্বাচনী বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তিকরণ ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, সুজনে’র অধিকাংশ সংস্কার প্রস্তাবই নির্বাচন কমিশনের ‘সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’ এ সন্নিবেশিত হয়েছে।

সাম্প্রতিককালে সুজনে’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ২০০৮ এর ৪টি সিটি কর্পোরেশন, ৯টি পৌরসভা ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০০৯ এর উপজেলা নির্বাচন ও জাতীয় সংসদের ৭টি আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করা। কার্যক্রমসমূহের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল:  প্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করে তুলনামূলক চিত্র তৈরি ও ভোটারদের মধ্যে তা বিতরণ  তথ্যসমূহ ওয়েব সাইটে প্রকাশ  সৎ, যোগ্য, আদর্শবান ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীদের নির্বাচিত করার আহ্বান সম্বলিত পোস্টার প্রকাশ ও লিফলেট বিতরণ  প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এক মঞ্চে এনে জনগণের মুখোমুখিকরণ  জনস্বার্থকে প্রাধান্য কাজ করার সপক্ষে প্রার্থীদের কাছ থেকে লিখিত আঙ্গীকার গ্রহণ  সজ্জনকে নির্বাচিত করার প্রত্যয়ে ভোটাদের শপথ করানো  ভোটারদের উদ্বুদ্ধকরণ ইত্যাদি ছিল অন্যতম। নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলের সংস্কারের পাশাপাশি এ সকল কার্যক্রম সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

উপরোল্লিখিত কার্যক্রমসমূহ ছাড়াও, সুজনে’র অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল:  স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে স্বশাসিত ও শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি  আইন-কানুন ও অধিকার সচেতনতাসহ তরুণদের ভেতর দেশপ্রেম জাগ্রত করার লক্ষ্যে সৃজনশীল কার্যক্রম হিসাবে ‘নির্বাচনী অলিম্পিয়াড’ ও ‘সংস্কার বিতর্ক’ অনুষ্ঠান   বিভিন্ন ইস্যুতে জনমত সৃষ্টি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গোলটেবিল বৈঠক, মতবিনিময় সভা, কর্মশালা, সংবাদ সম্মেলন ইত্যাদির আয়োজন  জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করে স্থানীয় সরকারের তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্থানীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উন্মুক্ত বাজেট অধিবেশন আয়োজনে উদ্বুদ্ধকরণ  নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য তাঁদেরকে নিয়মিতভাবে জনগণের মুখোমুখিকরণ  মিডিয়া ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের সহযোগিতায় বিভিন্ন ইস্যুতে জনসচেতনতা সৃষ্টিকরণ  সর্বোপরি, নিজেদের অধিকার আদায়ে সারাদেশের সচেতন নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো ইত্যাদি।

সংস্কার আন্দোলনসহ সুজনে’র কার্যক্রমসমূহ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেননা এই আন্দোলনের অন্যতম দিক ছিল যথাযথ সংস্কার সাধন সাপেক্ষে ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী যথাসময়ে একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও অর্থবহ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। আমরা মনে করি ২৯ ডিসেম্বর, ২০০৯ এ অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণের সেই আকাক্সক্ষা পূরণ হয়েছে। এখন প্রয়োজন গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ, যাতে রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।

সুজনে’র কার্যক্রম পরিচালনা
দল নিরপেক্ষতা, একতা, সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সমতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাই সুজনে’র সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনার নীতিগত ভিত্তি। এই চেতনার ভিত্তিতেই স্বেচ্ছাশ্রমের ব্রত নিয়ে কেন্দ্রীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এছাড়া শহরাঞ্চলে মহানগর, পৌরসভা, থানা ও ওয়ার্ড পযায়েও সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সুজনের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে, নিজস্ব সম্পদ ও নেতৃত্বে। ‘সুজন’ এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক একটি নীতিমালা রয়েছে।

সুজন দাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত কোন এনজিও নয়। এটি একটি নির্দলীয় স্বেচ্ছাব্রতী নাগরিক উদ্যোগ। একদল সচেতন নাগরিকের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনা থেকেই এর সৃষ্টি। এই উদ্যোগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের নেতৃত্বে ও অর্থায়নেই এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

আপনার অংশগ্রহণ জরুরি
গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান রচিত হয়েছে। এখন জাতির সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ: গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির চর্চা করা, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার অব্যাহত রাখা, একইসাথে সমাজে সমতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করা, যাতে রাষ্ট্রে সুশাসন কায়েম হতে পারে।

বাংলাদেশ এখন একটি ক্রস রোড বা একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে। এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়িত করে সত্যিকারের একটি গণতান্ত্রিক ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে আপনার মতো সচেতন নাগরিকের সক্রিয়, সোচ্চার ও ইতিবাচক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফ্রিডমও ফ্রি নয় -এর জন্য প্রয়োজন নাগরিকের চিরন্তন সতর্কদৃষ্টি। আরো প্রয়োজন নাগরিকের কার্যকর ভূমিকা ও অবদান।

আমাদের বিশ্বাস সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় অবশ্যই আমরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে সুখী, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।